আফ্রিকার কণ্ঠস্বর উলে সোইনকা

আবদুর রহমান

বুধবার , ৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
4

আমরা এবার অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকা মহাদেশে প্রবেশ করতে চলেছি। দীর্ঘদিন ধরে যে মহাদেশকে শাসন করেছে শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের দল, নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়েছে, মানুষকে বিক্রি করেছে ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী করে, অবশেষে সেই দেশের ঘুম ভেঙেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র আফ্রিকা জুড়ে শুরু হয়েছিল জাতীয়তাবাদের আন্দোলন। একটির পর একটি দেশে পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে পৃথিবীর সামনে হাজির হয়েছিল স্বাধীন দেশ হিসেবে। তারপর শুরু হয়ে ভাঙাগড়ার খেলা। এতদিন পর্যন্ত যে দেশের মানুষ নিজেদের কথা বলার সাহস অর্জন করতে পারেনি, তারা এবার সোচ্চার হয়ে উঠল। কত কথা জমে জমে পাথর হয়ে গেছে। এখনই সবকিছু বলতে হবে। এমন সংলাপ রচনা করতে হবে, যা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করবে। রেখে যাবে চিরন্তন স্মৃতিচিহ্ন।
আফ্রিকার কণ্ঠস্বরকে সকলের সামনে তুলে ধরেছিলেন এক মহান কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিক। তিনি হলেন উলে সোইনকা। জন্মেছিলেন নাইজিরিয়ার আবেকুটা অঞ্চলে। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুলাই।
ভাবতে অবাক লাগে, ১৯০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে যে নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তন,। এক কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্যিকের হাতে সেই পুরস্কার দেওয়া হল দীর্ঘ ছিয়াশি বছর বাদে। এতেই বোঝা যায়, কীভাবে বর্ণ বিদ্বেষের শিকার হয়ে থাকেন কালো মানুষের দল।
‘দ্য ইয়ারস অফ চাইল্ডহুড’ নামক গ্রন্থে উলে সোইনকা তার শৈশবের স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, এ এক অদ্ভুত জগত। আলো আঁধারির খেলা, একদিকে মধ্যযুগীয় উন্মাদনা, প্রেততত্ত্বের প্রতি অবিচল বিশ্বাস, অন্যদিকে একটু একটু করে জাগতে থাকা নবজাগরণ। আলোকশিখার উত্তরণ।।
. . . সাধারণ মানুষের মুখে এককণা খাবার নেই। বিদেশি শাসকদের অত্যাচার ক্রমশ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এবার বোধহয় একটা বিস্ফোরণ ঘটবেই।
দেখতে দেখতে ছোটবেলার দিনগুলো কেটে গেল। আর একটু বড়ো হলেন উলে সোইনকা। সবকিছু ভালোভাবে বুঝতে শিখলেন। মন দিয়ে পড়াশুনা করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেন। হলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষক, তারই পাশাপাশি নাটকের সংলাপ লেখাতে হাত পাকালেন। এলেন লন্ডন শহরে। যোগ দিলেন রয়াল ফোর্ট থিয়েটারে। এখানে তার একাধিক নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল।
ছাব্বিশ বছর বয়সে নাইজিরিয়াতে ফিরে আসেন উলে সোইনকা। সেই। বছরেই ব্রিটিশ উপনিবেশিকতাবাদের শেকল ছিঁড়ে মুক্ত হয় তাঁর প্রিয় দেশ। শুরু হয় নতুন পথে পরিভ্রমণ। আফ্রিকার সাধারণ মানুষের কথা শুনতে হবে। শোনাতে হবে বিশ্ববাসীকে-তখন এমনই এক কঠিন কঠোর শপথ গ্রহণ করেছেন উলে সোইনকা।
সে এক কঠোর সংগ্রাম। অনিদ্রিত রাত, স্বপ্ন মুখরিত দিন। সকলের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে সাহিত্য সাধনা। তপস্বীর জীবনধারা। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেল। মুক্ত স্বাধীন নাইজেরিয়ার কণ্ঠস্বর বিধৃত হল বিশ্বের বাতাসে। পৌঁছে গেল তা আফ্রিকা থেকে আলস্কায়। আলাঙা থেকে অস্ট্রেলিয়ায়। সকলে অবাক হয়ে দেখল এক নবীন সূর্যোদয়কে। তাঁরা ভাবতেই পারেনি, অবহেলিত আফ্রিকার বুকে এমন সাহিত্য প্রতিভা লুকিয়ে থাকতে পারে।

x