অন্য আলোয় দেখা মুখ

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ১৭ জুলাই, ২০১৮ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ
53

আমার এই ছোট জগতটায় দাঁড়িয়ে এমন উচ্চতার মানুষগুলোর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের ছবি দেখতে পাবার সুযোগ হয়েছিল বলে আনন্দ হয়। কিন্তু জামাল স্যার বা সেন স্যারের পাণ্ডিত্য যেউচ্চতার এবং মানুষ হিসেবে তাদের যেমানবিক ব্যাপ্তি সেগুলো যত সহজে আমার মনের মধ্যে ঝড় তুলেছিল তেমন করে আমি আর কাউকে দেখতে পাইনি! আসলে দেখতে পাইনি কথাটা যে মস্ত বড় ভুল ছিল সেইটা টের পেলাম অনেক বছর পরে।

কবে যেন পড়েছিলাম মানুষের স্মৃতি থেকে নাকি কিছুই হারায় না, সবই জমা হয়ে থাকে। একথার সত্যমিথ্যে যাচাই করিনি। কিন্তু কোনো কোনো সময়ে নানা অবস্থার ভেতর পড়ে গিয়ে অগণিত স্মৃ্ি‌তর ভেতর থেকে কোনো একটা মন তোলপাড় করে দেয়। অথবা একটা কোনো মুখ ঘুরেফিরে জানাতে চায়আছি এইখানেই। আজকের সকালটা সেইরকম একটা স্মৃতির পাতা খুলে দিয়ে একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই বাসার এজমালি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি একজোড়া ঘুঘুর হুটোপুটিতে মুখর হয়ে উঠেছে বাসার সামনের একচিলতে সবুজ। সেই ঘুঘু দম্পতির আনন্দ দেখতেদেখতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে ওরা। অশক্ত শরীরের বুড়ো মানুষটা তার সহচরীর হাত ধরে এমন করে রাস্তা পার করিয়ে দিচ্ছে যেন সে টলমল পায়ের খুকি।

সেই মিষ্টি দৃশ্যে দেখতে দেখতে মনে পড়ল জামাল স্যারের মুখ, . জামাল নজরুল ইসলাম। মাঝে মাঝেই আমাদের সংসার পরিক্রমায় আসতেন তিনি। বাসার সামনের সুড়কি বিছানো পথটা হেঁটে আসার সময় সুরাইয়া চাচীর হাতটা এমন করে ধরে রাখতেন যেন স্যার ছেড়ে দিলেই চাচী পড়ে যাবেন। অথচ স্যার চাচীর তুলনায় অশক্ত ছিলেন। চার তলার জানালা দিয়ে দেখা সেই মধুর দৃশ্য মনের ভেতর মুগ্ধতার মুক্ত ছড়াত। প্রায়ই এই দৃশ্যের গল্প করেছি আমি নানা আড্ডায়।অশক্ত হাত বাড়িয়ে দিয়ে অন্য হাতটা শক্ত করে ধরে থাকা আর অশক্ত জেনেও পরম নির্ভরতায় সে হাতের কাছে নিজের ভার সমর্পনের পরম স্বস্তির ভেতর ওদের জীবনযাপন আমার মনের ভেতরেও একটা আরাম তৈরি করত। এই রকম আরাম বোধ আর একবার হয়েছিল ড. অনুপম সেনের বাসায় গিয়ে। একটা কোনো কাজে গিয়েছিলাম। একজন নার্স দরজা খুলে দিয়ে বসতে বলে ভেতরে চলে গেল। আমি না বসে দাঁড়িয়েদাঁড়িয়ে বইয়ের সংগ্রহ দেখছিলাম। পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে স্যারের গলা। এমন আদর করে তিনি গল্প করেছেন যে অন্যায় জেনেও কান খাড়া হয়ে গেছিল। আড়িপাতার অপরাধে মরমে মরে যাবার অনুভূতিকে ভোতা করে দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি হেঁটে এসে রুমটার দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম স্যার পরম আদরে গল্প করছেন কাকীমার সাথে। যদিও গত বিশ বছরের বেশী সময় ধরে তিনি বিছানায় অনেকটাই অচেতন। কোনভাবেই সাড়া দেবার মতো অবস্থা নয়। স্যার রুমে এলে আমি জানতে চেয়েছিলাম কেমন আছেন কাকীমা, স্যার খুব আস্তে করে বললেন ভাল আছেন। এই যে ভাল আছেন এটা কেবল নিছক বলার জন্যেই যে বলেছেন তা নয়। বলেছেন নিজেকে স্বস্তি দিতেও। এই দীর্ঘ সময় ধরে সেন স্যার যে কাকীমার পাশে পরম মমতায় দাঁড়িয়ে থাকেন সেটা ভাবতে গেলেই বিস্ময়ে চোখ বুজে আসে,মনের ভেতরটা স্বস্তিতে ভরে যায়।

