অসুস্থ চট্টগ্রাম রোগীবেষ্টিত নেত্রী

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
15

প্রিয় নগর চট্টগ্রাম খুবই অসুস্থ! চট্টগ্রাম না শুধু, প্রিয় দেশটাও নানা ভয়াল সংক্রামক ব্যাধিতে ভুগছে! দায়টা পুরোই আমাদের। দেশে জনসংখ্যা বাড়ার হার গত শতকের তুলনায় কমছে। কমতিটা কিন্তু মধ্যবিত্ত বৃত্তে বন্দি! নিম্নবিত্ত বা উচ্চবিত্তরা মোটেই সজাগ না! বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হিসাব উল্টো! তাদের যুক্তি “যত মুখ তত সুখ” অথবা “রিযিকের মালিক রাজ্জাক বা আল্লাহ”! সোজা অর্থ, বাড়তি সন্তান মানেই বাড়তি আয়। মাত্র পাঁচ বছর লালন-পালনশেষে সন্তানকে রোজগারের পথে নামিয়ে দেয়া যায়! সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নজরদারি নেই! সংখ্যা ও বয়স যত বাড়বে, আয়ও তত বাড়বে। রিযিকের মালিক রাজ্জাক বিশ্বাসীরা কাঠমোল্লা ও জ্ঞানের আলো বঞ্চিত মানুষ। এরা সব শ্রেণিতে ছড়িয়ে আছে। তারা বুঝতেই চায়না, আল্লাহ এমনি এমনি কারো মুখে দানাপানির যোগান দেয় না। নিজের পরিশ্রম ও মেধায় যোগাড় করে নিতে হয়। দেশ যত উন্নত হোক, সাক্ষরতার হার যতই বাড়ুক, ধর্মান্ধ প্রচুর মানুষ গোঁড়ামির চক্রব্যূহে ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই হার সহনীয় হলেও জনসংখ্যা বাড়ছে! কিন্তু বড় নগরে বাড়ছে স্রোতের তোড়ে। রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা আড়াই কোটি ছুঁইছুঁই! বাতাসের দূষণমাত্রা পৃথিবীর সবচে’ উপরে! ভারতের রাজধানী দিল্লিকে বায়ু দূষণে ছাড়িয়ে গেছে ঢাকা। তুলনায় চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অতো ভয়াবহ না হলেও আশঙ্কার প্রান্তরেখায়।
চট্টগ্রাম নগরীর জনসংখ্যা কতো বাড়ছে হিসাব, জরিপ বা শুমারি কিছু নেই! সামপ্রতিক প্রামাণ্য পরিসংখ্যানও নেই। হিসাব না থাকলেও নগরীর জনসংখ্যা ৭০/৭৫ লাখের কাছাকাছি হবেই। যারা কাছের বা দূরের দেশ ভ্রমণ করেছেন, তারা নিশ্চয়ই মানবেন, পৃথিবীতে প্রকৃতির নৈসর্গিক শোভায় শোভিত যে,ক’টি নগর আছে, এগুলোর অন্যতম চট্টগ্রাম। নদী, সাগর,পাহাড়, সবুজ বনানীর অপরূপ সাজে সজ্জিত নগরটিকে আমরা কোন পরিচর্যাতো দিচ্ছিইনা, উল্টো এর নান্দনিক ঐশ্বর্য তথাকথিত ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর লোভের আগুনে ঝলসে বার বি কিউ বানিয়ে মজাদার ডিশের মত প্রায় হজম করে ফেলছি! সিঙ্গাপুরের মত দ্বীপ ও নগর রাষ্ট্র কৃত্রিম হ্রদ, সবুজ অরণ্য বা পার্ক গড়ে পৃথিবীর সব বিরল জীবজন্তু এনে নানা প্রকৃতিবান্ধব স্থাপনা গড়ে দেশকে নন্দন কানন বানিয়েছে! বছরে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসেবা ও পর্যটন খাতে কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার আয় করছে সিঙ্গাপুর! বিপরীতে প্রকৃতি চট্টগ্রামকে উজাড় করে সবকিছু ঢেলে দিলেও আমরা মিলিয়ন ডলারও পর্যটন খাতে টানতে পারি না! এরচে’ বড় লজ্জা ও অপমান আর কী! যারা সরকার ও নগর প্রশাসনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বা আছেন, তাদের লজ্জা ঢাকার আড়াল আছে কী? হ্যাঁ, চট্টগ্রামের অবকাঠামো উন্নয়ন হচ্ছে, কর্ণফুলী টানেলওয়েসহ বহু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে চট্টগ্রাম ওয়াসার সাথে স্যূয়ারেজ যুক্ত করে বহু বছর পর পূর্ণাঙ্গ ওয়াসা’য় রূপায়িত করার কাজও উদ্বোধন হয়েছে। কিন্তু ওয়াসার উন্নয়ন, পানি সরবরাহের নতুন পাইপলাইন বসানো, সমপ্রসারণ কর্মযজ্ঞে বছরের পর বছর যে জনভোগান্তি চলছে, এর ক্ষতি হিসাব করলে লাভের গুড় পিপড়ার পেটে যাবে! বছরের পর বছর দফায় দফায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ফলে পরিবেশ ও বায়ুদূষণের হিসাব নাইবা নিলাম। পাইপলাইন ফেটে কৃত্রিম বন্যায় রাস্তা প্লাবনের কথাও বাদ। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়কে যোগাযোগ সঙ্কটে জন ভোগান্তির দুর্দশা কতো ভয়ঙ্কর, তার নিত্য ভুক্তভোগী নগরীও এই অঞ্চলের সর্ব পেশা ও বয়সের সব ক’জন মানুষ। বলতে গেলে চসিক, সিডিএ, কর্ণফুলী গ্যাস, বিদ্যুৎসহ সব সেবা সংস্থার অপরিকল্পিত ও অসমন্বিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ভোগান্তি সইতে হয় সাধারণ নগরবাসীকে। এর উপর আছে দফায় দফায় প্লাবনের বিষফোঁড়া!
চট্টগ্রামকে ভারতের মুম্বাই বা চেন্নাই আদলে গড়ে তোলা হলে এমনটি কখনো হতোনা। দেশের সিংহভাগ রাজস্ব আয়ের উৎস বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। দেশের জনসংখ্যা এখন সাড়ে ১৬ বা ১৭ কোটি। আয়তন মাত্র এক লাখ পৌণে ৪৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার! জনসংখ্যার এতো ঘনত্ব অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডার বড় নগরীতেও নেই বরং আরো অনেক কম। তাহলে কেন ঢাকাভিত্তিক এককেন্দ্রিক প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এখনো ধরে রাখা হয়েছে?এভাবে চলতে থাকলে যত উন্নয়ন করা হোক, জনসংখ্যার চাপে ঢাকা শিগগিরই পরিত্যক্ত নগরী হতে বাধ্য! পৃথিবীতে “ফরবিডেন” সিটি বা লুপ্ত নগরী প্রচুর। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কী ঢাকাকে তাই করতে চান? নাকি মালয়েশিয়া বা মিয়ানমারের মত প্রশাসনিক নতুন রাজধানী তৈরি করা হবে? চট্টগ্রামের মন্ত্রী এমপি বা রাজনৈতিক বড় নেতারা অতীতেও চট্টগ্রামের অবহেলা নিয়ে সমন্বিত আওয়াজ তোলেননি, এখনো নয়! কেন? চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে নিয়েছেন বলে আত্মপ্রসাদের ঢেকুর তোলার কোন কারণ নেই। এতে নিজেদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা আড়াল দেয়া সহজ হলেও চট্টগ্রামবাসী কাউকে ক্ষমা করবে না। চট্টগ্রামে কোন পাবলিক পার্কিং স্পেস নেই। ট্রাক টার্মিনাল নেই। নেই কোন সবুজ পার্ক, হাঁটার পরিকল্পিত ওয়াকওয়ে। নগর পরিবহনের অবস্থা বৃটিশ জমানার। কয়েকটা উড়াল সড়ক বা বহুতল ভবন উন্নয়নের বিজ্ঞাপন হতে পারে কিন্তু বাস্তবতা অন্য কথা বলে। বহুতল ভবনগুলোর বেশিরভাগেরই পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস নেই। বেসরকারি স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি, অসংখ্য কথিত কনভেনশন সেন্টার, হাসপাতাল, ক্লিনিক, আধুনিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, চেইন শপিং মলেরও পার্কিং সুযোগ নামকা ওয়াস্তে! নগরীতে ভাল কোন রাজপথও নেই। একমাত্র সুপরিসর রাজপথ সিডিএ এভেন্যু উড়ালপথ ও ওয়াসার উন্নয়নের চাপে অগম্য হয়ে পড়েছে বহু বছর ধরে। তাহলে আমাদের আছেটা কী! স্বয়ংসম্পূর্ণ বাসোপযোগী নগর চট্টগ্রাম গড়তে হলে সব সেবা সংস্থার সমন্বিত ও ওয়ানষ্টপ সার্ভিস এবং ঢাকার বিকল্প বানিজ্যিক রাজধানীতে রূপায়ন এখন সময়ের দাবি। সর্বস্তরের রাজনীতিক এবং সুশীল সমাজকে এ’ব্যাপারে স্ব স্ব অবস্থান থেকে সমন্বিত আওয়াজ তুলতে হবে। পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে চট্টগ্রামকে পূর্ণাঙ্গ ও বানিজ্যিক রাজধানীতে রূপায়নের প্রয়োজন বুঝতে হবে। দেশ ও জনগণের সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁর আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। কিন্তু চট্টগ্রামের বিপুল সম্ভাবনা অবহেলায় ফেলে রাখলে তাঁর সমৃদ্ধ দেশ নির্মাণের স্বপ্ন কখনো বাস্তাবায়ন হবেনা।
এদিকে ভয়ঙ্কর একটা খবর দিয়েছে, আন্তর্জাতিক পলিথিন দুষণ নিরোধ বিষয়ক যৌথ বিশেষজ্ঞ টিম। দু’বছর ধরে পরিচালিত জরিপ রিপোর্টে তারা বলেছে, বঙ্গোপসাগরে প্রতিদিন উজানের দেশ থেকে গঙ্গা, ব্রম্মপুত্রসহ অন্যান্য নদী দিয়ে ৭৩ হাজার টন পলিথিন বর্জ্য পড়ছে। বিপরীতে বাংলাদেশে দিনে পলিথিন উৎপাদন তিন হাজার টন মাত্র! এ’ভাবে চলতে থাকলে আমাদের ব্লু ইকোনমির সব সম্ভাবনা আহরণের আগে শেষ হয়ে যাবে! এখনি পরিবেশ বিষয়ক সব সংস্থার মনোযোগ জরুরি ভিত্তিতে এই আপদ নির্মূলে একীভূত করা উচিত।
রাজনীতিতে ওবায়দুল কাদের সাহেবের অবস্থান বরাবরই কৌতূহল উদ্দীপক! তাঁর শরীরী ভাষা, বচন, স্টাইল সব। ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘৭৫এর পর শেখ হাসিনার মত সৎ ও নির্লোভ নেতৃত্ব জাতি আর পায়নি। তিনি না বললেও এটা শতভাগ সত্য বলেই জানি। কাদের সাহেব না হয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মরহুম সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাহেবের মুখ দিয়ে কথাটা আসলে এর আবেদন জনগণকে অন্য মাত্রায় উদ্দীপ্ত করতো। এটাই হচ্ছে, নেতার সাথে নেতার পার্থক্য! প্রধানমন্ত্রীতো আবারো বলেছেন, সম্পদ আসক্তি ভয়ঙ্কর এক রোগ! রোগাক্রান্তরা টাকার পেছনে দৌড়ানো ছাড়া কিছুই বোঝে না! দুর্ভাগ্য হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী প্রিয়নেত্রী শেখ হাসিনা যতই সৎ হোন, তাঁকে ঘিরে রেখেছে সম্পদ আসক্ত সব রোগী!

x