অভিযানেও ফিরছে না গণপরিবহনে শৃঙ্খলা

পাঁচ মাসে ৩৩শ মামলা, ৮০ লাখ টাকা জরিমানা

হাসান আকবর

সোমবার , ২৭ মে, ২০১৯ at ৩:০৭ পূর্বাহ্ণ
103

নগরে গণপরিবহনে ধারাবাহিক অভিযানেও মিলছে না সুফল। নতুন বছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রায় ৩৩শ’ মামলা ও ৮০ লাখ টাকা জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অর্থরিটি- বিআরটিএ’র তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তবুও নগরজুড়ে গণপরিবহনে ফিরছে না শৃঙ্খলা। দিনদিন যেন এই অরাজকতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যত্রতত্র যাত্রী উঠানামা, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখা, মোড়ে মোড়ে স্টপেজ, প্রতিযোগিতা দিয়ে গাড়ি চালানো এবং চালক মুঠোফোনে কথা বলা-এসব অনিয়ম যেন এখন ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে!
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, মোটরযান আইন না জানা এবং আইন না মানার কারণেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। পাশাপাশি ঈদকে সামনে রেখে অগ্রিম টিকিট বিক্রিতেও বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে দূরপাল্লার বাসগুলোর বিরুদ্ধে।
সরেজমিন নগরের কয়েকটি স্পট পরিদর্শন : এমনিতেই ঈদে টেরিবাজারে প্রায় সব শ্রেণির লোকজন কেনাকাটা করতে আসেন। তাছাড়াও গ্রামের দোকানদাররা পাইকারি জামা-কাপড় কিনে নিয়ে যান এখান থেকে। ফলে সকাল থেকেই ভিড় থাকে টেরিবাজার এলাকায়। গতকাল রোববার সকাল ১১টা টেরিবাজার মোড়ে দেখা যায়, নিউ মার্কেট ছেড়ে আসা দুটি হিউম্যান হলার ও একটি বাস রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে যাত্রী উঠানোর জন্য। এতে সড়কের দুই প্রান্তে দীর্ঘ যানজট লেগে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশের দুই সদস্য যেন এসব দেখেও না দেখার ভান করে আছেন। বরং একটু পরেই তাদের দেখা যায় ট্রাক-পিকআপ চালকদের হাত থেকে কিছু একটা নিয়ে পকেটে রাখতে।
একই চিত্র দুপুর আড়াই নগরীর মুরাদপুরেরও। কাপ্তাই রাস্তার মাথা ছেড়ে আসা কয়েকটি বাস প্রতিযোগিতা দিচ্ছে যাত্রী নেওয়ার জন্য। এতে পেছনে গাড়ির জটলা তৈরি হলেও ভ্রুক্ষেপ নেই ট্রাফিক সদস্যদের।
দেওয়ানহাটগামী যাত্রী আলাউদ্দিন আলী বলেন, গাড়িতে সিটও খালি নেই। কিন্তু বাসগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আবার পেছনের গাড়িকেও আটকে রাখছে। মোড়ে মোড়ে অনেক ট্রাফিক পুলিশ, কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।’
বিকেল পাঁচটার দিকে লালখান বাজার ইস্পাহানি মোড়ে হিউম্যান হলারের একজন চালককে ডানকানে মুঠোফোন ধরে উল্টোপথে গাড়ি চালাতে দেখা যায়। এছাড়া ইস্পাহানি মোড়ে যাত্রীদের নামিয়ে উল্টো পথে ঘুরিয়ে দিতে দেখা যায় চকবাজার ছেড়ে আসা সেইফলাইন গাড়িকে। এসময় যাত্রীরাও গাড়িটিতে উঠেত রাস্তার মাঝখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন।
সরেজমিন ঘুরে গতকাল দেখা যায়, একই রুটের একাধিক বাস প্রতিযোগিতা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য থাকে পরবর্তী স্টপেজের যাত্রী। আবার যাত্রী উঠানামা শেষ হলেও পেছনের গাড়িকে আটকে রাখছে। এতে শুধু বাস বা হিউম্যান হলারই নয়; প্রাইভেট গাড়িগুলোও আটকা পড়ছে। ফলে সড়ক জুড়ে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট।
এসব ছাড়াও সড়কে রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যাও কম নয়।
জানা যায়, গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর কুর্মিটোলায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সহপাঠী প্রাণ হারানোর পর রাজপথে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা যানবাহনগুলোকে শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে নতুন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিআরটিএর তিনজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নগরী ছাড়াও জেলার বিভিন্ন এলাকায় লাগাতার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। ঈদ সামনে রেখে বাস কাউন্টারগুলোতেও ছদ্মভেসে অভিযান পরিচালনা করছেন।
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত ২৩ মে পর্যন্ত ৫ মাসের অভিযানে তিন হাজার ৩১৬টি মামলা দিয়েছেন বিআরটিএ’র তিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এসব মামলার বিপরীতে ৮০ লাখ ২৩ হাজার ৬শ টাকা জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি ৮ চালক ও এক দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
এছাড়া বিআরটিএ চট্টগ্রামের তথ্য মতে, গত চার বছরে প্রায় ১৫ হাজার গাড়ি ফিটনেস নবায়ন করেনি।
এদিকে সড়কের শৃঙ্খলা না ফেরার বিষয়ে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ট্রাফিক-বন্দর) অলক বিশ্বাস দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়েছি। মালিকরা চালকদের দিনভিত্তিক কন্ট্রাক্টে বাসগুলো দেন। এতে বেশি আয়ের জন্য তারা প্রতিযোগিতা করেন। ফলে এদেরকে শৃঙ্খলায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা মালিকদের সাথে কথা বলেছি, একাধিক মিটিংও করেছি, যাতে নির্ধারিত বেতনে চালকদের নিয়োগ দেয়া হয়। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানান এ ট্রাফিক কর্মকর্তা।

x