আমার এই ছোট জগতটায় দাঁড়িয়ে এমন উচ্চতার মানুষগুলোর ব্যাক্তিগত জীবনযাপনের ছবি দেখতে পাবার সুযোগ হয়েছিল বলে আনন্দ হয়। কিন্তু জামাল স্যার বা সেন স্যারের পান্ডিত্য যেউচ্চতার এবং মানুষ হিসেবে তাদের যে মানবিক ব্যাপ্তি সেগুলো যত সহজে আমার মনের মধ্যে ঝড় তুলেছিল তেমন করে আমি আর কাউকে দেখতে পাইনি! আসলে দেখতে পাইনি কথাটা যে মস্ত বড় ভুল ছিল সেইটা টের পেলাম অনেক বছর পরে। তার কারণ যে আগ্রহ নিয়ে আমি তাদের দেখতাম তার পেছনে এই বড় মানুষদের জানবার একটা আগ্রহ কাজ করত খুব নীরবে সেটা সচেতনভাবে করতো এই কথা আমি বলছি না কিন্তু করতো যে এখন সেটা উপলব্ধি করতে পারি।

অথচ আমার চেনা গন্ডিতে এমন মানবিক মানুষ যে ছিল না তা নয়, কিন্তু অসাধারণকে জানবার একাগ্রতার কাছে চেনা জগতের সাধারণ মানুষগুলোর মুখ ফিকে হয়ে যেত। যে কারণে আমার বড় মামার মতো অমন অতুলনীয় মানবিক মন বহুকাল পর্যন্ত আমার কাছে অনুল্লেখ্য হয়েই ছিল। বড় মামাকে আমার মনে পড়তো না তাও নয়। বরং আহীর জন্মাবার পরে আরও বেশী করে মনে পড়তো। মনে পড়বার কারণও ভারী অদ্ভূত। প্রতিবার আহীরের পায়ের নখ কাটবার সময় বড় মামাকে আমার খুব মনে পড়তো। পায়ের নখ কাটতে গেলেই আহীর পা টেনে সরিয়ে নিত বারবার আর এই সরিয়ে নেয়ার ভেতর ছেলেবেলার আমি আর আমার বড় মামা ফিরে ফিরে আসতো।

