আজও রোকেয়া

শনিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। মুসলিম নারী জাগরণে নারী শিক্ষাকে তিনি ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। রক্ষণশীল, অবরুদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠা বেগম রোকেয়া নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে নারী সমাজের অবর্ণনীয় দুর্গতির বাস্তব চিত্র লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেন কখনো শ্লেষ বা বিদ্রূপের খোঁচা দিয়ে, কখনো কৌতুকরস সৃষ্টি করে, কখনো বা বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ হাজির করে। নিজ জীবনের রক্ষণশীল, পশ্চাদপদতাকে জীবনের অভিজ্ঞতা হিসেবে নিয়ে তৎকালীন সমাজের বিরুদ্ধে যান বেগম রোকেয়া। গড়ে তোলেন স্কুল, প্রতিষ্ঠা করেন নারী সংগঠন। ঊনিশ শতকে বাংলার মুসলিম সমাজে বেগম রোকেয়ার আগে মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন নিজস্ব উদ্যোগে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারীকে শিক্ষিত করার জন্যে। কিন্তু বেগম রোকেয়া স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শুধুমাত্র নারীদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে নয়। তিনি নারীকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবার জন্যে মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে শিক্ষিত করতে চেয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে নারীমুক্তিই ছিল তাঁর জীবনাদর্শ ।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রকৃত নাম ছিল রোকেয়া খাতুন। বিয়ের পর রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রোকেয়ার পিতার নাম জহির উদ্দিন মুহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের। মাতা রাহাতুন্নেসা সাবের চৌধুরী। তার দুই ভাই আবুল আসাদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম সাবের ও খলিলুর রহমান আবু জায়গাম সাবের। দুই বোন করিমুন্নেসা ও হোমেন। রোকেয়া কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন শৈশবের বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা আছে তাঁর লেখায়- “বালিকা বিদ্যালয় বা স্কুল কলেজ গৃহের অভ্যন্তরে আমি কখনও প্রবেশ করি নাই। কেবল জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অসীম স্নেহ ও অনুগ্রহে যৎসামান্য লেখাপড়া শিখিয়াছি।অপর আত্মীয় স্বজনেরা আমার শিক্ষায় উৎসাহ দান করিবেন দূরে থাকুক বরং নানা প্রকার বিদ্রুপ ও উপহাস করিতেন কিন্তু তথাপি আমি পশ্চাৎপদ হই নাই। ভ্রাতাও কাহারও বিদ্রুপে ভগ্নোৎসাহ হইয়া আমাকে পড়াইতে ক্ষান্ত হন নাই।
১৮৯৬ সালে ভাগলপুর নিবাসী উর্দুভাষী সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রোকেয়ার। সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তিনি উড়িষ্যার কনিকা স্টেটের কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ম্যানেজার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত এবং উদার মনের মানুষ ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন। রোকেয়াকে তিনি ইংরেজি শিখতে সহায়তা করেন।
রোকেয়া ছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত। রোকেয়া তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন যে, শিক্ষার অভাবই নারী জাতির অধঃপতনের মূল কারণ। এবং তৎকালীন সমাজের পর্দা প্রথা, অবরোধ প্রথাই নারী শিক্ষার পথে বাধা। তাই তিনি অবরোধ প্রথার অবসান ঘটিয়ে উপযুক্ত শিক্ষা লাভের মাধ্যমেই নারীর প্রকৃত স্বাধীনতা ও মুক্তিলাভ সম্ভব হতে পারে মনে করতেন। তাঁর রচিত ‘মতিচুর’, অবরোধবাসিনী, ‘সুলতানার স্বপ্ন, ‘পদ্মরাগ’ প্রভৃতি গ্রন্থে তিনি মুখ্যভাবে এটাই প্রচার করেছেন।
১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর ভাগলপুরে খলিফাভাগে নিজেদের বাড়িতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র পাঁচ জন ছাত্রী নিয়ে তিনি সূচনা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। ১৮৭৩ সালে বেগম রোকেয়ার আগেও আমরা জানি কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুল এছাড়াও ১৮৯৭ সালে মুর্শিদাবাদে নবাব বেগম ফেরদৌস মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি স্কুল এবং ১৯০৯ সালে সোহরাওয়ার্দ্দী পরিবারের খুজিস্তা আখতার বানু আর একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু বেগম রোকেয়া নারী শিক্ষা সম্পর্কিত চিন্তার বাস্তব প্রয়োগ করেন স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তিনি মনে করতেন তৎকালীন সমাজের নারীদের অবরোধ প্রথাসহ নানা কুসংস্কার হতে মুক্ত করতে হলে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এবং এই নারী শিক্ষা নিয়ে তিনি তার সাহিত্যসহ নানা কর্মে স্বাক্ষর রেখেছেন।
