আবরার-তুহিন তোমরা কেউই আমাদের ক্ষমা কোরো না

শৈবাল চৌধুরী

মঙ্গলবার , ২২ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ
33

আমরা কি আইয়ামে জাহলিয়াতের যুগে ফিরে যাচ্ছি? কেয়ামত কিংবা মহাপ্রলয় কি আসন্ন? যেভাবে একের পর এক মাৎস্যন্যায়ের ঘটনা ঘটে চলেছে মনে হচ্ছে চরম এক সামাজিক বিপর্যয়ের দিকে আমরা ধাবমান।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান এদেশের সর্বত্র।কেবল বড় বড় শহরে নয় ছোটখাটো শহর এমনকি গ্রামে গঞ্জেও প্রচুর আকাশ ছোঁয়া দালানকোঠা তৈরি হচ্ছে। বিশাল বিশাল রাস্তাঘাট, উড়ালপুল, ওভারপাস, আন্ডারপাস, উড়ালরেল এইসবে ভরে যাচ্ছে শহর বন্দর। গড়ে উঠছে নিত্য নতুন কলকারখানা। স্বভাবতই বছর বছর বাড়ছে মাথাপিছু আয়। বলা হচ্ছে দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনৈতিক দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে প্রায়। দুর্নীতি দমনে সাম্প্রতিক অভিযানগুলো একের পর এক এর সত্যতা প্রমাণ করছে। দেশে ষাট হাজারের বেশী চরম দুর্নীতিবাজ মানুষ রয়েছেন বলে এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে। আটককৃত দুর্নীতিবাজদের সম্পদের পরিমাণ দেখে হতবিহবল অবস্থা সাধারণ মানুষের। রীতিমত অবিশ্বাস্য। চরম ধনী মানুষের সংখ্যা বোধ করি কয়েক লক্ষ। এঁদের সকলেই যে দুর্নীতিবাজ নিশ্চয় তা নয়। তবে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য ক্রমবৃদ্ধিমান আশংকাজনক হারে। ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা সীমাহীনভাবে বাড়ছে। রাস্তাঘাটে তাকালেই সেটা বোঝা যাচ্ছে।
আমাদের সহনশীলতার মাত্রাও ক্রমহ্রাসমান। ভিন্নমততো সমাজে থাকবেই। একটা পরিবারের সব সদস্যও তো একই মতের হয় না। সেখানে ১৭ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে ভিন্নমত থাকবে না এটা কি করে হয়। সেই ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারও একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় থাকবে এটাইতো স্বাভাবিক। ভিন্নমত, ভিন্নধর্ম, ভিন্নদল, ভিন্নজাত সবকিছুর সৌহার্দ্যময় সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এদেশেও কয়েক দশক আগ পর্যন্ত সম্প্রীতিপূর্ণ অবস্থান ছিল। কিন্তু কিছুদিন ধরে, বিশেষ করে গত এক দশক যাবৎ কেন যে আমাদের মূল্যবোধের এতটা চরম অবক্ষয় ঘটলো, বোধগম্য নয়। পরমত অসহিষ্ণুতা, ধর্মীয় উগ্রবাদিতা (সবধর্মে), উচ্ছৃঙ্খল জীবনাচরণ, কুশিক্ষা, দুর্নীতিপরায়ণতা, চরমহিংসা এসব মন্দরিপুতে কেন যে আমরা এতটা আক্রান্ত হয়ে উঠলাম, বুঝে উঠতে পারছি না। বিশেষ করে যুব সম্প্রদায়। দেশের ভবিষ্যৎ দিনগুলোর জন্যে এটা রীতিমত ভয়ংকর একটি আশংকা।
বুয়েটে আবরার হত্যা এবং সুনামগঞ্জে তুহিন হত্যার ঘটনার পর এসব কথা বারবার মনে আসছে। দুটি হত্যাকাণ্ডই এতটা নির্মম, এতটা পৈশাচিক, এতটা নৃশংস যা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে অবলীলায় হার মানিয়েছে। দুটোই ছিল পরিকল্পিত এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে সংঘটিত।
মতের অমিল হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। একজনের মত বা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিল না হলে তাকে কি পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে। মতের স্বাধীন প্রকাশইতো বাক স্বাধীনতা। এর বিপরীত দিকটিই হলো ব্লাসফেমি। যা ছিল মধ্যযুগে। এখনো যা রয়েছে কোনো কোনো দেশে। বাংলাদেশেতো এই আইন নেই।