ছেলেবেলায় আমাদের স্কুল ছুটির দিন মানেই নানাবাড়ি। আর আমরা নানাবাড়ি যেদিন যেতাম তারপরে যে শুক্রবার পড়তো সেই শুক্রবার সকালে আমার বড় মামার সাথে আমাদের নির্ধারিত কাজ সেরে ফেলতে হতো। আমাদের সবাইকে দাঁড় করিয়ে একে একে হাত পায়ের নখ কাটত বড় মামা। হাতের নখ কাটার সময় টু শব্দটি করতাম না কিন্তু পায়ের নখ আমি কাটতে চাইতাম না। বারবার সরে যেতাম আর মামার কাজ ছিল ধরে এনে বকতেবকতে আবার কাটতে বসা। এমন বোচা করে কেটে দিত যে এরপরে আরও অনেকদিন নখ কাটবার দরকার হতো না। আর রাতের বেলায় বড় কামরার ঢালাও বিছানা করে দিত , খুব যত্ন করে মশারি গুজে দিত। বড় মামার সারাজীবনে তার চারপাশটার জন্যে সে যত্নের ছাপ ছিল কেবল নিজের বেলায় ছাড়া। খুব সাধারণ ছিল বড় মামা, অনেকের ভিড়ে তাকে আলাদা করা কঠিন ছিল শুধু নয় চোখেও পড়বার মতো ছিল না। আর তার জীবনযাপনে দৃষ্টি গোচর হবার কোন চেষ্টাাই ছিল না। ফলে সাধারণ শরীরে যে অসাধারণ মানবিক মন আমার বড় মামা বয়ে নিয়ে গেছেন সেটা চোখেই পড়েনি। অথচ আমরা সেটা জানতাম না তা নয়, কিন্তু আলাদা করে তাকে দেখবার কথা ভাবিনি হয়তো। এমনই বোধহয় হয় মানুষের সবচাইতে কাছের মুখ গুলোর বিশেষত্ব চোখে পড়বার জন্যে খানিকটা দূরত্ব রচনা করতে হয়। আজ যখন তাকে নিয়ে লিখতে বসেছি তার সাথে সকল যোগাযোগের সমাপ্তি ঘটে গেছে। শিশুর মতো হাসিমুখের মানুষটা আর নেই আমার জীবনে। আজ আমি বুঝি এই জীবনপাঠশালায় মানবিকতা শিক্ষার ক্লাসে আমার প্রধান শিক্ষক আমার বড় মামা।

আমার বড় মামী দেখতে দারুণ সুন্দরী ছিলেন এতটাই দারুণ যে সহজে চোখ ফেরানো যেত না। আর কেবল সুন্দরী ছিলেন তা নয় বেশ পরিচ্ছন্ন পরিপাটি থাকতেন। গুনে নয় রূপে মুগ্ধ হয়ে বড় মামা মামীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু কেউ জানত না যে আমার বড় মামী মানসিকভাবে অসুস্থ, অসুখটা প্রথম দেখায় টের পাবার কোনো কারণও ছিল না। বিয়ে হয়ে আসার অল্প দিনের মাথায় সেটা ধরা পড়ে। ধরা পড়বার পরে যা হয় ডাক্তার বৈদ্য ঝাঁড়ফুক কিচ্ছু বাদ যায়নি। অনেক রাত পর্যন্ত আমার নানাও জেগে থাকতেন বড় মামীর ওষুধ খাওয়ানোর জন্যে। একবার এক হুজুর মাশোয়ারা দিলেন মাঘের শীতে অমবস্যায় সমুদ্র থেকে জোয়ার ভাটার পানি নিয়ে এসে গোসল করালে অসুখ সেরে যাবে। আমার নানা গেছিলেন সেই কনকনে শীতের রাতে সমুদ্র থেকে সেই পানি আনতে পাছে আমার বড় মামা শীতের ভয়ে পানিটা ঠিক মতো না আনে। কিন্তু কিছুতেই সেঅসুখ সারানো গেল না। দিনে দিনে অসুখ বাড়তে শুরু করেছে আর সে অসুখের সাথে পাল্লা দিয়ে লড়ে চলেছে বড় মামা। অথচ তাকে দেখলে কেউ ভাবতেই পারতো না যে এই লড়াইটা তিনি লড়তে সক্ষম। সাদামাটা সাধারণ সুখেদুঃখের ভেতর বাস করতে চাওয়া মানুষটার জীবনটা অদ্ভূতভাবে বদলে যেতে শুরু করল। মামীর অসুখের সাথে লড়তেলড়তে অল্প বয়েসেই শরীরের উদ্যম প্রায় ফুরিয়ে গেছে, মনের উদ্যমও অস্তমিত তবু লড়াইটা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জারি রেখে গেছেন।

