আঙুলে আঙুল: বাস্তবতার অনুপম দৃষ্টান্ত

রুমান হাফিজ

মঙ্গলবার , ১৮ জুন, ২০১৯ at ৫:২৮ পূর্বাহ্ণ

মাবরুর রশিদ বান্নাহ।ব্যতিক্রমী এক স্বপ্নবাজের নাম।কিন্তু কেন?
বান্নাহ যে শুধু নামেই ব্যতিক্রম তা কিন্তু নয়। তিনি কাজেও ব্যতিক্রম। তাঁর কাজের মধ্যেও তাকে বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে আরেকটু ভিন্নভাবে। কিভাবে? এই যে তিনি যেসব কাজ করছেন সেসবের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয় তাঁর ব্যতিক্রমতা। যেখানে নাটক মানেই আমরা সাধারণত দেখি বা অনুভব করি প্রেম-ভালোবাসা,কাউকে না পাওয়ার কষ্ট কিংবা ভালোবাসার পথে কারো বাধা, প্রতিবন্ধকতা। আবার সেই সূত্র ধরে ঝগড়া, হিংসা, মারামারি এবং খুনের মত ঘটনারও চিত্র।
এই জায়গাতেই বান্নাহ ব্যতিক্রম। প্রেম ভালোবাসার ছড়াছড়ির মাঝে থেকেও তিনি সর্বদা চিন্তা করেন ভিন্ন কিছু। সেখানে প্রেম আর ভালোবাসার চিরন্তন সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে নয় এসবের সাথে তিনি তুলে ধরেন মা,মাটি,দেশের প্রতি ভালোবাসা,মানুষের জীবনের বাস্তব দিক গুলো,সুখ-দুঃখ আর চিরাচরিত ভুলগুলোর চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চান,জাগাতে চান। বলতে গেলে তাঁর প্রতিটা কাজেই কোনো না কোনভাবে একটা ম্যাসেজ দিতে চান।
যার ব্যত্যয় ঘটে নি “আঙুলে আঙুল” নাটকের ক্ষেত্রেও। গল্পের নায়ক মিরাজ (তাহসান খান) গ্রামের সহজ পরিবেশে নিজের সর্বোচ্চ মেধা আর চেষ্টা দিয়ে লেখাপড়া করেছে। ভালো রেজাল্টও হয়েছে। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে এগ্রাম ওগ্রাম ঘুরে ঘুরে টিউশনি করে মধ্যবিত্ত সংসারে সহযোগিতা করতো। মফস্বল এলাকা থেকে কষ্ট করে ঢাকায় এসে চাকরির ইন্টারভিউ ঠিকঠাক দেওয়া মিরাজের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। বাবা ডেকে নিয়ে বললেন, পূর্ব পরিচিত একজন স্যারের সাথে কথা বলেছেন। ওখানে সে থাকতে পারবে লজিং মাস্টার হিসেবে। তাহলে ঢাকায় চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে সুবিধা হবে। বাবার কথামতো মিরাজ চলে আসেন ঢাকার লজিং বাড়িতে। বাড়ির কর্তা সাহেব নিজের দুই মেয়ে জান্নাত(নুসরাত ইমরোজ তিশা) আর হুরায়রার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ছোট মেয়ে হুরায়রাকে প্রতিদিন পড়াতে হয়। তখন জান্নাত লজিং মাস্টারের জন্য নাস্তা নিয়ে আসেন। ঘরে খাবার দিতে গিয়ে প্রথম চোখে চোখ পড়ে উভয়ের। এক ফাঁকে কথা হয়। অনার্স শেষ করলেও বাবার কড়াকড়িতে কোথাও কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে জান্নাতকে। কিন্তু স্বপ্ন অনেক বড়। এরকম টুকটাক নানা কথা চলে মাঝে মধ্যে। মিরাজ আস্বস্ত করে, স্বপ্নের বাস্তবতায় বিশ্বাসী হতে। জান্নাতকে স্বপ্ন দেখতে বলে। একবার কবিতাকে ভালোবাসা জান্নাতকে নতুন করে আবিষ্কার করে মিরাজ৷ ততদিনে একে অপরের প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। দেখা হয়, পছন্দের জিনিস উপহার কিংবা গল্পের ফাঁকে হাসি সব..। এসবই চলছিলো বাড়ির কর্তা মানে জান্নাতের বাবার আড়ালে।
কয়েকমাস যেতে না যেতেই চাকুরি পেয়ে যান মিরাজ। বাড়িতে এসেই কর্তা সাহেবকে সুখবর দিলো। খুশিতে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করতেও ভুল হয় নি। তখনই কর্তা সাহেব নিজে থেকেই লজিং মাস্টার মিরাজকে আরেকটা সুখবর শোনালেন, জান্নাতের বিয়ে ঠিক করেছেন তার পছন্দের পাত্রের সাথে। বেশ নামি দামি ছেলে। বিদেশে থাকে। অনেক টাকা পয়সার মালিক। চাকুরি পাওয়ার খুশিটা মুহূর্তেই বিবর্ণ হয়ে গেলো মিরাজের। হয়তো এমন খবর তার প্রত্যাশিত ছিলো না। নিজেকে ঠিক করে নিয়ে কর্তা চাচার হাতে মিষ্টির প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে রুমে যায়।