বাংলার নবজাগরণের সবচেয়ে বড় আলোড়ন তৈরি করে নানা সংস্কারমূলক আন্দোলন। আর এই সংস্কার আন্দোলনের প্রধান প্রবক্তা হলেন রামমোহন রায় (১৭৭৫-১৮৩৩)। ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক মানুষ বলা হয় তাঁকে। সতীদাহের মত অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে তিনি প্রথমে লিখেন এবং পরবর্তীতে আইন করে তা নিষিদ্ধ করেন। তাঁর এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আবির্ভাব ঘটে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। যিনি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ প্রথা বাতিলসহ বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। এছাড়া দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন, বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী, অক্ষয় কুমার দত্ত, মধুসূদন দত্ত, ‘ইয়ং বেঙ্গল’ আন্দোলনের ডিরোজিও প্রমুখ নবজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও মুসলিম সমাজে এ আলোড়ন তৈরি হয় অনেক দেরিতে। নবাব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলীর মতো মানুষেরা এ আন্দোলনের সূচনা করলেও আব্দুল ওদুদ, নজরুল, রোকেয়া প্রমুখ মনীষীরা এ নবজাগরণে বিরাট অবদান রাখেন। আর রোকেয়া তাঁর সময়ের অবরোধ প্রথা, পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে লেখেন এবং নারী সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে তার চিন্তাকে সংগঠিত করেন। রোকেয়ার কর্মজীবন আলোচনা করতে হলে সেখানে তাঁর স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং স্কুল নিয়ে যে সাধনা কিংবা স্কুলকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামই প্রধান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই স্কুলের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ঊনিশ শতকের শেষভাগে আমরা দেখি যে, মুসলিম সমাজে যে শিক্ষার জাগরণ শুরু হয় তার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সভা-সমিতি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। ১৯১৬ সালে রোকেয়া গড়ে তোলেন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ ‘আঞ্জুমান’ মানে সভা, খাতুন মানে নারী আর খাওয়াতিন খাতুনের বহুবচন। অর্থাৎ মুসলিম নারীদের সভা বা সংঘ। বেগম রোকেয়ার সারা জীবনের সাধনা ছিল নারীর জাগরণ। নারী জাগরণে তিনি তাঁর লেখায়, সাহিত্যে, চিন্তায় নারী শিক্ষার বিষয়টি তুলে এনেছেন। নারী শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বেগম রোকেয়া বলেছেন, এদেশে স্ত্রী শিক্ষার অভাব কারণ এ দেশীয় নারী ভূমিষ্ঠ হয়েই শুনতে পান নারী দাসী এবং চিরকাল দাসীই থাকবেন। সুতরাং তার মন পর্যন্ত দাসীতে পরিণত হয়। নারীর সুপ্ত মানসিক শক্তিকে শিক্ষাই কেবল জাগরুক করতে পারে। শিক্ষার আলোই অন্ধ নারীকে দেবে যথার্থ দৃষ্টিশক্তি। আর সে দৃষ্টি দিয়েই নারী বুঝে নেবেন মানুষ হিসেবে তার মৌলিক অধিকার। রোকেয়া আরো বলেছেন- ‘বুক ঠুকিয়া বল মা; আমরা পশু নই; বল ভগিনী; আমরা আসবাব নই; বল কন্যে; আমরা অলঙ্কাররূপে লোহার সিন্দুকে আবদ্ধ থাকিবার বস্তু নই: সকলে সমস্বরে বল আমরা মানুষ।
পরিশেষে বলা যায়, ঊনিশ শতকের নারীর সমান অধিকারের প্রশ্নে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার পথপ্রদর্শক হিসেবে রোকেয়া এই ভারতীয় উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রোকেয়া তাঁর চিন্তায়, কর্মে, লেখায় সর্বোপরি জীবন সাধনার অংশ হিসেবে নারীর মুক্তিকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কর্মে, দক্ষতায়, চিন্তায় নারী কোন অংশে পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়, এটিই ছিল রোকেয়ার দর্শন এবং এই চিন্তাদর্শনের প্রভাব আজ একবিংশ শতাব্দীর নারী আন্দোলনের এক প্রেরণা। নারীরা আজ সমাজের সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। রোকেয়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হিসেবে আজ আমরা দেখি নারীরা ডাক্তার, জজ, ব্যারিস্টার, ম্যাজিস্ট্রেটসহ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনায়কের ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত। নারী পুরুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিংবা জেণ্ডার সমতার লক্ষ্যে নারীর যে সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে সে সংগ্রামে আজও নারীমুক্তির পথ প্রদর্শক রোকেয়া।

x