অ্যাভাঁগার্ডের নবান্ন ফিরে আস

শাহরিয়ার হান্নান

বৃহস্পতিবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৪৫ পূর্বাহ্ণ
63

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ছয় ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রুপে সাজা আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক রীতি। ঋতু বদলের সাথে সাথে বাংলার ফসলের ফলনও ভিন্ন ভিন্ন। হেমন্তে কৃষকের গোলায় নতুন ফসল উঠে। ঘরে ঘরে নতুন ফসলে ঘ্রান, কৃষকের মুখে হাসি। আর সেই ফসলের আগমনে আয়োজন করা হয় নবান্ন উৎসবের। কিন্তু দিন বদলের সাথে সাথে এই প্রচলিত রুপ যেন বদলে যাচ্ছে। ঋতু বদলের সাথে খাপ খাইয়ে কৃষকেরা ভিন্ন ভিন্ন ফসলের বীজ বপন করতো। তার স্বাদ, গন্ধ গুনাগুন ছিলো ভিন্ন ভিন্ন। অধিক ফসলের আশায় হাইব্রিড বীজ ও প্রজুক্তি দ্বারা চাষের ফলে সাময়িক ফল লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে চাষ পদ্ধতি ও ফলনে বিরুপ প্রভাব পড়ছে। সুমন টিংকুর সমসাময়িক ও ব্যতিক্রমী এ ভাবনাকে ভিত্তি করে রচিত ”নবান্ন ফিরে আস’ প্রযোজনাটি মঞ্চে এনেছে অ্যাভাঁগার্ড।
গ্রাম বাংলার এক জনপদে কৃষকেরা তাদেও বাপ দাদার দেখানো পথে চাষাবাদ করে দিনাতিপাত করছিলো। সীতা মাসী তাদের বিপদে আপদে অভিভাবকের মতে পরামর্শ দেয়। গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলোর সরলতার সুযোগ নিয়ে কতিপয় বহিরাগত অতিরিক্ত ফলনের লোভ দেখিয়ে আমদানি করা বীজ ও প্রযুক্তি দিয়ে চাষ করতে প্রলুদ্ধ করে। গ্রামবাসী দ্বিধান্বিত থাকলের সীতা মাসী বহিরাগতদের কথা বিশ্বাস করতে পারে না। বাপ দাদার শেখানো চাষ পদ্ধডুকে অবজ্ঞা করে তারা যেন বহিরাগতদের কথার মায়ায় না ভোলে সে জন্য বার বার সাবধান করে। কিন্তু কথার চাকচিক্যে ভুলে আমদানি করা বীজে চাষ করা শুরু করে। পরবর্তীতে আরো ফলনের জন্য ক্যামিকেল সার প্রয়োগের জন্য প্রলুব্ধ করে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গিয়ে রাসায়নিক সারের উপর্যুপরি ব্যবহারের ফলে মাটি তার স্বাভাবিকতা হারায়। সার প্রয়োগেও তাতে আগের মতো ফলন হয় না। তখন বহিরাগতরা পরামর্শ দেয় জমিতে তামাক চাষের। উপায়ন্তর না দেখে গ্রামবাসী সীতা মাসীর দ্বারস্থ হয়। কিন্তু তিনি হাহাকার করা ছাড়া আর কোন উপায় বলতে পারেন না। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা কওে হতাশায় নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া তারা আর কোন পথ খুঁজে পায় না।
অ্যাভাঁগার্ডেও নতুন পুরানো একদল অভিনেতা অভিনেত্রী নাচ গান অভিনয়ের মাধ্যমে ”নবান্ন ফিরে আস’ নাটকটি দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন। সীতা মাসী চরিত্রে রহিমা খাতুন লুনার অভিনয়ের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি দাপটের সাথে গ্রামবাসীর সাথে সাথে দর্শকদের মনোযোগ নিয়ন্ত্রন করেছেন। বাচিক অভিনয়ের পাশাপাশি দেহভঙ্গিও দ্বারা সীতা মাসী চরিত্রকে তিনি মূর্ত করে তুলেছেন। শামশুল কবীর লিটন তার সমৃদ্ধ কন্ঠের দ্বারা একাধিক চরিত্রকে বৈচিত্রময় ভাবে উপস্থাপন করেছেন। নবীন অভিনেতারাও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দলগত ভাবে প্রযোজনাটির প্রয়োজনীয় কাজ গুলো কওে গেছেন।
নাকটিতে সেটের বাহুল্য ছিলো না। বিভিন্ন আয়তনের কয়েকটি প্লাটফরম, পর্দার দ্বারা বিভিন্ন আবহ তুলে ধরা হয়েছে। প্রপস ও মাস্কের ব্যবহার দৃশ্যেও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। তবে সাজেষ্টিভ প্রপসের সাথে মোবাইল ফোনের ব্যবহার না করলেও চলতো। গ্রাম বাংলার চিরায়ত চিত্র তুলে ধরার জন্য যে সুর ও আবহ ব্যবহার করা হয়েছে শোনার সুখ দেয়।
ভিন্নধারার বিষয় ও আঙ্গিকে সুমন টিংকুর ”নবান্ন ফিরে আস’ মৌলিক পান্ডুলিপির সংকটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ভবিষ্যতে এ নাট্যকারের হাতে আরও সমৃদ্ধ নাটক পাবার প্রত্যাশা বেড়ে গেল।
অভিজ্ঞ নির্দেশক মোসলেম উদ্দীন সিকদার সমগ্র বিষয়টিকে নিপুন ভাবে উপস্থাপন করেছেন-এজন্য তিনি প্রশংসার দাবীদার।
নতুন পুরানো অভিনেতা অভিনেত্রীর সমন্বয়ে মোসলেম উদ্দীন সিকদারের নির্দেশনায় সুমন টিংকুর ”নবান্ন ফিরে আস’ প্রযোজনাটি উপহার দেবার জন্য অ্যাভাগার্ডকে সাধুবাদ দিতে হয়। অ্যাভাগার্ড নবীন নাট্যকার ও নির্দেশকের প্রযোজনা সফল ভাবে মঞ্চে নিয়ে আসছে। ভবিষ্যতে তাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে ও আরোও ভালো ভালো প্রযোজনা পাওয়া যাবে এ প্রত্যাশা রইলো।

x