এদিকে জান্নাত বিয়ের সংবাদ শোনার পর থেকে আরো বেশি ভেঙে পড়ে। কি করবে ঠিক বুঝতে পারে না। স্বপ্নের পূর্ণতার জন্য সে সব করতে রাজি। কিন্তু এমন অচেনা অজানা, বিদেশি ছেলের সাথে কোনোভাবেই বিয়ে করতে রাজি না। সিদ্ধান্ত নেয় মিরাজকে সাথে নিয়ে পালাবে। গভীর রাতে মিরাজের দরজায় কড়া নাড়ে জান্নাত। এতো রাতে এভাবে জান্নাতকে দেখে “থ” হয়ে যায় মিরাজ। জান্নাত কান্নায় ভেঙে পড়ে। সব খুলে বলে মিরাজের কাছে।
“প্লিজ আপনি আমাকে বাঁচান,নইলে বাবা ওই বিদেশি ছেলের সাথে বিয়ে দিবে। ওরা আমাকে আর কোত্থাও বের হতে দেবে না। আমার সব স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে যাবে। প্লিজ!”
সহজ প্রকৃতির মিরাজ তখন কি করবে ভেবে পায় না। কোনোভাবেই সাড়া দিতে পারছিলো না। শেষতক পা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে জান্নাত। সহ্য করতে না পেরে দরজা আটকে দেয় মিরাজ। অনেকক্ষণ ভেবে জান্নাতের ভালোবাসার টানে বেরিয়ে পড়ে অজানা পথে। তখনই বেজে ওঠা শিল্পী ইমরান ও কনার কন্ঠে গাওয়া গানের পঙক্তি, “ভালোবাসা জানে না হেরে যেতে,ভালোবাসা জানে শুধু বেড়ে যেতে…।”
বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয় দুজন। দেরিতে হলেও উভয়ের পারিবারিক ঝক্কি-ঝামেলার অবসান ঘটে। মিরাজের অফিস আর জান্নাতের লালিত স্বপ্নের ব্যবসা। সব মিলিয়ে ছোট্ট সংসারে সুখের কমতি নেই। একে অপরের কাজে সহায়তা, খাবার মুখে তোলে খাওয়ানো, ঝগড়া, খুনসুটি সব ছিলো, সব। সেই সুখের ঝর্ণায় কাটা পড়ে, শকুনের কালো থাবা গ্রাস করে। এক রাতে ব্যবসার কাজে বের হওয়া জান্নাতকে সমাজের তথাকথিত কিছু মানুষরূপী অমানুষদের লালসার শিকার হতে হয়। পরদিন খোলা মাঠে এক স্বপ্নবাজ জান্নাত আর পেটের ভেতরে দুনিয়ায় আলো বাতাস না দেখা নির্দোষ আরেক জান্নাতের লাশ দেখতে ভিড় করে উৎসুক জনতা। সেই ভির ঠেলে জান্নাতকে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে মিরাজ। আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে তার কান্নার শব্দে। যে কান্না শুনতে পায় না এই পৃথিবীর কেউ,কেউই না।
নিজের সব হারিয়ে অসহায় মিরাজের অবস্থা পাগলের মতো। জান্নাতের নৃশংস নির্যাতনের সাথে জড়িতদের একে একে নিজ হাতে খুন করে। সশরীরে হাজির হন পুলিশের কাছে। নিজের অপরাধের জন্য নিজেই শাস্তি চান মিরাজ। কান্নাভেজা চোখে তখন পুলিশ অফিসারের কাছে জুড়ে দেন কিছু প্রশ্ন। আর বারবার ভেসে আসছিলো একটা আর্তনাদ, আর যেনো কোনো স্বপ্নবাজ জান্নাতকে এভাবে চলে যেতে না হয়। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটে নাটকের।
নাটকের বাস্তবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো কতটা অসহায় এখনো আমাদের নারী সমাজ। কিন্তু কেন? এরা কি এই সমাজের বাইরের কেউ? না। আপনার মা,আমার বোন কিংবা এইরকম কারো রক্তের সম্পর্কের কেউ। আর কতো দিন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে পড়ে থাকবে আমার সমাজ? আমার লাল সবুজের পতাকা? সুজলা সুফলা সোনার বাংলা? আসুন না, একটু জাগি,একটু সচেতন হই,একটু মানবিক হই,একটু প্রতিবাদ করতে শিখি। দেরি কেন? আজই শুরু হোক এ পরিবর্তন।

x