অর্গানিক শুটকী উৎপাদনে দেশসেরা মোকাদ্দেছুর, যাচ্ছে বিদেশেও

সুনীল বড়ুয়া :কক্সবাজার

সোমবার , ১৪ অক্টোবর, ২০১৯ at ৪:০১ পূর্বাহ্ণ
92

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে একটি বেসরকারি কোম্পানীতে চাকুরি করতেন কুমিল্লার মো. মোকাদ্দেছুর রহমান মুকুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবজেক্ট ছিল কেমিস্ট্রি তাই পরবর্তীতে কিছুদিন একটি ওষুধ বিপণন প্রতিষ্ঠানেও কাজ করেন তিনি। এর পর গবেষণার কাজে যান জাপানে। সেখানে তিনি ‘ইয়েন জাপান’নামের একটি প্রতিষ্ঠানে মাটির উর্বরা শক্তি বাড়ানোর জন্য ‘মাটির অনুজীব’ নিয়ে কাজ করেন। এরপর একই বিষয়ে চীন ও থাইল্যান্ড থেকেও প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
২০১৩ সালে দেশে ফেরার পর বাংলাদেশ ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা প্রতিবেদন দারুণভাবে দাগ কাটে এই উচ্চ শিক্ষিত যুবকের মনে। প্রতিবেদনে তিনি দেখতে পান, সমুদ্র উপকূলীয় মানুষের খাবারের তালিকায় শুটকীর প্রাধান্য বেশি। আর বেশিরভাগ শুটকী অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত এবং শুটকী উৎপাদনে নানা ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের মাঝে ক্যান্সার আক্রান্তের হার বেশি।
সেই ভাবনা থেকে মোকাদ্দেছুর রহমান কক্সবাজার চলে আসেন। ২০১৬ সালে শহরের উত্তর নুনিয়ারছড়া সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় ৪ বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে উপর গড়ে তোলেন অর্গানিক উপায়ে শুটকী উৎপাদন কেন্দ্র। কোন ধরনের রাসায়নিক ছাড়াই সূর্যের আলোতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এখানে এখন প্রতিমাসে উৎপাদন হয় লইট্যা, ছুরি, চিংড়ী, রূপচান্দা, লাল চিংড়ী, টুনা,মলাসহ প্রায় ২২ প্রজাতির ৩০ হাজার কেজি সামুদ্রিক মাছের শুটকী। সেই থেকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে উৎপাদন করে যাচ্ছেন ৩৬ লাখ কেজি অর্গানিক শুটকী।
স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে তৈরি এবং ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে প্যাকেটজাত অল্প কদিনেই মোকাদ্দেছুর রহমানের অর্গানিক শুটকীর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। বর্তমানে বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিওএফপি) ছাড়াও আমেরিকা এবং কানাডায় যাচ্ছে এই শুটকী। ‘পিউরিটি অর্গানিক ড্রাই ফিস’ নামে দেশের বাজারেও বাজারজাত হচ্ছে এই শুটকী। সব ধরনের খরচ মিটিয়ে শুটকী থেকে প্রতিমাসে আয় করছেন দুইলাখ টাকারও বেশি।
এই সফলতার জন্য অর্গানিক পদ্ধতিতে শুটকি প্রস্তুতকারক হিসাবে মো. মোকাদ্দেছুর রহমানকে শ্রেষ্ঠ কৃষি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুরস্কার দেয় বিদেশি খাতের সিটি ব্যাংক,এনএ বাংলাদেশ। স্বল্প আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং উন্নয়নে কাজ করায় তিনিসহ দেশের ১৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা বলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সঙ্গে মোকাদ্দেছুর রহমানকে পুরস্কারের চেক, সনদ ও ক্রেস্ট তুলে দেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক।
মোকাদ্দেছুর রহমান বলেন, সচরাচর শুটকী উৎপাদনে পচন রোধের জন্য কীটনাশক,ওজন বাড়ানোর জন্য লবণ ও বালি ব্যবহার করা হয়। কিন্তুু পিউরিটির শুটকীতে এসব ব্যবহার করা হয় না। শতভাগ স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে শুধু মাত্র সুর্যের তাপে এ শুটকী উৎপাদন করা হয়। আর শুটকীর পুরো চাং প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরা থাকাতে এখানে মশা-মাছিও বসতে পারে না।
তিনি বলেন, শুকানোর পরে শুটকী প্যাকেটজাত করা হয় উন্নত ‘ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে’। ভেতরে অক্সিজেন থাকলে পোকা বা জীবাণু জন্ম নেওয়ার সুযোগ থাকে তাই,ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে প্যাকেটজাত শুটকীতে এ ঝুঁকি নেই। এছাড়া আরও সুবিধা হচ্ছে ভেতরে না থাকার কারণে দীর্ঘদিন সতেজ থাকে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কারিগরী সহযোগিতায় এ শুটকী উৎপাদন করা হচ্ছে।
