আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় ও কিছু ভাবনা

সাইফুল মাহমুদ চৌধুরী

শনিবার , ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ at ৪:০১ পূর্বাহ্ণ
111

্লসমপ্রতি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নৃশংস ঘটনা ঘটে গেল একটি প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি মেধাবী ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের কাছে শিক্ষকরা অসহায়। লেজুড়বৃত্তির শিক্ষক রাজনীতির জন্য তারাও মেরুদণ্ডহীন। এটা কি আসলে কোন নতুন ঘটনা? আমি ৩৫ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। সেই সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র এবং এখনকার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য দেখি না, হয়ত রাজনীতির মাত্রাটা একটু বেড়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়নি। আবরারের মর্মান্তিক মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকেই সংবাদমাধ্যম গুলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের কাহিনী, আক্কাস নামে এক শিক্ষকের কীর্তি, প্রো-ভিসির নিয়োগ বাণিজ্য এবং বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সোচ্চার ছিল। আজকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয় হত তাহলে আবরার ফাহাদের মৃত্যু হত না। সময় এসেছে ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুনভাবে দাঁড় করানোর যাতে আরেকটি আবরার ফাহাদের মৃত্যু না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকারের শিক্ষা এবং গবেষণার কেন্দ্র হয়ে উঠে। সেটা করার জন্য এখনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদ, শিক্ষক নিয়োগ এবং ছাত্র রাজনীতি এগুলো নিয়ে সামগ্রিকভাবে ভাবার সময় এসেছে।
বুয়েটে, যেখানে শিক্ষক নিয়োগের অনিয়মের কথা একদম শোনা যায় না, ছাত্র রাজনীতির জন্য অল্প সংখ্যক ছাত্রের প্রশাসনের এই হাল হয়, অন্য পুরনো অধিক সংখ্যক ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কী হাল হবে তা বোঝাই যায়। পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ দিলাম, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হলে সবচেয়ে কঠোর হতে হয় নিয়োগের ব্যাপারে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশ কিছু বিভাগের ওয়েবসাইট ঘুরে আসলাম, অধিকাংশ শিক্ষকের পিএইচডি নেই, প্রভাষকই বেশি। সেটাই স্বাভাবিক। তবে কিছু সিনিয়র শিক্ষকের সিভি দেখলে মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা হয়। কিছু কিছু বিভাগে অনেক শিক্ষক আছেন এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কী যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়েছেন তা আমার বোধগম্য নয়। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া কী পরিমাণ অ্যাবিউস করা হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। পিএইচডি ডিগ্রি ধারি না পাওয়া গেলে প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়োগ দিতে হয়। একবার গারবেজ শিক্ষক ঢুকে গেলে সবসময়েই গারবেজ শিক্ষক দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভরে যায়। আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে গেলে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়। যাতে এই শিক্ষকরা দক্ষ শিক্ষক, গবেষক এবং দক্ষ প্রশাসক হিসাবে ভবিষ্যতে সফল হতে পারেন। উন্নত দেশের শিক্ষক নিয়োগের নিয়ম-কানুন সম্পূর্ণ ভিন্ন শুধু নয়, নিয়োগ পাওয়ার পর চাকরি টিকিয়ে রাখাটাও অত্যন্ত কঠিন। প্রথমে আমেরিকায় শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে একটু আলোকপাত করি। বাংলাদেশের আলোকে শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে পরে আমার কিছু মতামত দিব।
