অযোধ্যার বিতর্কিত জায়গায় হবে মন্দির মসজিদ নির্মাণে আলাদা জায়গা

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়

রবিবার , ১০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ
119

অবশেষে ভারতের উত্তরপ্রদেশের বহুল প্রতীক্ষিত বাবরি মসজিদ মামলার রায় ঘোষণা করেছে দেশটির সর্ব্বোচ্চ আদালত। রায় অনুসারে, মসজিদের বিতর্কিত ওই জমি সরকার পরিচালিত একটি ট্রাস্টকে দেওয়া হবে। তারা সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করবে। অন্যদিকে মসজিদ নির্মাণের জন্য শহরের উপযুক্ত কোনো জায়গায় মুসলমানদের ৫ একর জমি দেওয়া হবে।
গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গাগৈর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের ৫ সদস্যের একটি বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য ৪ সদস্য হলেন বিচারপতি শারদ অরবিন্দ, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ ও আব্দুল নাজির। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে এ তথ্য জানা যায়। খবর বাংলানিউজের। মামলার মুসলিম পক্ষ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের ব্যাপারে তাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু এতে তারা সন্তুষ্ট নন। রায়ের রিভিউ চাওয়া হবে কিনা সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে এ রায়কে ঐতিহাসিক
ও যথাযথ অভিহিত করে স্বাগত জানিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। মামলার হিন্দু দুই পক্ষ ডানপন্থি রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভা ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের সংস্থা নির্মোহী আখড়াও এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘসহ (আরএসএস) বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন এ রায়কে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছে।
এদিকে এক বিবৃতিতে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টিও এ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। তারা জানায়, আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ ও সম্প্রদায়ের কাছে অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ, ভ্রাতৃত্ব, শান্তি ও একতা রক্ষার আহ্বান জানাই। যুগ যুগ ধরে যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ঐতিহ্য ও একতা আমাদের সমাজকে ধরে রেখেছে আরও একবার তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
কংগ্রেস জানায়, আমরা অযোধ্যার বিতর্কিত জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষপাতী। এ রায়ের মধ্য দিয়ে মন্দির নির্মাণের পথই শুধু খুললো তা নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে বিজেপি ও অন্যদের এ ইস্যুকে রাজনীতিকরণের পথও রুদ্ধ হলো।
এ রায় ঘিরে উত্তরপ্রদেশ, বেঙ্গালুরু, জম্মু, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের আলীগড় জেলায় ৮ নভেম্বর রাত ১২টা থেকে ৯ নভেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত মোবাইল ও ইন্টারনেট সার্ভিস বিচ্ছিন্ন রাখা হবে বলে জানিয়েছেন ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট।
এর আগে এ রায়ে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। রায় ঘিরে যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় অযোধ্যায় হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। গত শুক্রবার রায় ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কায় ৫শ’রও বেশি মানুষকে আটক করা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, রায় পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র বাসভবনে এরই মাঝে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। খবরে বলা হয়, ১৬ শতকে অযোধ্যায় নির্মিত বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে বিতর্কে দশকের পর দশক ধরে হিন্দু ও মুসলিমরা বিভক্ত হয়ে আছে। ওই জায়গার প্রকৃত মালিক কারা বছরের পর বছর ধরে এ সংক্রান্ত মামলা কোর্টে ঝুলে ছিল।
হিন্দুদের বিশ্বাস, যে জায়গাটিতে বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, সেটি মূলত তাদের দেবতা প্রভু রামের জন্মস্থান। ফলে তারা সেখানে একটি মন্দির নির্মাণ করতে চায়। অন্যদিকে মুসলিমদের দাবি ১৬ শতকে নির্মিত এ মসজিদে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রার্থনা করে আসছিল।
