অযথা ভিটামিন সেবন ক্ষতিকর

ডাঃ আবু মনসুর মোঃ নিজামুদ্দিন খালেদ

শনিবার , ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৯:০১ পূর্বাহ্ণ
86

ইদানিং দেশের মানুষের মাঝে ভিটামিন গ্রহণের প্রবণতা অকারণেই বেড়ে গেছে। অনেক রোগীকে চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে বলতে দেখা যায় তার শরীর দুর্বল। তাই চিকিৎসক যেন প্রেসক্রিপশনে তার জন্য বেশী করে ভিটামিন লিখে দেন। অনেকেরই ধারণা ভিটামিন বেশী বেশী খেলে তাতে শরীরের কোন না কোন উপকার হবেই এবং অতিরিক্ত ভিটামিন শরীরের কোন ক্ষতি করে না। অথচ মানুষের এ ধারণা সঠিক নয়। অন্যান্য ওষুধের মতো অধিকাংশ ভিটামিনও বেশী সেবন করলে শরীরে নানাবিধ ক্ষতি হতে পারে। অথচ আমরা শুধু ভিটামিনের গুণের কথা শুনেই মুগ্ধ। কিন্তু অতিমাত্রায় কিংবা প্রয়োজন ছাড়া ভিটামিন সেবনের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে খুব কমই খোঁজ রাখি। অধিকাংশ ভিটামিন যেমন নায়াসিন, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই ইত্যাদি মাত্রাতিরিক্ত সেবন শরীরের জন্য ক্ষতিকর। যেমন অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন এ গ্রহণ করার কারণে চুল রুক্ষ্ন হয়ে যেতে পারে, ঘন ঘন চুল পড়ে যেতে পারে, মুখে ঘা দেখা দিতে পারে, ক্ষুধা মন্দাভাব, বমিবমি ভাব দেখা দিতে পারে, মাথার ভিতরের প্রেসার (ওহঃৎধপৎধহরধষ চৎবংংঁৎব) বেড়ে যেতে পারে, রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেয়ে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে, সর্বোপরি মাত্রাতিরিক্ত ভিটামিন এ সেবনের ফলে লিভার বা যকৃত বড় হয়ে যেতে পারে এবং এমনকি লিভার সিরোসিসের মতো প্রাণঘাতি রোগেরও সৃষ্টি হতে পারে। বেশী মাত্রায় ভিটামিন ডি সেবনের ফলে ক্ষুধামন্দাভাব,বমি কিংবা বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঝিমুনিভাব ইত্যাদি সমস্যা ছাড়াও রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেয়ে হৃদযন্ত্রের কিংবা কিডনীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বেশী মাত্রায় ভিটামিন ডি গ্রহণের ফলে কিডনী পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন বি৬ সেবনের ফলে একধরনের স্নায়ুরোগ হতে পারে। অনেকে মনে করেন বেশী মাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণের মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রম বা ব্যায়ামের কারণে পেশীর ক্ষয়রোধ সম্ভব। অনেকে আবার ফ্লু ও ঠান্ডার প্রতিকারেও বেশী মাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণ করে থাকেন। কিছুদিন পূর্বে আমেরিকার স্বাস্থ্য বিষয়ক জার্নাল ‘নিউ সাইন্টিস্ট’’ এর এক প্রবন্ধে বেশী মাত্রায় ভিটামিন সি সেবনের বিপদজনক প্রতিক্রিয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত প্রবন্ধে বলা হয় আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের মার্চ মাসের এক কনফারেন্সে এই মর্মে মত প্রকাশ করা হয় যে, মধ্য বয়সের কোন পুরুষ বা মহিলা প্রতিদিন ৫০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি সেবন করলে তাদের রক্তনালীর পুরুত্ব যারা ভিটামিন সি সেবন করেন না, তাদের চেয়ে আড়াইগুণ বেড়ে যায়। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিংবা বিনা প্রয়োজনে ভিটামিন সি গ্রহণের ব্যাপারে সকলকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। অথচ এদেশে প্রায়শঃ অনেককে বিনা প্রয়োজনে চকোলেটের মতো ভিটামিন সি খেতে দেখা যায়। অতি সমপ্রতি আমেরিকায় পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ভিটামিন ই বাড়তি পরিমাণে গ্রহণ করলে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সাতাত্তর হাজার মানুষের উপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝারি বা উচ্চ মাত্রায় ভিটামিন ই গ্রহণ করলে ফুসফুস ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে আমাদের মধ্যে এইরূপ ধারণা প্রচলিত আছে যে, সুস্থ বা অসুস্থ মানুষকে বাড়তি ভিটামিন প্রদান করলে মানুষের আয়ু বাড়ে, শরীরের ক্ষয়রোধ করে এবং মানুষ বুড়িয়ে যায় না। অথচ বর্তমান সময়ে ভিটামিন নিয়ে পরিচালিত গবেষণাগুলোতে প্রচলিত এই সব ধারণার কোন সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। গবেষকরা বলেন, ভিটামিন মানুষের আয়ু বাড়ায় এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তারা দেখতে পান, ভিটামিন এ, ভিটামিন ই, বিটা কেরোটিন অপ্রয়োজনীয় গ্রহণ মানুষের মৃত্যুহার বৃদ্ধি করে। গবেষণায় ভিটামিন সি এবং সেলেনিয়াম সম্পূর্ণ অকার্যকর বলে প্রমাণিত হয়। তাই যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ভিটামিন সর্ম্পকে সম্প্রতি এক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ভিটামিনের ঘাটতি পূরণের জন্য উচ্চমানের বাজারজাত ভিটামিন গ্রহণ অকার্যকর, এমনকি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরও বটে। সুতরাং ভিটামিন দেখলেই তা গ্রহণের জন্য অস্থির হয়ে পড়ার কোন কারণ নেই আর সব শারিরীক সমস্যার পেছনে রয়েছে ভিটামিনের অভাব- এ ধারণাও সবসময় ঠিক নয়। তারপরও যদি শরীরে কোন সমস্যা দেখা দেয় তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হউন। আপনার চিকিৎসকই সিদ্ধান্ত নেবেন আপনি ভিটামিনের অভাবজনিত কোন সমস্যায় ভুগছেন কিনা। মানুষ যদি সুষম খাদ্য এবং প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল খায়, তাতে শরীর পর্যাপ্ত ভিটামিন পায় এবং সেক্ষেত্রে অযথা টাকা খরচ করে বাজার থেকে ভিটামিন কিনে খাওয়ার কোন প্রয়োজন পড়ে না। আবার বাজারের এসব ভিটামিন কখনোই প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত ভিটামিনের বিকল্প হতে পারে না।

লেখক: বিশেষজ্ঞ ভাইরোলজিস্ট

x