আমেরিকায় শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিভাগ প্রথমে তিন কি চারজন ফ্যাকাল্টির একটি কমিটি তৈরি করে। অনেক সময় অন্য বিভাগের একজনকে এক্সটারনাল কমিটি মেম্বার হিসাবে রাখা হয়। শিক্ষক নিয়োগের জন্য যোগ্যতা চাওয়া হয় পিএইচডি, এবং বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণা বাধ্যতামূলক। পিএইচডি গ্রান্টিং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চায় আপনার প্রাক্তন এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার স্টেটমেন্ট। এছাড়া টিচিং ফিলসফির উপরও একটি স্টেটমেন্ট চাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি পিএইচডি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় হোক অথবা টিচিং বিশ্ববিদ্যালয় হোক, পিএইচডি ছাড়া কোন শিক্ষক নিয়োগ হয় না। ফ্যাকাল্টি পজিশনের ক্ষেত্রে দেখা হয়, আপনার পেডিগ্রী, মানে আপনার পিএইচডি এবং পোস্টডক প্রতিষ্ঠানের সুনাম, আপনি যাদের সাথে কাজ করেছেন, তারা আপনার গবেষণার এরিয়াতে কতটুকু পরিচিত। আরেকটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আপনার গবেষণার বিষয় এবং আপনার প্রকাশনার সুনাম। এখানে কোন জিপিএ চাওয়া হয় না, কারণ পিএইচডি একটি গবেষণাধর্মী ডিগ্রি। এছাড়া কোন পিএইচডি ডিগ্রিধারীর জিপিএ চারের স্কেলে তিনের নিচে হবে না, কারণ এর নিচে গেলে আপনি ডিগ্রি পাবেন না। আপনার স্কুল এবং কলেজের জিপিএ নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই, কারণ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কী সুনাম তা সবার ভালভাবেই জানা। হাইস্কুলে বাজে রেজাল্ট করে আপনার বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া এত সহজ হবে না। এছাড়া আপনি অখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে শিক্ষক পজিশনে কখনই আসতে পারবেন না। যাই হোক, আনুমানিক ১০০টি দরখাস্ত থেকে ৪ থেকে ৫ জনের একটি লিস্ট কমিটি নির্বাচন করে। এরপর এদেরকে প্রথমে ফোনে ইন্টারভিউ নেয়া হয়। কিছু প্রশ্ন আগে থেকেই নির্ধারণ করা থাকে। এই ফোন ইন্টারভিউগুলোর কোন প্রশ্ন তার বিষয় নিয়ে করা হয় না। এরপর কমিটি ২ থেকে ৩ জনকে অন-সাইট ইন্টারভিউতে ডাকেন। প্রতিটি ইন্টারভিউ ২ দিনের জন্য হয়। এমনভাবে এটা করা হয় যাতে কোন প্রার্থী জানেন না অন্য কোন প্রার্থী শর্ট লিস্টে আছেন। সকাল থেকে প্রার্থী প্রতিটি ফ্যাকাল্টির সাথে একটি নির্দিষ্ট সময় নিয়ে কথা বলেন। দিনের একটি সময়ে প্রার্থীকে তার গবেষণার ওপরে ১ ঘণ্টার একটি সেমিনার প্রদান করতে হয়। এই সেমিনারটি সাধারণত উন্মুক্ত, অর্থাৎ যে কোন বিভাগের যে কোন ছাত্র, এমনকি অন্যান্য বিভাগের ছাত্র এবং শিক্ষকরাও এতে যোগ দিতে পারেন। দ্বিতীয়দিন প্রার্থীকে আরও কিছু ফ্যাকাল্টি/ অথবা ডিনের সাথে মিটিং করতে হয় এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার দিতে হয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এটাকে বলে চক-টক। এই সেমিনারটি পাওয়ার পয়েন্টে অথবা বোর্ডে লিখে দেয়া যায়। এই চক-টকটিতে ফ্যাকাল্টি ছাড়া কেউ যোগ দিতে পারে না। এই সেমিনারটিতে প্রার্থী তার ভবিষ্যৎ গবেষণার আউটলাইন বর্ণনা করেন। কিভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা প্রোগ্রাম চালাবেন, এই বিষয়ে তার তিন থেকে চারটি আইডিয়া বিস্তারিতভাবে বলবেন। এরপর কমিটি সেরা প্রার্থীকে চাকরির জন্য সুপারিশ করতে পারে, অথবা বিভাগের সমস্ত ফ্যাকাল্টি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচন করতে পারেন। পরবর্তীতে প্রার্থী নিয়োগের সুপারিশ ডিনের কাছে পাঠান হয়। ডিন চাইলে একে নাও নিতে পারেন। ডিন এর পছন্দ হলে এটা প্রভোস্ট এবং প্রেসিডেন্ট এর অনুমতির জন্য পাঠানো হয়। এইভাবে একজন নতুন ফ্যাকাল্টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। বিজ্ঞান বিষয়ে নতুন ফ্যাকাল্টিকে তার ল্যাব প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভাগ ভেদে ৩ লাখ থেকে ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দেয়া হয়, একে বলা হয় স্টার্ট-আপ মানি। নিয়োগের বিষয়টি একটু বিশদভাবে লিখলাম যাতে বোঝান যায়, কোন যদুমধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেন না। প্রতিটি শিক্ষকের ভাল মানের পিএইচডি, পোস্টডক গবেষণা এবং নামকরা ল্যাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।
