আজ নুসরাতের কথা মনে পড়ছে খুব

শনিবার , ২৬ অক্টোবর, ২০১৯ at ৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ
97

নুসরাত জাহান রাফির নির্মম হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রথম লেখাটি লিখেছিলাম- ১৩ এপ্রিল ২০১৯। টাইটেল ছিল- ‘নুসরাতের কাছে চিঠি’। এর মাসে দেড়েক পর অর্থাৎ গত ২৫ মে প্রিয় ও ভালোবাসার দৈনিক আজাদীর এই পাতায় ‘এবার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করছি’ টাইটেলে আরও একটা লেখা লিখেছিলাম। কারণ, ওই সপ্তাহেই পত্রিকার পাতায় খবর বেরিয়েছিলো- ‘…১৬ জনকে আসামি করে ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র প্রস্তুত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)ৃ।’
তখন লিখেছিলাম- ‘পত্রিকার পাতায় এমন একটি খবর পড়ে বেশ ভালো লাগছে। আরও ভালো লাগছে এই খবর দেখে যে- নুসরাত হত্যার ঘটনা তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ইতোমধ্যে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া- সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন, এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইউসুফ এবং এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল আহাম্মদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনে ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি কে এম এনামুল করিমের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে বলে। রাফি হত্যামামলা দায়েরের প্রায় দেড় মাসের মাথায় এমন অগ্রগতিই এই ভালো লাগার কারণ।’
লেখাটিতে সেদিন ধন্যবাদ দিয়েছিলাম পিবিআই’র প্রধান জনাব বনজ কুমার মজুমদারকে। সেদিন লিখেছিলাম- ‘‘একজন সাধারণ-সচেতন মানুষ হিসেবে উনাকে একজন চৌকষ, বুদ্ধিদীপ্ত ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেই চিনতাম। কারণ, দীর্ঘদিন তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। আবারও তিনি প্রমাণ করলেন- তাঁর দক্ষতা, আন্তরিকতা এবং মানবিকতা।…যাই হোক, নিকটঅতীতে সংঘটিত এইধরনের লোমহর্ষক ঘটনার মতো আমাদের শুনতে হলো না- ‘আমরা বাকী অপরাধীদের ধরার জন্য বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়েছি’, ‘আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে’, ‘আসামিকে পাওয়া যচ্ছে না’, আসামি পলাতক’ -ঘরানার গৎবাঁধা কিছু বুলি? জানি- অভিযুক্তদের হাত, অত্যাচারীদের হাত সবসময়ই লম্বা থাকে। আমরা চাই, অতিদ্রুত এই ঘটনার বিচার হোক। দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্যে শাস্তি হোক অপরাধীদের।”
লেখাটি প্রকাশের পর, মানে ২৫ মে থেকে আজ ২৪ অক্টোবর। এরই মাঝে আমি আবারও খুশি। পুরো দেশবাসীর সঙ্গে এই খুশি আমিও ভাগ করতে চাই। তাই, এ লেখার অবতারণা। মামলার পর বিচারক আদালতে মাত্র ৬১ কার্যদিবসের মধ্যে এই রায় ঘোষণা করা হয় আজ ২৪ অক্টোবর। এতে নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাসহ ১৬ জনের ফাঁসির রায় ঘোষণা করা হয়।
২৪ অক্টোবর বেলা সোয়া ১১টার দিকে ফেনী জজ কোর্টের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ রায় ঘোষণা করেন। দৈনিক ডেইলি স্টারের অনলাইন সংস্করণের বরাত দিয়ে জানতে পারি- “…চার্জশিটে উল্লেখিত আসামিরা হলেন- এস এম সিরাজ উদ দৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে চম্পা/শম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), মোহাম্মদ শামীম (২০), রুহুল আমিন (৫৫) এবং মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।…রায়ে নিহত নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা সন্তোষ প্রকাশ করে রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি তার পরিবারের নিরাপত্তা চেয়েছেন…।”
তবে খবরে প্রকাশ- এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী। এই রায় নিয়ে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন বলেও জানা যায়। রায় ঘোষণার পর ফেনীর বর্তমান পুলিশ সুপার (এসপি) খোন্দকার নূরন্নবী গণমাধ্যমের কাছে তার সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন যে তারা নিষ্ঠার সঙ্গে তদন্ত করেছেন। তাঁর মতে, দ্রুততম সময়ে দেওয়া এই রায়ের মাধ্যমে অপরাধীরা আতঙ্কিত হবে।
এদিকে, বাংলাদেশের বহুল আলোচিত এই ফাঁসির আদেশের খবর বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রভাবশালী গণমাধ্যম। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি রায় ঘোষণার পরপরই তাদের অনলাইন সংস্করণে এটিকে প্রধান সংবাদ প্রকাশ করে।
