আউটসাইডার

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ২৭ আগস্ট, ২০১৯ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
538

‘সূর্য যেদিকে অস্ত যায়, সেইদিকে এফডিসি।’
-মারজুক রাসেল
কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, বাংলা সিনেমায় গান লিখেছেন, এমন কয়েকজন গীতিকারের নাম বলুন। নির্দ্বিধায় অনেক নাম চলে আসবে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মাসুদ করিম, মো. রফিকুজ্জামান, কবির বকুল… নামের শেষ নেই।
আমি জানি, এই তালিকায় বেশিরভাগ মানুষই মারজুক রাসেলের নাম নেবেন না। অথচ তিনি এমন একজন গীতিকার, যিনি বিএফডিসিতে না গিয়েই বাংলা সিনেমার গানে ফুল ফুটিয়েছেন। এরকম ট্র্যাক রেকর্ড এখন পর্যন্ত আর কোনো গীতিকারের নেই। আমি মারজুক রাসেলের তিনটা ফুলটোক্কার কথা বলবো।
এক, মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর ‘ব্যাচেলর’ সিনেমার ‘সিক্সটি নাইন’। এখানে আইয়ুব বাচ্চু যখন গায়- ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার ওপরে পড়েছে ..’। কারো কি মনে হয় এটা বাংলা সিনেমার গান? উত্তর দিতে হবে না। একটা ইনফরমেশন দিচ্ছি- এটা বাংলা সিনেমার প্রথম ব্লুজ। অদ্ভুতভাবে মারজুক রাসেলই লিখে ফেলেছেন-
আমি তো ভালোবাসিনি,
ভালোই আমাকে বেসেছে;
ভালো আমাকে বেসে মন্দ করেছে।’
৭০, ৮০ ও ৯০ দশকের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বাংলা সিনেমার গান প্রেম প্রকাশে সবসময় ভার্জিন ছিল। ফুল, পাখি, আকাশ, বাতাস, পাথর অথবা চাঁদ, নদী, সাগর (যা কিছু আমরা দূষিত করে ছেড়েছি) এগুলোই ওই সময়ের প্রেমের গানের উপাদান। ফ্রেশ কোনো স্টাইল ছিল না।
‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’ হলো প্রথম একটা ভালোবাসার গান, যেখানে কোনো নারী চেহারা নেই। বাংলা ভাষার বেশিরভাগ গীতিকার প্রেমের গান লিখতে গিয়ে মেয়েদের প্রপোজ করে ফেলেন; মারজুক রাসেল এই কাজ করেননি। তিনি প্রথমেই নারী ফেলে দিয়েছেন। তারপর প্রেম, স্বপ্ন আর ভালবাসাকে তিনটা চ্যাপ্টার করে নিজের অবস্থা বর্ণনা করেছেন।
দুই, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ (২০০৭) সিনেমার ‘দ্বিধা’ (বাহির বলে দূরে থাকুক, ভেতর বলে আসুক না)। এই এক গান, যেটার জন্য কম্পোজার, গায়িকা সবাই পুরস্কার পেয়েছেন। শুধু গীতিকার পাননি। যদিও দ্বিধা বাংলা গানের মাইলস্টোন। মনে করিয়ে দিই-
‘ঢেউ জানা এক নদীর কাছে
গভীর কিছু শেখার আছে
সেই নদীতে নৌকা ভাসাই
ভাসাই করে ভাসাই না
না ডুবাই, না ভাসাই
না ভাসাই, না ডুবাই।’
এরকম পিওর ফিলোসফিক্যাল গান বাংলা সিনেমায় আর আছে? উত্তরটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। নেই। এই যে ‘নৌকা ভাসাই-ভাসাই করে ভাসাই না’র মত একটা গদ্য লাইন চোখের পলকে লিরিকের ভেতর ঢুকে গেলো। কিন্তু কেউ খেয়াল করলো না, অদ্ভুত না ব্যাপারটা?
বাংলা সিনেমার গান উত্তরাধিকার সূত্রে সবসময় সহজ-সরল ছিল। মারজুক রাসেল দ্বিধার মাধ্যমে প্রথমবারের মত একে জটিল করে দিয়েছেন। এই জটিলতা এতো বেশি যে, এর গভীরে গেলে যে কেউ সাঁতার শিখে ফেলতে পারবে।
তিন, ‘রং নাম্বার’ সিনেমার ‘আমি আমার ভেতর থেকে নামি’। মতিন রহমানের সিনেমার গান। প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা কি মারজুক রাসেলের উল্লেখযোগ্য লিরিকগুলোর মধ্যে পড়ে? উত্তর হ্যাঁ এবং না দুটোই। না হওয়ার কারণ ‘গোল্লা’ নামের একটা বায়োগ্রাফি তার ঝুলিতে আছে। হ্যাঁ হওয়ার কারণটা একটু হালকা। এই গানটা নায়িকার লিপ্সিংয়ে। একবার ভাবা যায়, বাংলা সিনেমার স্ক্রিনে নায়িকা সখীদের নিয়ে লাফালাফি করছেন, আর গাইছেন-
‘আমি আমার ভেতর থেকে নামি
নেমে যাকে খুঁজি
দেখা নেই তার-রং নাম্বার’।
এখানে ভেতর থেকে নেমে আসার ব্যাপারটা খেয়াল করা যাক। আজ পর্যন্ত ঢাকাই সিনেমার কোনো গীতিকার নায়িকার মুখে এতো জটিল কথা তুলে দিতে পারেননি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সূর্য যেদিকে অস্ত যায়, সেইদিকে এফডিসি বলে মারজুক রাসেল এই কাজটাই করেছেন।