তিনি ঠিক আধুনিক মানুষ নন। আধুনিকতা নিয়ে তার কোনো মাতামাতি ছিল না। নারীবাদী মানুষ তো অবশ্যই নন, কারণ ওইরকম বড় তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো নিরন্তর স্বস্তির এবুং সুস্থির জীবন তার ছিল না। তার ছিল কেবল একটা প্রায় উম্মাদ মানুষকে নিয়ে লড়াই করবার নিত্যদিন। সেই নিত্যদিনের ভেতর বড়মামার তিন সন্তান হলো। সংসারে টিকে থাকবার লড়াইটা আরো সুকঠিন হলো তার। রোজ এই লড়াইয়ের ময়দানে মার খেতে খেতে ঘুরে দাঁড়াত মানুষটা। চারপাশের অনেকেই তাকে আর একটা বিয়ে করবার কথা নানাভাবে বলেছে কিন্তু রাজি করাতে পারেনি। কারণ একমাত্র বড় মামী। মানসিক ভারসাম্যহীন স্ত্রীর জীবনকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবার মতো কঠিন কাজ তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে নিজের জীবনটাকে দুর্বিষহ যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। বহুদিন আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছি পরম মমতায় মামীর মাথা আঁচড়ে দিচ্ছেন আমার বড় মামা। নোংরা ঘরদোর সাফ করেছেন। যারা কাছে থেকে মামার এই জীবনযাপন দেখেছে তার একবাক্যে স্বীকার করবে যে এমন সেক্রিফাইস করবার জন্যে নিজের প্রতি কতটা নির্দয় তাকে হতে হয়েছে।

দীর্ঘ আটত্রিশ বছরের সংসার জীবনে আমার বড় মামীকে কখনো অবহেলা করেননি। নিজের শরীরে ক্যান্সারের মতো অমন মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছে জানার পরেও তার একমাত্র চিন্তার কারণ ছিল আমার বড় মামী। হাসপাতালে দেখতে গিয়ে দেখেছি তার চোখে যে জলটুকু টলটল করেছে সেখানে যেদু:শ্চিন্তার ছায়া কাঁপছিল তার নাম রুবি। আমার বড় মামীর ডাক নাম। মারা যাবার আগে তার একমাত্র ছেলের কাছে বড় মামার অনুরোধ ছিল একটাই। খুব কাতর গলায় নাকি বলেছিলেন আটত্রিশ বছরে আমি তোমার মাকে কোনো অবহেলা করিনি, তুমিও করো না। তার অল্প কদিনের মাথায় বড় মামা মারা যান। বড় মামা যে নেই সেটাও আমার বড় মামী টের পেল না। তারপরে আর মাত্র আঠারো দিন বেঁচেছিলেন আমার মামী। যে দ:ুশ্চিন্তার ছায়া বড় মামার শেষ মুহুর্তের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছিল তা আর রইল না।

আমার নানা মারা যাওয়ার পর আমাদের নানাবাড়ি বেশ চুপচাপ হয়ে গেছে। সেখানে নিত্য কোলাহলের জায়গায় ঠাঁই করে নিয়েছে প্রগাঢ় শূন্যতা। কিন্তু বড় মামা মারা যাবার পরে বাড়ির নীচ তলাটা এমন ফাঁকা হয়ে গেছে যে ওখানে হাওয়াও যেন আসে না। রোদ পড়ে না সেই অর্ধগোলাকার টানা বারান্দায়, যেখানে আমাদের শৈশবের ছুটির দিন হুটোপুটি করতো। সবটাই বদলে গেছে একদম। নানাবাড়ির পথ মামাবাড়ির দরজায় গিয়ে থেমেছে। থেকে গেছে কেবল সেইসব শিক্ষা যা আমরা না চাইতেই আমাদের জীবনকে সুন্দর করেছে। বড় মামা কারো রোল মডেল হবার মতো ছিলেন না। কিন্তু নিজের অজান্তে তার জীবনের যে মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা সেটা আমাদের মানুষ হয়ে ওঠার ভিত্তিতে ইট গুজেছে। আজকে যখন ফিরে দেখি পুরনো দিন তখন সেখানে কোথাওকোথাও যে অন্যরকম আলো কাঁপে। সেকাঁপা আলোর ভেতর বড় মামার মুখটা ভারী উজ্জ্বল দেখায়।

x