এবার আমেরিকায় গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রফেসর এর জীবন কেমন তা একটু ধারণা দিচ্ছি। প্রথমেই তাদেরকে মনিটর করার জন্য একটা মেন্টরিং কমিটি তৈরি করা হয়। এদেরকে প্রতি বছর বিভাগীয় রিভিউ, চেয়ার এবং ডিন এর রিভিউর পাশাপাশি, তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ প্রশাসন, যেমন প্রভোস্ট (প্রো-ভিসি) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটির রিভিউতে যেতে হয়। এরপর, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আপনাকে ‘খোদা হাফেজ’ বলে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে দিতে পারেন। পাঁচ বছর পর আপনি আপনার অর্জনের উপর বিশাল এক বই লিখে জমা দিবেন। সাধারণত তিনটি বিষয়ে রিভিউ করা হয়- আপনার গবেষণার অর্জন, আপনার শিক্ষকতার মূল্যায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সার্ভিস। নতুন শিক্ষকদের ক্ষেত্রে স্থায়ীকরণের সময়, গবেষণা এবং শিক্ষকতার উপর বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। এরপর আপনার এই বিশাল ফাইলটি আপনার গবেষণার বিষয়ের ৬ থেকে ১২ জনের মত বিশেষজ্ঞের কাছে মতামতের জন্য পাঠান হয়। এদের নাম চাইলে আপনি নিজে দিতে পারবেন, কিন্তু আপনার পিএইচডি এবং পোস্ট-ডক অ্যাডভাইসরের নাম দিতে পারবেন না। আপনি যদি ভাবেন যদুমদু টাইপের বিশেষজ্ঞের নাম দিবেন, বিভাগ কখনই এই নামগুলো গ্রহণ করবে না। এই বিশেষজ্ঞরা আপনার কাজগুলো পরিপূর্ণভাবে রিভিউ করে জানাবেন আপনি টেনিউর/চাকরি স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন কিনা। কিছু কিছু স্টেটের নিয়ম অনুযায়ী, আপনি এই চিঠিগুলো পড়তে পারবেন, কিন্তু কে লিখেছে তা জানবেন না। আপনার রিভিউগুলো যদি খারাপ হয়, আপনাকে একটা প্রতি-উত্তর দেয়ার সুযোগও দেয়া হবে। এটা শেষ হলে এরপর আপনার সম্পূর্ণ ফাইলটি ডিপার্টমেন্টের স্থায়ী ফ্যাকাল্টিদের কাছে ভোটের জন্য যাবে। চেয়ার এর রিভিউর পর এটা আবার ডিনের কাছ থেকে যাবে প্রভোস্ট কমিটিতে। আপনার স্থায়ীকরণের বিষয়ে প্রভোস্ট এবং প্রেসিডেন্টের ডিসিশনই চূড়ান্ত। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে ফাইনাল ‘খোদা হাফেজ’ বলে দিতে পারে, অথবা সম্মানের সাথে আপনাকে টেনিউর দিয়ে প্রমোশন দিতে পারে। টেনিউর হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির মাইলস্টোন, মানে আপনার চাকরি স্থায়ী হয়ে গেল। এবার আপনি ভাবলেন, আপনি টেনিউর পেয়ে গেছেন, এখন আপনি হাওয়া খেয়ে ঘুরে বেড়াবেন, তা হবে না। চানাচুর খেয়ে, মুভি দেখে, টক শোতে রাজা-উজির মেরে বেড়াবেন, তাও হবে না। গ্রান্ট মানি না থাকলে আপনার ল্যাব চলবে না। বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে এমনভাবে নিয়মে রাখবে যে আপনি বসে থাকার কোন সুযোগই পাবেন না। এর ডিটেইলটা পড়ে একসময় লেখা যাবে।
এইবার আসি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারটা নিয়ে। আমি বাংলাদেশের সাথে আমেরিকার তুলনা করতে চাই না। কিন্তু শিক্ষার মত এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অবহেলা করে ধনী দেশে রূপান্তরিত হওয়ার চিন্তা করা হাস্যকর। পৃথিবীতে একটাও ধনী দেশ পাওয়া যাবে না যাদের বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চমানের নয়। দক্ষ মানব সম্পদ এবং ভিশনারি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা নিয়ে একটি খসড়া ইউজিসি প্রকাশ করেছে। এখন বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করছে। নতুন কোন ধরনের পরিবর্তন যে কোন প্রফেশনের লোকেরা ভালমতো নেয়না। