আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে

বদরুননেসা সাজু

সোমবার , ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ
39

১. হারানোর বিষাদ : কিছুদিন আগে (৭ নভেম্বর ২০১৮, রাত ৮.৩০ মি.) আমাদের প্রিয় সহকর্মী অধ্যাপক রশিদুন্নাহার সান্ত্বনা ইহজগত ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি রাবেয়া বসরী গার্লস হাই স্কুল থেকে (হালিশহর) ১৯৯৯ এ এস এস সিতে প্রথম বিভাগ অর্জন করেন। তখন তার গ্রুপ ছিল বিজ্ঞান। পরবর্তীতে ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে তিনি আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ থেকে ২০০১ সালে প্রথম বিভাগ এবং ২০০৪ সালে বি কম এ ফার্স্ট ক্লাস লাভ করেন। পরবর্তীতে সরকারি কমার্স কলেজ থেকে ২০০৫ এ প্রিলি.তে এবং ২০০৬ ক্লাসে এম কম এ ফার্স্ট ক্লাস পান। এস এস সি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মেয়েটির আয়ু ছিল মাত্র ৩৬ বছর (১৯৮২ -২০১৮)। হালিশহর এবং জামাল খানের বাড়ির স্বজনেরা বিশেষ করে শাশুড়ি স্বামী একমাত্র সন্তান ও তার প্রিয় কলেজের সহকর্মীরা দেখেছে সান্ত্বনার সংগ্রামী জীবন। অর্থাৎ ঘাতক ব্যাধির সাথে দীর্ঘ চিকিৎসার যুদ্ধময় জীবন।
বয়সে ছোট হয়েও রশিদুন্নাহার সান্ত্বনা আমাদের শূন্য করে চলে গেলেন ওপারে। তার অকাল চলে যাওয়া আজও আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। তার প্রিয় কর্মস্থলে আমরা সহকর্মীর সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলাম। এর আগে আমাদের অন্যান্য ম্যাডামরা সুস্থ হয়ে এসে কর্ম সম্পাদন করে অবসর গ্রহণ করেছেন। সেখানে আমরা সান্ত্বনাকে কেমন করে হারিয়ে ফেললাম -এ যেন অবিশ্বাস্য! আমরা দেখেছি তার কর্মদক্ষতা, শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের আয়ত্তে রাখার কৌশল এবং নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এমন মেধাবী একজন প্রিয় শিক্ষক আমাদের মাঝে ছিলেন। অত্যন্ত সুভদ্র আচার আচরণে মার্জিত রশিদুন্নাহার সান্ত্বনা চিকিৎসার ফাঁকে মাঝে মাঝে আসতেন। কিন্তু এখন থেকে তিনি তার কখনো আসবেন না। এটা আমরা ভাবতেও পারছি না। দেখা হলেই সালাম দিয়ে তিনি বলতেন: আপা ভালো আছেন? মেয়ে কেমন আছে? বলতাম, ভালো। মেয়ে কী বলে জানেন? মেয়ে বলে, মা আন্টির নাম সান্ত্বনা। আমার নামও সান্ত্বনা (সুহিতা ব্যাপ্তি সান্ত্বনা)। তখন আমাদের রশিদুন মিষ্টি করে হাসতেন। পরিপাটি চালচলনের মতো তার হাসিও ভারি সুন্দর ছিল।
আমাদের কলেজের একটি সুরভিত ফুটন্ত গোলাপ অকালে ঝরে গেছে। তাই সেদিনের সূর্যালোক আমাদের কাছে ম্লান, দীপ্তিহীন ছিল। সেদিনের আঙিনায় সকল ফুল সৌরভহীন ছিল। কারণ হিংস্র সর্পিল প্রাণীর উদ্যত দংশনের মতো কঠিন রোগ আমাদের সাথীকে কেড়ে নিয়ে গেছে, নীড়হারা ঝড়োপাখি করে কোথায়, কোন্‌ অরণ্যপথে? তাই আমাদের হৃদয়ে ভর করেছে উদাস রিক্ততা। আমরা হারানোর বিষাদে বিমূঢ়। আমাদের সবাইকেও একদিন চলে যেতে হবে। পবিত্র কোরান শরীফের মর্মবাণীতে উল্লেখ রয়েছে মহান স্রষ্টা মাটি থেকে আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আবার মাটিতেই ফিরিয়ে নেবেন এবং পুনরুত্থান বা কেয়ামত দিবসে মাটি থেকে তুলবেন, পৃথিবীর যাবতীয় কর্মফলের জন্য। দুনিয়াতে মানুষ কী কী করেছে, সে সবের হিসাব নিকাশের জন্য। আল্লাহ তাকে যেখানে নিয়েছেন শান্তিতে রাখুন, তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাই, তারা যেন শোক সংবরণ করে রশিদুন্নাহার সান্ত্বনার একমাত্র ছেলেকে বড় করে তোলে।
