অপরিচিত বিদেশি বন্ধুর ডিজিটাল ফাঁদ!

সোহেল মারমা

সোমবার , ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ

নগরীতে অপরিচিত বিদেশি বন্ধুর স্মার্ট কথাবার্তা ও লোভনীয় ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে টাকা-পয়সা খোঁয়াচ্ছেন অনেকেই। প্রথমে বন্ধুত্ব, পরে নানা সুবিধা প্রদানের কথা বলে কৌশলে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে একটি বিদেশি চক্র। এমনকি তাদের ফাঁদে পা দিয়ে বোকা বনে প্রতারিত হচ্ছেন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন উচ্চ শ্রেণির ব্যক্তিরাও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এমন প্রতারণা সম্প্রতি ব্যাপক হারে বেড়েছে। অপরিচিত ওইসব বিদেশি বন্ধু প্রতারক চক্রের লোকজনও কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধরা পড়ছে। কিন্তু অধিকাংশই অধরা থেকে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে সাইবার ক্রাইম নিয়ে বিভিন্ন সময় কাজ করা নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) আসিফ মহিউদ্দীন আজাদীকে বলেন, মূলত ফেসবুকে বিদেশি নাগরিকদের প্রোফাইল খুলে একটি চক্র দেশের নানাজনের সাথে প্রথমে বন্ধুত্ব করে, পরে তাদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দেশি-বিদেশি মিলে এসব প্রতারক চক্রগুলোর হাতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রতারিত হওয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। মূলত লোভে পড়ে বিভিন্নজন চক্রটি হাতে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
এডিসি আসিফ মহিউদ্দীন বলেছেন, ২০১৮ সালের শুরুতে একটি প্রতারণার ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে ঢাকা থেকে চারজনকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের একটি টিম। পরে যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ওই চক্রের সাথে নাইজেরিয়া, আফ্রিকার লোকজনও জড়িত। তবে বিদেশি নাগরিক হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। ওই মামলাটি পরবর্তীতে সিআইডি ওপর তদন্ত ন্যস্ত করা হয়েছে। সাইবার ক্রাইম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা নগর গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা বলছেন, ডাক্তার-ব্যাংকার থেকে শুরু করে হাইপ্রোফাইলের লোকজনও চক্রটির প্রতারণার শিকার হয়েছেন। কারো কারো ২৫ লাখ, কারো ৫০ লাখ, এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে চক্রটি। ওইসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত অব্যহত রয়েছে বলে জানান তিনি। এই ধরনের প্রতারণার ঘটনাগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন সময় অভিযোগ আসছে বলে জানান এডিসি আসিফ মহিউদ্দীন।
কেইস স্টাডি-১ : সার্জেন্ট অলিভিয়া স্যামুয়েল নামে এক নারী ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সিতে কর্মরত। এক বছর আগে ফেসবুকে তার সাথে বন্ধুত্ব হয় চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সোহরাব হোসাইনের সাথে। অলিভিয়ার মতো বন্ধু পাওয়ায় তার সোনার হরিণ পাওয়ার মতো মনে হয়। ম্যাসেঞ্জার, ওয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ হতো। এক বছরেরও বেশি সময় সম্পর্ক গড়ার পর গত ২৬ নভেম্বর ওই বিদেশি নাগরিকের কথামতো কাজ করতে গিয়ে সোহরাব প্রায় দেড় লাখ টাকা খোঁয়ান। কথাবার্তার মাধ্যমে বিদেশ থেকে দেড় মিলিয়ন ডলারের একটি গিফট আইটেম সোহরাবের ঠিকানায় ঢাকা বিমানবন্দর কাস্টমস শাখায় আসে। সেটা দিয়ে সোহরাবকে ব্যবসা করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য বলেছিলেন ওই বিদেশি নাগরিক। কাস্টমস থেকে সোহরাবকে ফোন করে গিফটিগুলো ছাড়িয়ে নিতে ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর জন্য বলা হয়। তিনি ওই অ্যাকাউন্টে টাকাগুলো পাঠিয়ে দেন। টাকা পাঠানোর পর ওই বিদেশি নাগরিকের ফেসবুক আইডি ডিঅ্যাকটিভ হয়ে যায়। পরে সোহরাব বুঝতে পারে বেনামী ওই বিদেশি নাগরিকের কাছে তিনি প্রতারিত হয়েছেন। তিনি দারস্থ হন কোতোয়ালী থানা পুলিশের।
পতেঙ্গার কাঠগড়ে বসবাসরত সোহরাব হোসাইন আজাদীকে বলেন, তার (স্যামুয়েল অলিভিয়া) সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আমরা দু’জন সবকিছুই শেয়ার করেছিলাম। কখনো নিজের, কখনো এলাকার খবর বিভিন্ন সময় অলিভিয়ার সাথে শেয়ার করতাম। নিজের ক্যারিয়ার গঠনের বিষয়ও আলোচনা করতাম ওই নারীর সাথে। তিনিও তার বিভিন্ন বিষয় আমার কাছে শেয়ার করতেন।