‘সাধারণ উপায়ে তৈরী শুটকী শুকানো হয় নাড়ি-ভুড়িসহ। কিন্তু অর্গানিক শুটকী উৎপাদনে নাড়ি-ভুড়ি,লেজ,মাথাসহ খাওয়ার অনুপযোগী সবকিছু ফেলে তার পর শুনানো হয়। তিনি নাড়ি-ভুড়ি না ফেলার কারণে মাছের পেটের ভেতরে বিষাক্ত পিত্তটি থেকে যায়। যেটি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়’। যোগ করেন তিনি।
কোথায় উৎপাদন হয় অর্গানিক শুটকী-
কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়ারছড়া এলাকায় প্রায় ৪বিঘা জমির উপর গড়ে তোলা হয় পিউরিটি অর্গানিক ড্রাই ফিসের উৎপাদন কেন্দ্র। বিজ্ঞানসম্মত ভাবে গড়ে তোলা এ কেন্দ্রে প্রতিমাসে উৎপাদন করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩০ হাজার কেজি শুটকী। লইট্যা, ছুরি, রূপচান্দা, চিংড়ী, মলা,ব াঁশপাতা (ফাইস্যা),লাল চিংড়ী টুনাসহ প্রায় ২২ প্রজাতীর সামুদ্রিক মাছ এখানে বৈজ্ঞানিক উপায়ে শুকানো হয়। আর এসব শুটকী উৎপাদনে কাজ করেন প্রায় ৩০জন শ্রমিক।
উদ্যোক্তা মোকাদ্দেছুর রহমান জানান,কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম ফিশারী ঘাট থেকে এসব সামুদ্রিক কাঁচা মাছ সংগ্রহ করা হয়। তারপর প্রক্রিয়াজাত করে স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে এখানে শুকানো হয়।
মোকাদ্দেছুর রহমান বলেন, দেশের চেয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানে তাঁর শুটকীর কদর বেশি। বর্তমানে তাঁর উৎপাদিত অর্গানিক শুটকীর মধ্যে প্রতি মাসে জাতীসংঘের খাদ্য বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য সংস্থায় চলে যায় ছয় থেকে আট হাজার কেজি। সংস্থাটি এসব শুটকী কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কাছে বিতরণ করে। এছাড়াও আমেরিকা ও কানাডার দুইটি বায়ারের কাছে রপ্তানি করা হয় গ্রয় ছয় হাজার কেজি। বাকি শুটকী যায় ঢাকা,চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। বর্তমানে প্রতিমাসে এখান থেকে তাঁর আয় হচ্ছে দুই লাখ টাকার বেশি।
তাঁর মতে, শিক্ষিত লোকজন এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়। কিন্তু শিক্ষিত লোকজন বেশি বেশি এগিয়ে এলেই এ শিল্প দ্রুত প্রসার ঘটবে।
দাম কেমন
অর্গানিক শুটকীতে নাড়ি-ভুড়িসহ খাওয়ার অনুপযোগী সব কিছু ফেলে দিয়েই শুকানো হয়। এছাড়াও সম্পূর্ণ অর্গানিক উপায়ে উৎপাদন করা হয় বলে দাম পড়ে একটু বেশি। যেমন, সাধারণ উপায়ে উৎপাদিত এককেজি ছুরি শুটকী আটশো টাকা হলে এ ক্ষেত্রে অর্গানিক শুটকীর দাম প্রায় দ্বিগুণ। এভাবে অর্গানিক উপায়ে তৈরি প্রতিকেজি লইট্যার ২ হাজার, মলা ১হাজার, লাখ্যা ৪হাজার ৮০০ টাকা দাম পড়ে।
তবে দামের বিষয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, অর্গানিক উপায়ে উৎপাদিত ২০০ গ্রামের একটি লইট্যার প্যাকেটে ধরে ৪০ থেকে ৪২টি মাছ। একই সাইজের সাধারণ লইট্যা ধরে ৫০০ গ্রামে ৪০ থেকে ৪৫টি। একই অবস্থা প্রায় সব ধরনের মাছে। যে কারণে হিসাব মিলালে দামেও খুব একটা তারতম্য থাকে না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল এটা নিরাপদ খাদ্য,এখানে স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টো নেই।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট,কক্সবাজার-এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.জুলফিকার আলী ও সিনিয়র বৈজ্ঞনিক কর্মকর্তা ড. এহেসানুল করিম জানান, এ ধরনের শিক্ষিত লোকজন এগিয়ে এলে যেকোনো কাজে সফলতা বাড়ে। তাদের সহযোগিতা নিয়ে প্রায় তিন বছর ধরে অর্গানিক শুটকী উৎপাদন করছেন। যে কারণে তাঁর শুটকীর প্যাকেটের গায়ে ‘বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কারিগরী সহযোগিতায়’ কথাটি লেখা আছে।
তারা বলেন, এক সময় কক্সবাজারে শুধুমাত্র মোকাদ্দেছুর অর্গানিক উপায়ে শুটকী উৎপাদন করতো। এখন আরও একজন যোগ হয়েছে। আমরা সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি,আমরা চাই বেশি বেশি উদ্যেক্তা।

x