অতীতে আমরা হারিয়েছিলাম অধ্যক্ষ নীলুফার জহুর, অফিসের প্রধান সহকারী খলিল সাহেব ও রাশেদুল করিমকে। প্রথম দু’জন অবসর গ্রহণের কিছুদিন পর কিন্তু রাশেদুল করিমের মৃত্যু ছিল আকস্মিক এবং অল্প বয়সে, চাকরিতে থাকা অবস্থায়। পেছন ফিরে দেখি, আমরা কাউকে ভুলিনি। ক্রমান্বয়ে সবাইকে মনে পড়ে। কিন্তু আজ আরও একজন অফিস স্টাফ মো: ইছহাক এর হঠাৎ মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। (১৭/১২/২০১৮) এ ইছহাক চলে যায় না ফেরার দেশে। এর আগের দিনও কর্মস্থলে তাঁর সাথে আমাদের দেখা হয়। তার চাকরি আরও ৪/৫ বছর ছিল। তার আত্মার শান্তি প্রার্থনা করি। এভাবে হারানোর বিষাদ আমাদের ব্যথিত করে তোলে।
২. লেখালেখি প্রসঙ্গ : অতীতের আনন্দ বেদনা সুখ-দুখ ঘাত প্রতিঘাত থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়। শিক্ষার সেই অভিজ্ঞতা চলার পথে আলো দেখায়। তাই লেখালেখির প্রেরণার আশায় আমার কিছু গ্রন্থ প্রকাশনার দিকে ফিরে দেখা। ইতোমধ্যে ছোট একটি পু্‌স্িতকা প্রকাশ হল। নাম ‘মাইজভাণ্ডারী দর্শনের মানসপুত্র কুতুবুল ইরশাদ সৈয়দ নুরুল বখতেয়ার শাহ (র.) জীবন চরিত ও কর্ম পরিক্রমা শীর্ষক গবেষণা গ্রন্থ ও আজকের তরুণ সমাজ।’ বদ্‌্‌রুননেসা সাজু, শেখ নিজাম উদ্দীন রচিত গ্রন্থের উপর আলোচনা লিখেছেন পটিয়া কেলিশহরের শ্রী হারাণ প্রসাদ বিশ্বাস এম.এ। বিস্তারিত আলোচনার ধারাবাহিকতায় লেখা দীর্ঘ হওয়াতে এটি ক্ষুদ্র পুস্তিকা আকার ধারণ করলো। সুফিতত্ত্ব গবেষণা ও মানব কল্যাণ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে আল কাজেমী অফসেট প্রিন্টার্স কদম মোবারক, চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত। শ্রী হারাণ প্রসাদ বিশ্বাসের (হারাণ মাস্টার নামে তিনি সুপরিচিত) ব্যতিক্রমধর্মী এই আলোচনা পুস্তিকা আগস্ট ২০১৮ এ প্রকাশ পায়।
উক্ত পুস্তিকার মধ্যে প্রথমে প্রকাশক, প্রকাশনা উপদেষ্টা এবং গবেষণা গ্রন্থে যাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়েছে, যাকে উৎসর্গ করা হয়েছে তাদের প্রত্যেকের নাম অত্যন্ত সমীহবোধে উচ্চারণ করেছেন শ্রী হারাণ প্রসাদ বিশ্বাস। এরপরই তিনি জ্ঞানগর্ভ বিশদ আলোচনা শুরু করেছেন। তরুণ সমাজকে বিশেষভাবে প্রাণিত করে এবং সবার জন্য মঙ্গলময় গ্রন্থ হিসেবে তিনি এ বইয়ের বিবিধ বিষয় পর্যালোচনা করেছেন। আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য আর জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল বিষয় পাথেয় করে সুখী সমাজ বিনির্মাণে এ দেশের পতাকা সগৌরবে উড়তে দিতে চান আলোচক। তাই তিনি আমাদের ভবিষ্যত স্বপ্ন বাস্তবায়নের তথা রূপায়ণের রূপকার আজকের তরুণ সমাজের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে তৎপর হয়েছেন। কেননা সব ভেদাভেদ ভুলে তরুণেরা ভালো কাজ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। পৃষ্ঠা-৬।
