অভিমত : পিএসসি পরীক্ষা ও শিশুশিক্ষা

নাসিমা হক মুক্তা

বুধবার , ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:৩৬ পূর্বাহ্ণ
48

আগামী ১৭ নভেম্বর সারাদেশে শুরু হতে যাচ্ছে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা। এতে অংশগ্রহণ করবে আমাদের কোমলমতি শিশুরা, যাদের বয়স এখনও পরীক্ষা কী সেটা বোঝার ক্ষমতা নেই। তারা দেবে বোর্ড পরীক্ষা। কেন আমাদের বাচ্চারা এই অসহনীয় মানসিক চিন্তা ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে না? অপ্রাপ্ত বয়সে কেন এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ? তাতে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের কী লাভ? আসলেই এই পিএসসি পরীক্ষায় কি এদের অংশগ্রহণ করতে হয় নাকি আমরা সুশীল, সভ্য ও সচেতন মানুষেরা এদের ওপর জোর করে ছাপিয়ে দিচ্ছি? এতে বোঝা যায় বাঙালি কতটা অমানবিক ও হুজুগী? আমরা শুধু ব্যবহার করি, বিনিময়ে সান্ত্বনা স্বরূপ মুখের বুলি ফোটাই। আজব এই পরীক্ষার (পিএসসি) মূল্যায়ন হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের যে সার্টিফিকেট দেওয়া হয় তা অভিভাবকেরা বাসায় নিয়ে বালিশের নিচে সুখ থেকে শোক ও আফসোস করে। কারণ কী?
কারণ একটাই, কচিকাঁচা শিশুদেরকে দিয়ে অযথা পরীক্ষা নেওয়া হয়। এই শিশুদের বছরের শুরু থেকে বলা হয়-এই পরীক্ষাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং নিজেদের স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে পরীক্ষাটি দিতে হবে। এটি একটি সরকারি পরীক্ষা। উপরের ক্লাসে উঠতে হলে বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত তারিখে ৬টি বিষয়ে অংশগ্রহণ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তখন থেকেই শিশুদের মনন ও মগজে একটি ভীতির জন্ম নেয়। শিশুদের সাথে সাথে অভিভাবকেরাও একধরনের চাপের মুখে পড়ে যায়।এত অল্প বয়সে বাচ্চারা বোর্ড পরীক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মুখোমুখি হবে- তাই সন্তানের অভিভাবকেরাও শঙ্কা ও ভয়ে মানসিকভাবে অস্থির হয়ে পড়ে। কারণ এই শিশুরা বোঝে না পিএসসি পরীক্ষা কী? তার ফলে মা-বাবারা সন্তানের ভাল ফল আশায় বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে।এক পর্যায়ে এই টিচার, সেই টিচার, এই কোচিং সেই কোচিং করতে করতে বাচ্চারা আরও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে না মা-বাবাকে খুশি করবে নাকি স্কুলের মান রক্ষা করবে। যে শিশুর ওপর আগামী জীবনের সমাজ ও মানবিকতা রক্ষার দায়িত্ব, সে শিশুরা যদি এখন থেকে বাড়তি চাপে পড়ে তাহলে ওদের স্বাভাবিক জীবন গড়ে উঠতে কি বাধা পড়ছে না? এমনিতেই আমাদের শিশুরা খাঁচায় আটকানো বন্দী পাখি। নেই খেলার মাঠ, নেই কোথাও সবুজের সমারোহ, নেই সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ, নেই আরও পরিবার-পরিজনের বন্ধন। এরই সাথে স্কুলে বাড়তি পড়ালেখা চাপ। শিশুদের এই চাপের বোঝা হালকা করার মতো কেউ নেই। প্রথমে উপজেলা ভিত্তিক ২০০৫ সাল থেকে মূলত শুরু হয় এই পরীক্ষা। পরে ২০০৯ সালে প্রবর্তিত হয়ে প্রথম প্রাথমিক বৃত্তিসহ একসাথে পরীক্ষা নেয়। সেই থেকে এখনো চালু আছে। তবে “জাতীয় শিক্ষানীতি” ২০১০’ প্রাথমিক শিক্ষা কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার রোল মডেল করেছিলেন তবে তা এখনো অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ব্যবস্থা। অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষাটা যদি প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা হতো তাহলে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা মূল্যহীন পিএসসি পরীক্ষা থেকে রেহাই পেত। আসলে এই পরীক্ষায় আদৌ কি কোমলমতি শিশুরা কোন আনন্দ বা ফল পাচ্ছে? এটার কোন যৌক্তিকতা আছে বলে আমরা মনে করি না। এর ফলে লক্ষ করা যাচ্ছে যে – শিশুদের ওপর