একটা বিষয় অস্বীকার করার উপায় এখন আর নেই। আমাদের এই দেশ থেকে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ক্রমশ তিরোহিত হয়েছে।
আমাদের অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। চরম নৃশংস দৃশ্য আমরা অবলীলায় অবলোকনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। নৃশংসতার মাত্রা এতটাই চরমে উঠেছে যে পাশবিকতা-নারকীয়তা-পৈশাচিকতা এসব মাত্রানির্ধারণী পরিমাপের শব্দও হার মেনে চলেছে।
্লকোণ স্তরে নেমে এসেছি আমরা! প্রতিপক্ষকে অপদস্থ করতে পাষণ্ড পিতা তার ঘুমন্ত শিশুপুত্রকে তার (পিতার) ভাই ভ্রাতুষ্পুত্রকে নিয়ে চরম নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে! ঘুমন্ত পুত্রকে কোলে নিয়ে জবাই করতে পারে! কেবল জবাই করে ক্ষান্ত হয়নি, আরো যা যা করেছে তা আজ সারা বিশ্ব জানে! রীতিমত অবর্ণনীয়!
এদেশে নারী ধর্ষণের চিত্রও রীতিমত পৈশাচিক। কোলের শিশু থেকে অশীতিপর বৃদ্ধা কেউই রক্ষা পায় না। ধর্ষণশেষে হত্যা। বিবমিষা সৃষ্টিকারী বিকৃত যৌনাচার।
দৃশ্যজ মাধ্যমের সূত্রে ভালগারিটি এবং ভায়োলেন্স আজ শিশু বৃদ্ধ সকলের হাতের মুঠোয়।
সুমানগঞ্জের যে অঞ্চলে পুত্রহত্যার নারকিয়তা ঘটেছে সেটা হাওড় বেষ্টিত প্রত্যন্ত অঞ্চল। সেখানেও নৃশংসতার চরম মাত্রা মানুষের মনে বাসা বেঁধেছে। সড়ক দুর্ঘটনার নিত্যনৈমিত্তিকতার দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। কেবল পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্যই নয়, সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম দুর্নীতিময় অরাজকতাও এর জন্যে দায়ী। সমস্ত সামাজিক আন্দোলন, সরকারি বেসরকারি অভিযান ব্যর্থ হয়ে পুরো সিস্টেমটাই আবার পুনঃ মুষিক ভব অবস্থা্‌য় ফিরে গেছে।
এক কথায় যদি বলি চরম সর্বনাশের দ্বারপ্রান্তে আমরা এগিয়ে চলেছি। সীমাহীন অস্থিরতার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো সমাজ। মূল্যবোধ তলানিতে এসে ঠেকেছে। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা এর জন্যে অনেকটাই দায়ি।
মুক্ত ও সুস্থ বুদ্ধির চর্চাও প্রায় অবরুদ্ধ। সুকুমার কলার চর্চা এখন হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অবশ্য এই চর্চাও এখন অত্যন্ত নিম্নগামী।
শ্রদ্ধেয় পাঠক, আবরার ফাহাদ ও তুহিনের হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই যৎকিঞ্চিত প্রতিক্রিয়া। জানি এসব অরণ্য রোদন। ফেসবুকে দুটি স্ট্যাটাস ভীষণ অপমানজনক বলে মনে হলো। ‘আবরাব, তুমি আমাদের ক্ষমা করো। ‘তুহিন, তুমি আমাদের ক্ষমা করো।’ জানি আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমাদের করার কিছুই নেই। তবুও ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা থেকে আসুন সরে আসি। বিবেককে জাগ্রত করি-বলি, ‘আবরার, তুহিন, তোমরা কেউই আমাদের ক্ষমা করো না।
(এই লেখা শেষ করে বসতে না বসতেই আরো দুটি চাঞ্চল্যকর খবর দেখলাম পত্রিকায়। নারায়নগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুরে নিজের সন্তানকে খুন করেছেন দুই মা।)

x