বিবিসি জানায়, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেখানকার সবগুলো সড়ক। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে প্রাদেশিক পুলিশ প্রধান ওম প্রকাশ সিং জানান, রায় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোনো ধরনের বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের ব্যাপারে বিশেষ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আদালতের রায় নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো হিন্দু বা মুসলিমের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বরদাস্ত করা হবে না।
সরকার জানিয়েছে যে কোনো ধরনের সহিংসতা মোকাবিলায় তারা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য ছোটখাটো বা বড় যে কোনো ধরনের দাঙ্গা ঠেকাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সে রকম পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রয়োজনে প্রাদেশিক সরকার একাধিক স্কুলকে অস্থায়ী কারাগার হিসেবে ব্যবহার করবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও রায় ঘিরে জনগণকে শান্ত ও আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। রায় ঘোষণার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে এক বার্তায় তিনি লেখেন, মামলার রায় যাই হোক, তাতে কেউই বিজয়ী বা পরাজিত হবে না। ইন্ডিয়ার জনগণের কাছে আমার আবেদন এই যে, মামলার রায়ে যেন শান্তির মূল্যবোধ শক্তিশালী হয়, সাম্য ও দেশের মঙ্গল হয়, প্রাধান্যের সঙ্গে সেটিই আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। রায় যাই হোক না কেন আজমির শরিফের আধ্যাত্মিক গুরু শান্তির আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবাদের মূলে আছে ১৬ শতকের বাবরি মসজিদ, যা ১৯৯২ সালে এক দাঙ্গায় ভেঙে ফেলে বেশ কিছু হিন্দু চরমপন্থি। ওই দাঙ্গায় প্রায় ২ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়। অনেক হিন্দুর বিশ্বাস, একটি হিন্দু মন্দির গুড়িয়ে তার জায়গায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করে আক্রমণকারী মুসলিমরা।
মুসলিমদের বক্তব্য, ১৬ শতক থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তারা ওই মসজিদে প্রার্থনা করে আসছিল। ১৯৪৯ সালে কিছু চরমপন্থি হিন্দু মসজিদটিতে একটি রাম মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে পূজা শুরু করে। সেই থেকে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই জায়গাটির মূল মালিকানা দাবি করে আদালতের দ্বারস্থ হয়ে চলেছে। হিন্দুরা মসজিদের জায়গায় একটি রাম মন্দির নির্মাণ করতে চায়।
এ বিশেষ মামলাটি লড়ছে ৩টি পক্ষ। এর মধ্যে দুটি হিন্দু ও একটি মুসলিম পক্ষ। মুসলিম পক্ষে লড়ছে ‘মুসলিম ওয়াকফ বোর্ড’। ভারতে ইসলামিক সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এ বোর্ডের। অন্যদিকে হিন্দু পক্ষরা হলো ডানপন্থি রাজনৈতিক দল ‘হিন্দু মহাসভা’ ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের সংস্থা ‘নির্মোহী আখড়া’।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার ১০ বছর পর ২০০২ সালে এলাহাবাদের উচ্চ আদালতে অযোধ্যার ওই জায়গাটি নিয়ে মামলা করে এ তিন পক্ষ। পরবর্তীতে ২০১০ সালে ওই মামলার রায় দেওয়া হয়। রায়ে বাবরি মসজিদের ২.৭৭ একর জায়গা তিন পক্ষের মধ্যে সমান তিন ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়। আদালত জানান, ওই জায়গাটি তিন ভাগে বিভক্ত করা উচিত। মুসলিম সম্প্রদায় এর তৃতীয় অংশটি পাবে। বাকি দুই অংশের মধ্যে মূল যে অংশে বাবরি মসজিদ ছিল, সেটি পাবে হিন্দু মহাসভা।
সে সময় আদালত এ সংক্রান্ত ৩টি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও দেন। আদালত বলেন, ওই জায়গাটি রামের জন্মস্থান। সেখানে একটি হিন্দু মন্দির গুড়িয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হয়। এবং প্রকৃত ইসলামি অনুশাসন মেনে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০১১ সালে হিন্দু ও মুসলিম সব পক্ষই ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করে। গতকাল সেই মামলারই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হলো।

x