অসীম সাহসী তারামন বিবি

রেজাউল করিম

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৮:০১ পূর্বাহ্ণ

মাতৃভূমি রক্ষায় লড়াই করা গৌরবের ব্যাপার। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার আপামর জনতার অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে সেই গৌরব অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার। এই গৌরব অর্জনের অন্যতম অংশীদার নারী। সুলতানা রাজিয়া, ঝাঁসীর রাণি লক্ষ্মী বাঈদের অনুসরণ করে অনেক নারী মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে ছিল নারীদের অংশগ্রহণ। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ছিল তাদের সহযোগিতায় যুদ্ধ জয় ত্বরান্বিত হয়েছে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের বুকে রচিত হয় এক নতুন ইতিহাস। নতুন এক মানচিত্র। আর এই জয় ছিনিয়ে আনতে জীবন বাজি রেখেছিলে বেশ কয়েকজন নারী। তাদের মধ্যে একজন হলেন তারামন বেগম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তারামন বিবি নামে পরিচিত ছিলেন।

অসীম সাহসিকতার এক প্রতীক তারামন বিবি। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজ গ্রাম কুড়িগ্রাম জেলার শংকর মাধবপুরে ছিলেন। তখন ১১ নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। তখন কিশোরী ছিলেন তিনি। পাগলের বেশে কুড়িগ্রাাম রৌমারি পুলিশ স্টেশনের আশপাশে ঘুরাঘুরি করে পাকিস্তানি সেনাদের পর্যবেক্ষণ করতেন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়। খবর সংগ্রহ করে পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে যেখানে তিনি রান্নার কাজ করতেন। তারামন বিবির ভাষ্য, তখন সন্ধ্যা। রান্নার জন্য কচুরমুখি তুলছিলেন। এ সময় পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম মুহিব হাবিলদার। তিনি তাকে তার সঙ্গে ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চাইলেন। রান্নার কাজের জন্য। বিষয়টি মাকে জানালেন তারামন। কিন্তু মা দেশের কথা ভেবে ক্যাম্পে যেতে অনুমতি দিলেন।

মুহিব হাবিলদার তারামন বিবিকে তার ধর্মমেয়ে বানালেন। ক্যাম্পে মূলত রান্নার কাজই করতেন তিনি। আর মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রগুলো মুছে পরিষ্কার করতেন। রান্নার ফাঁকে মুহিব হাবিলদার তাকে অস্ত্র চালানো শেখাতেন। প্রথমে তারামন বিবিকে রাইফেল চালানো শেখানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ছোট হওয়ায় বুকে ব্যথা পেতেন তিনি। পরে স্টেনগান চালানো শেখেন। পরবর্তীতে সহকর্মীদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। পাকিস্তানি বাহিনীর খবর সংগ্রহ করতেন। ক্যাম্পে তিনিই ছিলেন সবার ছোট। তাই সবাই তাকে আদর করতেন। ১৯৭১ সালে একদিন দুপুরে খাওয়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনী একটি গানবোট নিয়ে তারামন বিবির ক্যাম্পের দিকে আসতে থাকে। খবর পেয়ে তিনি তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। কয়েকবার মৃত্যুর মুখে পড়েন। কিন্তু সাহসিকতা ও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। ‘আমার গুলিতে এক পাক সৈন্য গুলিবিদ্ধ হলে দ্বিগুণ উৎসাহে আমি ম্যাগাজিন লোড করে গুলি করতে থাকি। সূর্যাস্ত পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকলে একসময় পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমি সেদিন আমাকে আবিষ্কার করলাম। আমি নিজেকে একজন গৃহকর্মী থেকে সৈনিকে পরিণত হতে দেখলাম।’

১৯৫৭ সালে রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তারামন বিবি। তার বাবার নাম আবদুস সোহবান ও মায়ের নাম কুলসুম বিবি। ‘প্রথমদিকে কাজের ফাঁকে আমাকে পাক সেনাদের ক্যাম্পের আশপাশে পাঠানো হতো তাদের সম্পর্কে খবর নেওয়ার জন্য। আমি তখন পাগলীর অভিনয় করতাম আর পাক বাহিনীর খোঁজখবর করতাম। মুক্তিযোদ্ধারা আমার এনে দেওয়া খবর অনুযায়ী অপারেশন পরিচালনা করতো।’ যুদ্ধ শেষে মায়ের কাছে ফিরে আসেন তারামন। এরপর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করে তাকে। ১৯৭৪ সালে আবদুল মজিদের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। এক ছেলে আবু তাহের ও মাজেদা খাতুন নামে এক মেয়ে আছে।

একসময় তারামন বিবিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মানুষের বাসায় কাজ করতেন। স্বাধীনতা অর্জনের ২৪ বছর পরও তার সন্ধান মেলেনি। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ১৯৯৫ সালের দিকে তার সন্ধান মেলে। ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক বিমল কান্তি তাঁকে খুঁজে বের করেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেন কুড়িগ্রামের রাজীবপুর কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকী। সংবাদপত্রের শিরোনাম হন তিনি। তারপর টনক নড়ে। বিস্মৃত এক নারী মুক্তিযোদ্ধার নাম জাতি জানে।

দরিদ্র পরিবারের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিত এই কিশোরীর মনে এতটা দেশপ্রেম কী করে সৃষ্টি হলো তা সত্যিই রহস্য। এর নামই মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ মানে যেমন ৭ মার্চের স্বাধীনতার ডাক তেমনি ২৫ মার্চের কাল রাত। অসংখ্য নারী সম্ভ্রমহানির সাথে তারামন বিবির মতো কারো যোগ্য উত্তর। তারপরও এরা কোনো প্রতিদান চায় না। বীরের মতো দেশমাতাকে রক্ষা করে নিভৃতে দরিদ্র ক্লিষ্ট জীবনের এদের কোনো ক্ষোভ নেই। শুধু স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে চায়, শত্রুমুক্ত সুখী বাংলাদেশ। দেশপ্রেম প্রতিদান চায় না। দেশপ্রেম শুধু জানে আত্মত্যাগ। স্বাধীনতার ২৪ বছর পর ১৯৯৫ সালে বীর এই নারী তার বীরত্বের স্বীকৃতি পান। তৎকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে পুরষ্কার তুলে দেন। তারামন বিবিকে নিয়ে আনিসুল হকের লেখা বই ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’। যা পরবর্তীতে নাট্যরূপ দেওয়া হয় ‘করিমন বেওয়া।’ দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত বছরের বিজয়ের মাসের প্রথম দিনে তারামন বিবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে রাজিবপুর উপজেলার কাচারিপাড়া তালতলা কবরস্থানে দাফন করা হয়।

x