অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ
80

আমাদের দেশে বড় কোনো ঘটনা ঘটলে তার রেশ থাকে অল্প কিছু দিন। বড় কোনো অন্যায়ের ঘটনা সংঘটিত হলে তার প্রতিবাদে তোলপাড় হয় পুরো দেশ। সামাজিক মিডিয়াগুলোতে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদ সমাবেশ হয় বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্‌তু কয়েক দিন অতিবাহিত হওয়ার পর সেই ঘটনাও অতলে হারিয়ে যায়। মানুষ ভুলে যায় সব কাহিনী। নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাও কয়েক দিনের মধ্যে মানুষের বিস্মৃতির গহবরে হারিয়ে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবু আমরা বলতে চাই, ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহানের মৃত্যু শুধু তার আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীদের কাঁদায়নি,কাঁদিয়েছে পুরো বাংলাদেশকে। লাখো মানুষকে কাঁদিয়ে বিদায় নিয়েছে নুসরাত। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ‘এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যার পেছনে ছিলেন ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। নারী নির্যাতন মামলায় কারাগারে থেকেও তিনি তাঁর সহযোগী কতিপয় দুর্বৃত্তকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। যারা প্রথমে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে চাপ দিয়েছিল। কিন্‌তু নুসরাত মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় দুর্বৃত্তরা তাকে বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যায়।
নৃশংসতা বা অপরাধ পৃথিবীর সব দেশে সংঘটিত হয়। কিন্‌তু তার বিচার সব দেশে হয় না। যে সব দেশে বিচার হয় না সেসব দেশে অপরাধের পুনরাবৃত্তি চলে। যে সমাজ সভ্য নয়, সভ্যতা ও ভদ্রতা থেকে অনেক দূরে; সেই সমাজে অপরাধীর বিচার হওয়া দুরাশা মাত্র। আমাদের সমাজে বিচারের পদে পদে যে অলঙ্ঘনীয় বাধার প্রাচীর আছে, সে বিষয়ে কারো দ্বিমত আছে বলে মনে হয় না। যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা আমাদের দেশে ঘটলে, তা যেন জনসমক্ষে প্রকাশ না পায়, তার ব্যবস্থা প্রথমে আসে পরিবার থেকে। পরিবারই প্রথম ধামাচাপা দেয় ঘটনাটি। আর যদি পরিবারের পক্ষ থেকে সাহসী ভূমিকা নেওয়া হয়, তখন দেখা যায় বাধা আসে অপরাধীর পক্ষের মানুষের কাছ থেকে। একটা সমঝোতা কিংবা মীমাংসার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়।
এবারও নুসরাতের বেলায় সেই ঘটনাই ঘটলো। কিন্‌তু আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে আশাবাদী। কেননা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যাকারীদের ধরতে নির্দেশ দিয়েছেন। আইন যদি তার নিজস্ব গতিতে চলতো, তাহলে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের প্রয়োজন পড়ে না। নুসরাত হত্যাকারীদের বিচারকার্য সহজেই সম্পন্ন হতো। অভিযোগ এসেছে, এক্ষেত্রে পুলিশ যথাযথ ভূমিকা পালন করছে না। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল পত্রিকান্তরে বলেছেন,‘ফেনীর সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাদ্রাসার অভিযুক্ত অধ্যক্ষের মাধ্যমে কোনো না কোনোভাবে স্বার্থ উদ্ধারে জড়িত ছিলেন। আদালত বলেছেন, নুসরাতের মামলাটি যেন সাগর-রুনির মামলার মতো হারিয়ে না যায়। জনগণের শেষ রক্ষাকবচ আদালত। সেই আদালত যখন মামলা হারিয়ে না যাওয়ার কথা বলেন, তখন কোথায় যাবে? নারী নির্যাতনের মামলার ক্ষেত্রে এই হারিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বেশি দেখতে পাই।
জানা গেছে, নারী নির্যাতনের মামলায় সাজা পাওয়ার হার মাত্র তিন শতাংশ। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা বেশি। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আমরা জানি, কোনো প্রতিবাদ সমাবেশ, লেখালেখি, মানববন্ধন কিংবা কান্নাকাটি নুসরাত জাহানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। কিন্‌তু দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশা করি-এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত হবে। যেন হত্যাকারীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। এ ঘটনার যদি বিচার না হয়, ঘাতকরা যদি পার পেয়ে যায় তাহলে এরকম আরো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশংকা থাকবে। অপরাধীরা যত প্রভাবশালীর ছত্র ছায়ায় থাকুক না কেন, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে চালু আছে, তার অবসান ঘটাতে হবে। ন্যায্য ও কঠোর শাস্তি হলে অপরাধী চক্র নতুন করে অপরাধের ঘটনা ঘটানোর সাহস পাবে না।

x