আটকে গেলো চমেক হাসপাতালের ১০৯ কর্মচারী নিয়োগ

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ

রতন বড়ুয়া

সোমবার , ১ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
245

হাজারেরও অধিক আবেদনকারীর মধ্য থেকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ১০৯ জনকে প্রাথমিক ভাবে চূড়ান্ত করা হয়। তাদের কাজে যোগদানের জন্য সম্ভাব্য তারিখও নির্ধারণ করে কর্তৃপক্ষ। তবে যোগদানের আগেই আটকে যায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ঘটনা ঘটেছে। টেন্ডার (দরপত্র) প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)। ৩০ সেপ্টেম্বর (গতকাল) ঢাকার সিপিটিইউ-তে দুই পক্ষের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। চমেক হাসপাতাল প্রশাসনের পক্ষে উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম শুনানিতে অংশ নিয়েছেন।
এদিকে, উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে গতকাল শুনানি হলেও সিদ্ধান্ত জানতে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে বেশ কয়েকদিন। শুনানি পরবর্তী ১২ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানা যাবে বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। এ তথ্য নিশ্চিত করে উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, কাজ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি এ অভিযোগ করেছে। নিয়োগ কার্যক্রম পুরোটাই যথাযথ নিয়ম মেনে হয়েছে দাবি করে উপ-পরিচালক বলেন, টেন্ডারে অংশ নেয়া সব প্রতিষ্ঠান তো আর কাজ পায় না। যোগ্য হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। তবে কাজ না পেলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। এই প্রতিষ্ঠানটিও কাজ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করেছে। তবে তাদের অভিযোগের ভিত্তি বা সত্যতা কোনটাই নেই বলে মন্তব্য করেন হাসপাতালের উপ-পরিচালক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আউটসোসির্ংয়ের মাধ্যমে ১০৯ জন কর্মচারি নিয়োগের লক্ষ্যে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কার্যক্রম শুরু করে চমেক হাসপাতাল প্রশাসন। এর আওতায় টেন্ডার আহ্বান করলে মোট ১০টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। অংশ নেয়া ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সিকিউরিটি অর্থ জমা না দেয়ায় ১টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন বাতিল করা হয়। আর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ঠিক না থাকায় অযোগ্য হয় ৬টি প্রতিষ্ঠান। বাকি ৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান শাপলা এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল প্রশাসন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাকি সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ১০৯ জনকে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। চূড়ান্ত হওয়াদের কাজে যোগদানের সম্ভাব্য তারিখও (গত ২৩ সেপ্টেম্বর) নির্ধারণ করে হাসপাতাল প্রশাসন। কিন্তু এর আগেই ঢাকার সিপিটিইউ-তে অভিযোগ দেয় ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আরাব সার্ভিস। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, টেন্ডারে তারা সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন চমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম। উপ-পরিচালক জানান, প্রতিষ্ঠানটি (আরাব সার্ভিস) ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাঙ বাদ দিয়ে দর দিয়েছে। সে হিসেবে তারা সর্বনিম্ন দরদাতা দাবি করছে। কিন্তু নিয়মানুযায়ী, ভ্যাট ও ইনকাম ট্যাঙ যোগ করে দর ধরতে হবে। সে হিসেবে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান শাপলা এন্টারপ্রাইজ। নিয়মানুযায়ী যোগ্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠানটিকে কাজটি দেয়া হয়েছে।
শুনানিতে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন বলেও জানান ডা. আখতারুল ইসলাম।
প্রসঙ্গত, পদে পদে টাকা আদায় ছাড়াও রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং হয়রানির বিস্তর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অবৈতনিক বা স্পেশাল কর্মচারি না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় চমেক হাসপাতাল প্রশাসন।
