অবৈধভাবে বালু উত্তোলন : জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

বিভিন্ন সময়ে কর্ণফুলী নদীর দূষণ, দখল ও দু পাড়ের অবৈধ উচ্ছেদ নিয়ে সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয়সহ নানা প্রবন্ধ নিবন্ধ আমাদের আজাদীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে আমরা বলার চেষ্টা করেছি যে, কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ধারক ও প্রাণভোমরা হিসেবে খ্যাত। এ নদী প্রকৃতির অপার দান। দেশের অর্থনীতিতে এই নদীর অবদান অপরিসীম। উদার হস্তে এই নদী দিয়ে যাচ্ছে দেশ ও জাতিকে। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় এই নদী এখন ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। নদীটির প্রাণস্পন্দন এখন অনেকটা ম্রিয়মাণ। ক্রমাগত দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে কর্ণফুলী আজ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরে গড়ে উঠেছে ২ হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা। নদীর আশপাশের শিল্পকারখানার বর্জ্য, সিটি করপোরেশনের পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যের একাংশের ময়লা-আবর্জনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নদীতে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা ১৭টির বেশি খাল-ছড়া দিয়ে জাহাজের তেলবর্জ্যও সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। বিষিয়ে উঠেছে নদীর পানি। ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্যরে দূষণে খাল-ছড়াগুলোও বলতে গেলে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদীর আশপাশের বেশিরভাগ শিল্পকারখানায় ‘তরল বর্জ্য শোধনাগার’ বা ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপন করা হয়নি। ফলে এসব কারখানার দূষিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। দিনের পর দিন দূষণ বাড়তে থাকায় নদীর পানিতে দ্রবীভূত অঙিজেন কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে কমে গেছে। অব্যাহত দূষণের কারণে কর্ণফুলী নদীতে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। দূষণের কারণে নদীর পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। দূষণ বাড়তে থাকায় নদী ও নদীর আশপাশের সার্বিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার দখল ও দূষণে জমছে পলি, ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। নদীতে চর পড়ে নদীর গভীরতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি নদীর প্রশস্ততাও কমে নদীটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।
গত ১১ ফেব্রুয়ারি ‘কর্ণফুলীর আরেক দুঃখ, প্রতিদিন অর্ধশত ড্রেজারে তোলা হচ্ছে ২০ লাখ ঘনফুট বালু, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ জীববৈচিত্র্য’ শীর্ষক আরো একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আজাদীতে। এতে বলা হয়েছে, একদিকে দখলে দূষণে বিপর্যস্ত, অপরদিকে কর্ণফুলীর ‘আরেক দুঃখ’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে এর থেকে নির্বিচারে বালু উত্তোলন। শুধু নতুন ব্রিজ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত নদীর দুপাড়ে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক বৈধ-অবৈধ বালুর মহাল। দিন-রাত নদীর বুকে দাপড়ে বেড়াচ্ছে বালু বহনকারী বোট ও ড্রেজার মেশিন। দৈনিক ৫০টি ড্রেজার মেশিনে ১৫/২০ লাখ ঘনফুট বালু তোলা হচ্ছে। আইন মানা তো দূরের কথা, বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে না সরকারি, না বেসরকারি কারোর কোনো নিয়ম বালাই নেই। পরিবেশবিদরা বলছেন, এতে নদীর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংকটের মুখে পড়ছে। এক পরিবেশবিদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী নদীতে বিচ্ছিন্নভাবে মাটি বালু উত্তোলনের ফলে নদীতে সেডিমেন্টেশন হচ্ছে এবং নদীর বাস্তুতান্ত্রিকতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাস্তুতান্ত্রিকতা না থাকলে নদী ক্রমশ মৃত নদীতে পরিণত হবে। এটি বাড়তে থাকলে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণির জন্য নদীতে জীবন ধারণ কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে পানিদূষণসহ নদীগর্ভের গঠন প্রক্রিয়া বদলে যাচ্ছে। নদীতে চর পড়ে নদীর গভীরতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি নদীর প্রশস্ততাও কমে নদীটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।
কর্ণফুলী দখল ও দূষণে মানুষের চেয়ে নদী ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ভার বেশি। বন্দর মোহনা থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কর্ণফুলী নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তপক্ষের। কিন্তু তারা সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্ণফুলীতে নোঙরকারী শত শত জাহাজের পোড়া তেল প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীতে ফেলছে। কিন্তু বন্দর নীরব ভূমিকা পালন করছে। নদীর উভয় তীরের শতাধিক শিল্প কারখানা, বাজার, ঘাটের মাধ্যমে নদী দূষণ হচ্ছে। এজন্য কর্ণফুলী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন আরো জোরদার করার বিকল্প নেই। খরস্রোত না হলে অনেক আগেই কর্ণফুলী বুড়িগঙ্গা হয়ে যেতো। যদিও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কর্ণফুলীর নতুন ব্রিজ ও কালুরঘাটে কোনো বালুর মহালের ইজারা দেননি বলে উল্লেখ করেছেন, তবু জেলা প্রশাসনের নামে ইজারা দেওয়া হয়েছে বলে রয়েছে নানা অভিযোগ। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের মাত্রা বেশি। অবৈধভাবে যারা বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে ড্রেজার মেশিন জব্দ করেছে। পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু তার সংখ্যা এতোই নগণ্য যে উল্লেখ করার মতো না। মোট কথা, এ ব্যাপারে প্রশাসনকে আরো বেশি কঠোর হতে হবে। দেশের অর্থনীতিতে কর্ণফুলী নদীর গুরুত্ব বিবেচনা করে এই নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

x