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যেহেতু অত্যন্ত নিম্নমুখী, এখানে প্রতিরোধ আসাই স্বাভাবিক। এজন্য আমেরিকাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট (ভিসি) আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথমে পরিবর্তন করে নিয়োগ দেয় নতুন প্রভোস্টকে (প্রো-ভিসি)। তিনি ধীরে ধীরে উপরের প্রশাসনের মানুষগুলোকে পরিবর্তন করে তার একটা নতুন টিম তৈরি করেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদগুলির নিয়োগ অত্যন্ত উঁচুমানের হয়। এভাবে নতুন একটি কার্যকর প্রশাসন প্রেসিডেন্ট নিজের জন্যই তৈরি করে। এরা যে সমস্ত নীতিমালা সব ফ্যাকাল্টিদের সাথে কথা বলে করে তা নয়। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তারা অবশ্যই শিক্ষকদের সাথে মতবিনিময় করেই করে। সবচেয়ে চমৎকার কাজ হচ্ছে একটা খসড়া তৈরি হয়েছে। ভালো হোক কি মন্দ হোক, মতামতের মাধ্যমে এটাকে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আপডেট করে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বড় স্কেলে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। আমি কিছু সুনির্দিষ্ট মতামত দিচ্ছি একাডেমিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ব্যাপারে। আমি মনে করি, প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দুই ধরনের ক্যাটাগরিতে আলাদা করা উচিত। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে চিহ্নিত করা, যাদেরকে উচ্চমানের পিএইচডি প্রদানের জন্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হবে, বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল আন্ডার-গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি দিবে। স্বায়ত্তশাসিত এবং পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রথমে এর মেম্বার করা যেতে পারে। ধীরে ধীরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের শিক্ষার এবং গবেষণার মান বৃদ্ধির মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই লিস্টে নিয়ে আশা যাবে।
বর্তমানে প্রভাষক নিয়োগের যে নীতিমালাটি খসড়া করা হয়েছে তা শিক্ষক নিয়োগের বর্তমান রাজনীতি থেকে মুক্ত করা যাবে না। তবে আমি মনে করি এই নীতিমালা অত্যন্ত কঠিন হতে হবে প্রাথমিক পর্যায়ে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের ব্যাপারে। দুটো পদ্ধতিতে এটা হতে পারে-
প্রথমত, প্রভাষক পদটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা। বাংলাদেশে ভাল ছাত্র-ছাত্রীদের কিছুটা সাপোর্ট দেয়ার প্রয়োজন আছে। উন্নত দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর ভাল ছাত্ররা পিএইচডি সাথে সাথে শুরু করতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু ভাল পিএইচডি প্রোগ্রাম এখনও তৈরি হয়নি, উচিত হবে এদেরকে টিচিং ফেলো হিসাবে একটি পজিশন তৈরি করে নিয়োগ দেয়া। এর মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বিভিন্ন বিভাগের সেই বছরের ৫ শতাংশ সেরা শিক্ষার্থীকে বিভাগে রাঙ্কিং অনুযায়ী কেবল তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেবে। এই তিন বছরের মধ্যে এরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্ভিস দেয়ার পাশাপাশি পিএইচডি স্টুডেন্ট হিসাবে বাইরে যাওয়ার অথবা দেশে পিএইচডি করার জন্য প্রস্তুতি নিবে। পরবর্তীতে পিএইচডিতে সফল হলে এদের মধ্যে সেরা কিছু শিক্ষার্থীকে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে স্থায়ী নিয়োগ দেয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রভাষক পদে বিষয় সম্পর্কিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া। আমি জানি অনেকে পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেয়ার বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রতি বছর এর মাধ্যমে সেরা ছাত্রটি প্রভাষক হিসাবে যোগ দিবে। প্রভাষক পদটি একধরনের শিক্ষানবিশ ধরনের পদ। প্রতিটি বিভাগ প্রথম ১০ জন শিক্ষার্থীকে এই পরীক্ষার জন্য র‌্যাঙ্ক করতে পারে। ইউজিসি এই পরীক্ষাটি পরিচালনা করতে পারে। এদিয়ে সারা বাংলাদেশের সেরা শিক্ষার্থীটি