অবৈতনিক কর্মচারিদের স্থলে বেতনধারী কর্মচারি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর কর্মচারি নিয়োগের ক্ষেত্রে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেই নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেই হাসপাতালের ৪র্থ শ্রেণির ১০৯টি শূন্য পদে কর্মচারি নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে হাসপাতাল প্রশাসন। এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারি মাসিক ১৪ হাজার ৪৯০ টাকা হারে বেতন পাবেন। একজন কর্মচারির জন্য এই বেতন মোটামুটি চলনসই বলছে হাসপাতাল প্রশাসন।
হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য মতে, প্রশাসনিক অনুমোদন থাকা ১৩১৩ শয্যার এই হাসপাতালে দৈনিক কম হলেও আড়াই হাজার রোগী ভর্তি থাকে। কিন্তু জনবল রয়েছে ৫০০ শয্যার। ৫০০ শয্যার হিসেবে হাসপাতালে সরকারি কর্মচারির (৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির) মোট পদ সংখ্যা ৬০৯টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছে ৪৫০ জন। বাকি ১৫৯ টি পদ শূণ্য। ৩য় শ্রেণির মোট ১৩১টি পদে কর্মরত আছে ৮১ জন। বাকি ৫০টি পদ শূণ্য। আর মোট ৪৭৮ টি পদে ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারি রয়েছে ৩৬৯ জন। এই শ্রেণির (৪র্থ) শূণ্য পদের সংখ্যা ১০৯টি।
অন্যদিকে, হাসপাতালে অবৈতনিক বা স্পেশাল কর্মচারির সংখ্যা কাগজে-কলমে ৩০০ জন হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা ৫ শতাধিক। কঠোর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় কেউ যায়-আবার কেউ আসে। কখন কে যায়- কে আসে তার ঠিক-ঠিকানাও নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অবৈতনিক বা স্পেশাল এই কর্মচারিদের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ গরীব-অসহায় রোগীদের চিকিৎসা সেবায় একমাত্র ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিতি এই হাসপাতালে। চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রতি পদে পদে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এসব কর্মচারির বিরুদ্ধে। তাছাড়া টাকা দিলেও রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের সাথে দুর্ব্যবহার ও হয়রানির অভিযোগও নেহাত কম নয়। হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান নিয়ে এ পর্যন্ত দু’বার গণশুনানির আয়োজন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের দুই দফা শুনানিতে বেশির ভাগ অভিযোগই ছিল এসব স্পেশাল বা অবৈতনিক কর্মচারির বিরদ্ধে। এছাড়া নিজেদের উদ্যোগে চমেক হাসপাতাল প্রশাসনও কয়েক দফা গণশুনানির আয়োজন করে। এসব শুনানিতেও অধিকাংশ অভিযোগ পাওয়া যায় এই অবৈতনিক কর্মচারিদের বিরুদ্ধেই। সবমিলিয়ে সরকারি এই হাসপাতালে ‘টাকা ছাড়া কিছুই হয়না’ এমন অভিযোগের শিকড়ও গেড়েছে এসব কর্মচারির বদৌলতে। কিন্তু বেতন-ভাতা দিতে না পারায় এসব কর্মচারিদের আশানুরূপ ভাবে নিয়ন্ত্রণও করতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর প্রেক্ষিতে অনেকটা বাধ্য হয়েই এসব অবৈতনিক বা স্পেশাল কর্মচারি আর না রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে হাসপাতাল প্রশাসন। তাদের স্থলে বেতনধারী কর্মচারি নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
হাসপাতাল প্রশাসন বলছে, মাসিক নির্ধারিত বেতনে এসব কর্মচারি নিয়োগের ক্ষেত্রে থাকছে কঠিন শর্ত। এসব কর্মচারির বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে কঠিন ব্যবস্থা নেয়ারও বিধান থাকছে। এতে করে চাকরি হারানোর ভয় থাকবে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারিদের। ফলে তাদের নিয়ন্ত্রণও সহজ হবে। এর মাধ্যমে রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের হয়রাণির মাত্রা অনেকটাই কমবে বলে আশাবাদ হাসপাতাল প্রশাসনের।
আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মাসিক নির্ধারিত বেতনে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারিরা রোগী কিংবা সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে আর কোনো ধরনের টাকা দাবি করতে পারবে না জানিয়ে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আখতারুল ইসলাম বলেন, রোগী ও সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে টাকা দাবি বা হয়রানির অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারিকে চাকরি থেকে ছাটাই করা হবে।

x