বিবিসির প্রধান এই সংবাদে বলা হয়েছে, “শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনার পর এক মাদরাসা ছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যায় অভিযুক্ত ১৬ জনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের একটি আদালত।” খবরটিতে আরও বলা হয়- “…এ ধরনের হত্যা মামলা যে দেশটিতে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে সেখানে নুসরাত হত্যার মামলায় রায় খুব অল্পদিনের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী হাফিজ আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে কেউ খুন করে যে পালিয়ে যেতে পারেন না; এটা প্রমাণিত।”
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা ‘নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বাংলাদেশে ১৬ জনের ফাঁসি’ শিরোনামে তাদের দ্বিতীয় প্রধান সংবাদ প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি ইসলামিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনার পর এক মাদরাসা ছাত্রীকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায় প্রকাশ করেছেন আদালত। মাদরাসার অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ফরাসী বার্তা সংস্থা এএফপি নুসরাত হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যার দায়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের একটি আদালত ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন। গত এপ্রিলে মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনা হয়; অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনায় নুসরাতেরই তারই কিছু বান্ধবী ও মাদরাসার শিক্ষার্থী তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। এ ঘটনায় সেই সময় দেশজুড়ে প্রচণ্ড বিক্ষোভ দেখা দেয়।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স ‘যৌন হয়রানির মামলায় কিশোরীকে হত্যায় অভিযুক্ত ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলছে, এক কিশোরীকে খুনের ঘটনায় ধর্মীয় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষসহ অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন বাংলাদেশের আদালত। ওই কিশোরী তার প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছিলেন; পরে সেটি প্রত্যাহার করে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।
এছাড়াও ঘাতকদের ফাঁসির এই আদেশের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, সিঙ্গাপুরের দৈনিক স্ট্রেইট টাইমস, কানাডার সংবাদমাধ্যম সিটিভি নিউজ, পাকিস্তানের এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিশ্বের অনেক গণমাধ্যম (সূত্র: অনলাইন সংস্করণ, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রবেশ: সন্ধ্যে ৭টা, ২৪ অক্টোবর)।
আপনারা জানেন- গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় বর্বর-পাষণ্ড কিছু মানুষ। শরীরের ৮০ শতাংশ পোড়া নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচদিন লড়ার পর মারা যান রাফি। করুণ মৃত্যুর এই ঘটনাটি সারা দেশের মানুষকে তখন কাঁদায়। অনলাইন-অফলাইনে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও নিজে খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন নুসরাতের। উন্নত চিকিৎসার জন্য ওকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্যও নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু, শেষরক্ষা হয়নি।
পরিশেষে শুধু বলবো- আমরা চাই- কন্যাশিশু থেকে বয়েসী নারী, পাঁচ বছর কিংবা পঞ্চাশ বছর- সব নারীই নিরাপদ থাকুক পুরুষালি থাবা থেকে। নারীর চলাচলের পথ-ঘাট, খেলাধুলার স্থান, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- সব জায়গা-ই নিরাপদ থাকুক। মৃত্যুর কাছে না হেরে লড়ে যেতে চেয়েছিলো নুসরাত। পারেনি। আজ নুসরাতের কথা মনে পড়ছে খুব। এই রায়ের মতো খাদিজা, পূজা, তনুসহ প্রতিটি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করছি। এখন হয়তো আপিল করবে অভিযুক্তরা। কিন্তু, প্রকৃত দোষীদের যখন শাস্তি কার্যকর হবে তখনই কেবল নুসরাত জাহান রাফির বিদেহী আত্মা শান্তি পাবে। আর আমরা কিছুটা হলেও পাবো স্বস্তি। সেই অপেক্ষায় রইলাম আবারও।

x