জীবন গঠনে সমাজ ও দেশের নেতৃত্বে তরুণেরা অংশগ্রহণে অগ্রগামী হতে পারবে। … এভাবে আলোচনার শেষ পর্যায়ে (শ্রী) হারাণ মাস্টার বলেন: এরূপ গ্রন্থাবলীর আলোকে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেকে আরও ভালোভাবে চিনে নিয়ে নিজের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভাকে প্রস্ফুটিত করার নব নব প্রেরণায় জেগে ওঠুক। অমঙ্গলের ভয়াল বাঁধন তরুণ সমাজের যাত্রাপথে যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ওদের চলার পথের পাথেয় হোক প্রতিদিনের অগণিত সুখবর। পৃষ্ঠা-১৩।
শ্রী হারাণ প্রসাদ বিশ্বাসের এ পর্যালোচনা আশা করি পাঠকের ভালো লাগবে। বৃদ্ধ বয়সের ভারে ন্যুজ্ব না থেকে ৩৩৬ পৃষ্ঠার গবেষণা গ্রন্থের ওপর আলোচনা করে তিনি দীর্ঘায়িত লেখার এ মহান কাজ সম্পন্ন করেছেন। তাই তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিবাদন। কেননা উৎসাহ প্রেরণার জীবনীশক্তি মানুষকে পরিশ্রম করতে উদ্যোগী করে। পড়ালেখার শ্রমে একীভূত হতে উদ্বুদ্ধ করে; অভিজ্ঞতার আলোকে লেখালেখি করতে যা খুব প্রয়োজন। অন্যথা উৎসাহ এর বিপরীতে উপেক্ষা দেখালে লেখালেখি হয় কী? যেহেতু সংসার জীবনের বিভিন্ন বৈষয়িক ঝামেলা ও জটিলতা একে একে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে অন্য সব কিছু বের করে দিতে চায়। তাই যার যেরূপ প্রতিভা আছে, সকলের প্রতিভা ও শ্রমের মূল্যায়ন দরকার, পরিচর্যা করা দরকার।
আত্মপ্রশংসা নয়, কৃতজ্ঞ হৃদয় নিয়ে আমি আবার অতীতের দিকে দেখি। কিছু গুণী ব্যক্তি আমার লেখার মূল্যায়নে কষ্ট শ্রম সময় দিয়ে প্রকাশিতব্য আমার গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন এবং গ্রন্থ প্রকাশের পর আলোচনা করে পত্রিকায় ছাপিয়ে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। আত্মসমালোচনায় প্রায়শ বলি, আশানুরূপ বা ইচ্ছানুযায়ী লেখার কাজ করতে আমি অপরাগ হয়েছি। এমন কী বই প্রকাশের ক্ষেত্রেও। তবু অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা দিয়ে উৎসাহিত করেছেন তাদের প্রত্যেকের নাম সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের নাম আমার ঐ গ্রন্থ সমূহের সাথে যুক্ত হয়ে আছে, থাকবে। আমার প্রাপ্তির নেপথ্যের সকল জ্ঞানী গুণীদের প্রতি আমার অশেষ অশেষ কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা। পাঠকের প্রতিও চট্টগ্রামের পাহাড় সবুজ বৃক্ষ প্রকৃতির রঙিন ফুলের সজীব শুভেচ্ছা। – যেই হওনা কেন তুমি হে পাঠক/প্রিয়বর কাব্য ভক্ত কবির/আমার প্রয়াসী নীলিমায় পর্যটক/তুমি দাও হিরন্ময় আবির;/প্রভাতী স্বর্ণালী রশ্মি আসুক প্রেমে/হৃদয়ে সরেজমিনে শিশিরে/কবিতা আমার নবান্ন হেসে/হোক ঝলমল কাব্যামোদী সমীরে॥ [আমার কাব্যগ্রন্থ-‘নারী জাগে কর্মযজ্ঞে আনন্দে’ থেকে]। ‘জীবন মানেই কাজ’ [সম্পাদনায় : গোলাম হাফিজ] এর লেখক মিখাইল ডিলানের ভাষায় : বড় হতে চাইলে চিন্তাকেও বড় করুন। ভালোবাসা ও আনন্দ ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে। এ রকম যারা তারাই সুখী হয়।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক; সহকারী অধ্যাপক, মহিলা কলেজ-চট্টগ্রাম

x