বিরাট বোঝা চাপিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান চর্চা, বেসিক শিক্ষা অর্জন, জানার চেয়ে পরীক্ষায় মুখস্থকরণ এবং পরীক্ষামুখী পদ্ধতিতে ঝুঁকে পড়ছে। দ্রুত এই পরীক্ষা পদ্ধতি বর্জন আমলে নেওয়া কি উচিত নয়? স্কুল অভিভাবক থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রতিটি মানুষ চায় অচিরেই এই পরীক্ষা বন্ধ হোক। বিগত কয়েক বছর ধরে এই পরীক্ষা বন্ধ হওয়ার কথা উঠলেও ঘুরে-ফিরে আসল জায়গায় ছাত্র-ছাত্রীদের ঠিক সময়ে পরীক্ষা পূর্ব-প্রস্তুতি ও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাগারের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা যেহেতু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হয়েছে তাই পঞ্চম শ্রেণি শেষে পিএসসি পরীক্ষা থাকা উচিত নয়। এই পরীক্ষা ছাত্র-ছাত্রীর জন্য বড় ক্ষতিকারক বিষয় এবং এই পরীক্ষার চাপ সহ্য করার মতো মন- মানসিক ক্ষমতা তাদের নেই। এতে কোমলমতি শিশুদের মেধা বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। অনতিবিলম্বে এই পাবলিক পরীক্ষা তুলে দেওয়া উচিত।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাবলিক পরীক্ষা পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা দুটি চালু রাখতে শতভাগ সম্মতি দেখান। উনি ২০১৭ সালে নিজের অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, এ দুটি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও সাহস যোগাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে বোর্ডের পরীক্ষা ভীতি দূর করে মেধাবী ও দরিদ্রদের মাঝে বৃত্তির নিয়মানুযায়ী বৃত্তি প্রদানের সুবিধার্থে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা ২০০৯ সালে চালু করা হয়। আসলেই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথার বাইরে তো কোন শিক্ষা ব্যবস্থা এই পরীক্ষা বন্ধ করতে পারবে না। সুতরাং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি পাবলিক পরীক্ষা (পিএসসি) বাদ দিয়ে শিশুদেরকে শিক্ষাক্ষেত্রে চাপের বোঝা হালকা করে সহজ ও সরল জীবন- যাপন করার সুযোগ করে দিন। যদি তা না হয় আমাদের শিশুরা মানসিক বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
একজন মা খুব দুঃখে বললেন যে- পিএসসি পরীক্ষার বোঝা মাথা থেকে কখন নামবে? বাচ্চাকে কি পড়াব, ওকে তো সকাল বিকাল মুখস্থ করাতে হচ্ছে পিএসসি পরীক্ষাটা কি? আরেকজন মা বাসায় – আত্মীয়স্বজন আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। একজন মা – ভাল পড়ার সন্ধানে ভাল টিচারসহ ভাল কোচিং খুঁজতে খুঁজতে ফুটপাতের মাটি ক্ষয় করেছেন। এভাবে প্রত্যেক মা- বাবা কোন না কোনভাবে সন্তানের পড়ালেখা নিয়ে চিন্তিত। হয়তোবা আপনারা বলবেন – অতিরঞ্জিত করছে। আসলে অতিরঞ্জিত নাকি সন্তানের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য শিক্ষার্থীর বন্ধু হয়ে সাহস যোগাচ্ছেন একমাত্র অভিভাবক ও স্কুল শিক্ষকেরা। মা- বাবা ছাড়া তো কেউ এমন ভাবে অনুধাবন করছে না? তবে প্রত্যেক স্কুলের শিক্ষক ও অভিভাবক কে অনুরোধ জানাচ্ছি শিশুদের পাশে থেকে আনন্দ ও সাহসের সাথে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভাল রেজাল্ট করার সুযোগ দিন। কোন রকম যেন মানসিকভাবে দুর্বল না হয়ে পড়ে সেভাবে খেয়াল ও যত্ন নেওয়া দরকার। তবে শেষমেশ আফসোস একটি, এত কষ্টের পরীক্ষাটির সুফল শুধুই একটি কাগজ যাকে বলা হয় পিএসসি সার্টিফিকেট তাও আবার শিশুদের ভবিষ্যতে কোন কাজে আসছে না। তাহলে কেন এই পরীক্ষানীতি চর্চা থাকবে? এটার কি কোন যৌক্তিকতা আছে? আগামী বছর এই পরীক্ষার হাল কেমন জানি না, তবে চলতি পরীক্ষায় সমাপনী পরীক্ষার্থীরা ভাল রেজাল্ট করুক সেই প্রত্যাশা করছি। সকল পরীক্ষার্থীর প্রতি শুভ কামনা জানাচ্ছি। যুদ্ধ করে বীরের মত ঘরে ফিরুক আমাদের সন্তানরা।
লেখক : কবি

x