প্রাথমিকভাবে তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ দিতে পারে। তবে পরীক্ষার মাধ্যমে প্রভাষক নিয়োগ হলে, সরকারের উচিত হবে এদেরকে পিএইচডি করার জন্য বাইরে অথবা দেশে উচ্চহারে বৃত্তি দেয়া। সাফল্যের সাথে পিএইচডি সমাপ্ত করার পর এদেরকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে পদায়ন করা। এই ক্ষেত্রে পিয়ার রিভিউড জার্নালে দুইটি ভাল প্রকাশনা এবং একটি প্রথম অথর প্রকাশনা থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগ দেয়ার জন্য। গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব আর কিছু নিয়ম সংযুক্ত করতে পারে সবচেয়ে সফল শিক্ষক/গবেষক নিয়োগের ক্ষেত্রে। ইউজিসির খসড়াটিতে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী এবং অধ্যাপক পদের ক্ষেত্রে বর্তমানে বেশি মূল্যায়ন করা হয়েছে সময়ের ব্যাপারে। এছাড়া অল্প কিছু জার্নাল প্রকাশনার নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। এই নিয়মগুলো হয়ত বাংলাদেশের সমস্ত টিচিং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বর্তমানে সঠিক আছে। কিন্তু উন্নত মানের গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে গেলে গবেষণার উপর জোর না দিলে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবে না। এখন বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে পড়াশোনা করছে। এরা পিএইচডি করে দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফল পিএইচডি অর্জনকারীদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সহকারী অধ্যাপক হিসাবে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারে। সাধারণত আমেরিকা এবং ইউরোপের নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটকে দেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন। এন্ট্রি লেবেলে প্রভাষকদের পিএইচডির সাপোর্ট দিলে এইসব দেশ থেকে এদেরকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা কম। কিন্তু এই গ্যাপটা পূরণ করার জন্য ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের সরাসরি নিয়োগের বিকল্প নেই। তবে এই ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগের মান বজায় রেখেই নিয়োগ দিতে হবে। গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব কিছু অতিরিক্ত প্রকাশনার নিয়ম যুক্ত করতে পারে। আমি মনে করি, এটা কোনমতেই এই দুই পর্যায়ে (সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক) সর্বমোট ৮ এর নিচে না হওয়া উঠিত। গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রফেসর হওয়ার জন্য পিএইচডি ছাত্র পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক এবং আমেরিকায় প্রচলিত নিয়মের মত বিষয়ভিত্তিক এঙপার্ট এর মতামত নেয়া উচিত। উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে পিএইচডি করে ভাল প্রকাশনা করে আসলেও অনেক সময় গবেষণা পরিচালনা করার যোগ্যতা তৈরি হয়না। তাই সিনিয়র পজিশনগুলোতে গবেষণা পরিচালনা করার যোগ্যতাও বিবেচনাতে আনতে হবে। সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক একাডেমিক এঙিলেন্সের মাইলস্টোন। এই প্রমোশন গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত কঠিন হওয়া উচিত। তবে এই ক্ষেত্রে গবেষণাধর্মী অথবা টিচিং বিশ্ববিদ্যালয় এর সিনিয়র শিক্ষকদের বেতন ভিন্ন হওয়া উচিত। এটা আগেও লিখেছি, চীন এবং ভারত এভাবে অনেক গবেষকদেরকে নিজের দেশে আকৃষ্ট করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত করে নতুন গবেষণা ইন্সটিটিউট তৈরি করছে।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগের একটা বাস্তবসম্মত উন্নত নীতিমালা করাটা এখন অত্যন্ত জরুরি। টাইম বোমার মত সময় টিকটিক করছে। এই নীতিমালা অবশ্যই কঠিন হতে হবে। প্রাথমিকভাবে যে কোনও প্রফেশনের মানুষ কোন পরিবর্তনকে ভালভাবে নেয়না। আমেরিকাতে ফ্যাকাল্টির যেসব চেক অ্যান্ড ব্যাল্যান্সের কথা বললাম, তা বাংলাদেশে হলে অ্যাবিউস হয়ে যেত। প্রথম কথা হল, এই প্রসঙ্গে অবাস্তব হলে চলবে না।