২.
আমাকে যদি বলা হয়, এই পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ কি? আমি বলবো, মারজুক ভাইকে নিয়ে কিছু লেখা। আমি এই জায়গায় রং নাম্বার। এই কাজ হয়তো টম ক্রুজ বা রজনীকান্তের পক্ষে সম্ভব। আমার পক্ষে নয়। আমি ক্লাস টু থেকে মারজুক ভাইয়ের লিরিকের সঙ্গে পরিচিত। আমার বেড়ে ওঠায়, প্রেমে পড়ায়, ব্রেকাপে, সবকিছু মাথা থেকে ফেলে দেয়ায় তার ভূমিকা আছে। কাজেই তাকে নিয়ে লিখতে গেলে নার্সিজম হয়ে যাবে-এটাই স্বাভাবিক।
মারজুক ভাই শুধু কবি, গীতিকার বা অভিনেতা নন। তিনি একজন আউটসাইডার। থ্রি কোয়ার্টার পরা ফিলিংস।
আমরা যারা নব্বই দশকে জন্মেছি এবং দু’হাজার সালের পরে চোখ ফুটেছে, মারজুক ভাই সেই ডিজুস জেনারেশনের ইমেজ। তার কারণেই আমি ঘুম থেকে উঠে তেলাপোকা দেখে বলতে পারি, কী রে কাফকা, বাজারে যাবি না? এই বলাটা তিনি সহজ করে দিয়েছেন।
‘থার্ড পারসন সিংঙ্গুলার নম্বর’ সিনেমাটা যখন বের হচ্ছে, আমি তখন হাইস্কুলে। এর বাইরে সাইবার ক্যাফে লাইফ কাটাচ্ছি। আমি যে ক্যাফেতে বসতাম, তার প্রতিটি কম্পিউটারে এই সিনেমার গান ছিল। বিশেষ করে ‘দ্বিধা’ গানটা। কী এক গান-এখনো যখন এটা শুনি, সারাদিন অন্য গানের দিকে যাই না।
এখনো প্রতিবার ‘দ্বিধা’ শোনার পর আমার একই ফিলিংস হয়। আরে, গানটা তো ভালো করে শোনা হলো না। তার আগেই শেষ হয়ে গেলো। আমি আবার প্লে করি। নতুন করে শুনি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, এখনো ‘দুই দিকে দুই খণ্ড হয়ে যায়, আবার যায় না’র মতো লাইন আমাকে বিস্মিত করে। ঘোরে নিয়ে যায়। ঘোরে আমি কত বড় গীতিকার আপনি- এই বিস্ময় নিয়ে মারজুক ভাইয়ের দিকে তাকাই। কারো কারো আশ্চর্য লাগতে পারে, এই সময় মারজুক ভাইকে আমার দিলীপ কুমার মনে হয়।

x