তিনি বলেন, আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল বেশিরভাগই ম্যাসেঞ্জার ও ওয়াটসঅ্যাপ। কোনো কোনো সময় অডিওর মাধ্যমে কথা বলতেন তারা। কিন্তু ভিডিও চাটের সুযোগ পাইনি। ইংরেজীতে খুবই পারদর্শী ছিল অলিভিয়া। তার ইংরেজীতে দ্রুত কথাবার্তা ও চ্যাট দেখে বুঝার কোনো উপায় নেই যে, তিনি কোনো প্রতারক হবেন। এছাড়া তিনি যে একটি বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন সেটা বিশ্বাসের জন্য তার আইডি কার্ডের একটি ছাবি ওয়াটসঅ্যাপে পঠিয়ে দেন।
সোহরাব জানান, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার পর তার কাছে কখনো মনে হয়নি যে তিনি ওই বন্ধুর কাছে প্রতারিত হবেন।
কেইস স্টাডি-২ : নগরীর চকবাজার বড় মিয়া মসজিদ এলাকার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন। সদ্য এমবিএ পাসের পর বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য ওঊখঞঝ করছেন তিনি। দেশে একটি ইন্টারন্যাশনাল ক্লাবের সাথে জড়িত। বিদেশি অনেক বন্ধুর সাথে অনলাইনে তার বন্ধুত্ব রয়েছে। তাদের এমনই একজন বন্ধু ব্রিটিশ নাগরিক পরিচয় দেয়া ম্যারিও। তার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির পর উভয়েই তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে আলোচনা করেন। গিয়াস বিদেশে পড়ালেখার সুযোগ সম্পর্কে জানতে চান ম্যারিওর কাছে। ম্যারিও ওই বিষয়ে তাকে বিস্তারিত বলেন এবং গিয়াসকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। পরে ব্রিটিশ আইনজীবী দিয়ে তাকে একটি আমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হবে বলে পরামর্শ দেন। ওই আমন্ত্রণ পত্রের মাধ্যমে তিনি ব্রিটেনে পড়ালেখার সুযোগ পাবেন বলেও জানান ম্যারিও। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে সন্দেহ হলে তিনি তার পরিচিত এডুকেশন কনসালটেন্সিকে বিষয়টি খুলে বলেন। ওই কনসালটেন্সি প্রক্রিয়াটি সঠিক বলে জানায় তাকে। পরে ওই ব্রিটিশ নাগরিকের কথামতো তিনি রাজি হয়ে যান। কিছুদিন পর কুরিয়ারে ইনভাইটেশন লেটার ও গিফট গিয়াসের নামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে বলে তাকে ওয়াটসঅ্যাপে জানানো হয়। এ সময় গিফটের ছবিও পাঠানো হয়। একদিন পর মালামালগুলো নেয়ার জন্য ভারতের দিল্লীর ট্রাকন কুরিয়ার কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ফোন আসে গিয়াসের কাছে। ৫৫০ পাউন্ড দিয়ে মালামালগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বলা হয় তাকে। ওই সময় গিয়াস ওয়েবসাইটে কোম্পানিটির প্রোফাইল যাচাই-বাছাই করে দেখেন। ওয়েবসাইটে সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পান। পরে ডাচ বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের একটি অ্যাকউন্ট হোল্ডারের নম্বর দেওয়া হয় কোম্পানিটির পক্ষ থেকে। পরে ভালো করে যাচাই-বাছাই করে ডাচ বাংলা ব্যাংক জুবলি রোডে ব্রাঞ্চ থেকে টাকাগুলো ওই অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন গিয়াস। এরপর ইন্ডিয়া কাস্টমস থেকে গিয়াসের কাছে একটি মেইল আসে, যাতে ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা পাঠানোর দাবি করা হয়। পরে তিনি বুঝতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। গত ২৬ অক্টোবর এই সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দায়ের করা হয় কোতোয়ালী থানায়।
উভয় প্রতারণার ঘটনাটি বর্তমানে তদন্তের দায়িত্বে থাকা কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক সজল কান্তি দাশ আজাদীকে বলেন, দুটি ঘটনারই তদন্ত বর্তমানে চলমান রয়েছে। আমরা এখনো বেশিদূর যেতে পারিনি। তবে ধারণা করছি, একটি প্রতারক চক্র এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবহার করে এসব কাজগুলো বিভিন্ন জনের সাথে করে যাচ্ছে। চক্রটির সাথে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কিছু অসাধু লোকজনও জড়িত।
সজল কান্তি বলেন, ইতোমধ্যে যেসব অ্যাকাউন্টগুলোতে টাকা লেনদেন হয়েছে, ওইসব অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের তথ্য চেয়ে একটি চিঠি কর্তৃপক্ষ বরাবরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ঘটনায় যেসব মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে তা চট্টগ্রামের বাইরে। এরমধ্যে একটির অবস্থান ঢাকায় বলে জেনেছি। আমরা জড়িতদের অবস্থান শনাক্ত করে ধরার চেষ্টা করছি।

x