অভিন্ন নীতিমালা প্রভাষকদের ক্ষেত্রে করা সম্ভব, কিন্তু উঁচু পদের নিয়োগের নীতির মধ্যে পার্থক্য থাকতে হবে। ভালমানের পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের কিভাবে নিয়োগ দেয়া যায় এবং তা প্রভাষক নিয়োগ থেকে আলাদা হতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভাল ছাত্র নিয়োগ করলেই গবেষণার অবকাঠামো তৈরি হয়না। গবেষণার অবকাঠামো না থাকলে, গবেষণা করা সম্ভব নয় এমনকি ভাল মানের গবেষক থাকলেও। গবেষণার অবকাঠামো, বাংলাদেশে কিভাবে করা যাবে, ডিটেল লিখেছি অনেক আগেই।
এসব যা লিখলাম, কোন জিনিসই সফল হবেনা যদি যোগ্য মানুষকে ভিসি হিসাবে নিয়োগ না দেয়া হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো অনেক প্রফেসর আছেন যারা শিক্ষক/গবেষক হিসাবে অত্যন্ত উঁচুমানের। অনেকেরই উচ্চ মানের প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি আছে। গবেষণার অত রিসোর্স না থাকা সত্ত্বেও এরা গবেষক হিসাবেও ভাল মানের কাজ করছেন এবং করার চেষ্টা করছেন। এমন অনেক শিক্ষককে আমি চিনি যারা চেষ্টা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানকে উঁচুতে নিয়ে যেতে। ‘শিক্ষক রাজনীতির নোংরামি’তে এরা এখনও নামতে পারেননি, তাই তারা এই পদগুলোর লবিং করেননা। একটা সার্চ কমিটির মাধ্যমে এই শিক্ষকদের চেয়ার, ডিন এবং প্রশাসনের উঁচু পদগুলোতে নিয়ে আসা উচিত। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যোগ্য টিম তৈরি করে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদী কিছু পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া উচিত। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উন্নতির সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে দলীয় ছাত্ররাজনীতি। এই লেখাটি শুরু করেছিলাম আবরার ফাহাদ নামে বুয়েটের এক মেধাবী ছাত্রের হত্যাকাণ্ড নিয়ে। সেই ৩৫ বছর আগে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে যা দেখেছি সেই একই বৃত্তে বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। দলীয় ছাত্ররাজনীতি শেষ করে দিচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে এরা শিখছে চাঁদাবাজি, টর্চার এবং মার্ডার। রাজনীতিবিদরা তাদের নিজেদের স্বার্থেই কখনোই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করবে না। এখন সময় এসেছে শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যা দিয়ে রাজনীতিবিদদের বোঝান যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলীয় ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। অনেকের ভয়, দলভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলে, জঙ্গিবাদ এবং ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠনরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপ্রবেশ করতে পারে। কিছু কঠিন সাংগঠনিক নীতিমালা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকুলার আদর্শের সাথে মিল রেখে করলে এবং ভাল শিক্ষাবিদ প্রশাসনে থাকলে আমার কাছে মনে হয় এই ভয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে অমূলক। অনেকে বলেন, মাথার সমস্যা হলে কি মাথাটা কেটে ফেলতে হবে? জি না, সেটা বলছিনা, দলীয় ছাত্র রাজনীতি এখন বিষ ফোঁড়ার মত। সেটা অপারেশন করে ফেলে দিতে বলছি, মাথা কাটতে বলছি না। ফোঁড়া মাথার থেকে বড় হয়ে গেলে সেটা সমস্যা।
বাংলাদেশে এখন একটা নতুন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে এদেরকে রাজনৈতিক নেতৃত্বদের বুঝতে হবে। এরা স্বপ্ন দেখে উন্নত বাংলাদেশের, উন্নত শিক্ষার, উন্নত গবেষণার সুবিধার, নিরাপদ সড়ক, সুশাসন এবং দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশের। হয়ত একদিনে তা হবে না। উন্নত হতে হলে শিক্ষা এবং গবেষণায় উন্নত হতে হবে প্রথমে। রাজনীতি মুক্ত শিক্ষাঙ্গন ছাড়া এর কোন বিকল্প নেই।

x