‘অন্তত ২০ বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি’

যুদ্ধদিনের কথা

আকাশ আহমেদ, রাঙ্গুনিয়া

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ

বয়স যখন ২৬, তখন তিনি অংশ নিয়েছিলেন বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সরাসরি শুনে উজ্জীবিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রণাঙ্গনের সম্মুখযুদ্ধে। এই যুদ্ধে তিনি ২০ বারেরও অধিক সময় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেওয়ার স্বীকৃতি এবং সাহসী ভূমিকার জন্যে তিনি অর্জন করেন জয় পদক, সমর পদক, সংবিধান পদক, রণতারকা ও মুক্তি তারকা নামক মহামূল্যবান ৫টি পদক। বীর এই মুক্তিযোদ্ধার নাম হাজী গোলাম মোস্তফা। বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের পূর্ব খীলমোগল গ্রামে। মৃত্যুর কবল থেকে বার বার বেঁচে ফেরার সেই যুদ্ধদিনের কথা শুনুন তাঁর কাছেই।
‘১৯৬৭ সালে ইপিআর-এ চাকুরির সুবাদে সেখানে ২ মাস ট্রেনিং নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় ক্যাম্পে যোগদান করি। ১৯৭১ সালে সেখান থেকে পুনরায় ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে আমি সহ অন্যান্য ইপিআর সদস্যরা চট্টগ্রাম হালিশহরের ট্রেনিং ক্যাম্পে আসি। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর প্রোগ্রামে রেসকোর্স ময়দানে নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে ৩২ জন ইপিআর সৈনিক পাঠানো হয়। তাদের একজন ছিলাম আমি। মাঠে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রতিটি কথা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়েই আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিই স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয়ার। ঢাকার পিলখানায় ইপিআর হেডকোয়ার্টারে তিন দিন থেকে ফিরে আসি রামগড় কোম্পানির অধীনে বাগান বাজার ক্যাম্পে। ২৬ শে মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রামে ঠিক কি হচ্ছে বুঝতে পারছিলাম না। তবে কিছু একটা হচ্ছে সেটা নিশ্চিত বুঝতে পারছিলাম। এরমধ্যে উপরের মহল থেকে হুকুম এলো ভারত পানে সবাই যেনো এক রাউন্ড করে গুলি বর্ষণ করে। এতে নিশ্চিত হয়ে গেলাম আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। সেই হুকুম না মেনে ওইদিনই বাঙালি সুবেদার ইলিয়াছের নেতৃত্বে আমি সহ ১৮ জন সিপাহী ক্যাম্প থেকে চলে আসি। ঝাঁপিয়ে পড়ি পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে। শুরুতেই এই ১৮ জন সৈনিক করের হাটের মেজর আলী আকবর পেট্টোল পাম্পের পেছনে পুকুর পাড়ে অবস্থান নিই। সেখানে ১ দিন থাকার পর কুমিরা ডিফেন্সে সুবেদার ইলিয়াছ, সুবেদার মুছা ও ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে কুমিরায় পর পর দুই দিন পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিই। এই দুই দিনে রণাঙ্গনে চোখের সামনেই শহীদ হয়েছিলেন সহযোদ্ধা তোরাব আলী, মনছুর ও লুৎফর সহ আর বেশ কয়েকজন। ভাগ্যক্রমে সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে আমি বেঁচে ফিরেছিলেন। এভাবে কুমিরার বিভিন্ন স্পটে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ শেষে চলে আসি রাউজানের রাবার বাগান এলাকায়। সেখানেও সম্মুখ যুদ্ধে আমাদের হাতে পরাজয় বরণ করে পাকিস্তানিরা। এ সময় পাক বাহিনীর কর্নেল আজিজ তার পরিবার নিয়ে আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করেন। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অপারেশন হলো পাঠাননগর অপারেশন। পাঠাননগর ছিল পাকিস্তানি পাক বাহিনীর একটি শক্ত ক্যাম্প। এই ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে তাদের পরাস্ত করে ক্যাম্পটি মুক্তিবাহিনীদের দখলে আনা হয়। এভাবে চট্টগ্রাম, ফেনী সহ বিভিন্ন এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিই। দেশকে শক্রমুক্ত করে লাল-সবুজের স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্তত ২০ বার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি।
একদিন রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা আমার বাড়ি ঘেরাও করেছিল এবং আমি বাড়ি এলে প্রাণে বাঁচতে চাইলে আত্মসমর্পন করতে শাসিয়ে যায় আমার মা-বাবাকে। এতে আমার বাবা হাজী নুরুল ইসলাম ও মা আয়শা খাতুন খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা আমার চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়েন। লোকমুখে এই খবর শুনে তাঁদের দেখতে একরাতে বাড়ি এসেছিলাম আমি। আমাকে কাছে পেয়েই তারা বার বার অনুরোধ করেন পাক বাহিনীর হাতে আমি যেনো আত্মসমর্পন করি। কিন্তু দেশকে হানাদার মুক্ত করার নেশায় বিভোর আমি সেদিন মা-বাবাকে শান্তনা দিয়ে স্বাধীন দেশের সংগ্রামে অংশ নেওয়া হাজারো মায়ের সন্তানদের গল্প শুনিয়েছিলাম। সে সময় আমি কয়েকদিন এলাকায় অবস্থান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. নুরুল আলমের সহযোগিতা নিয়ে এলাকা থেকে আরও একদল মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করে স্বাধীকার আন্দোলনে ফিরে যাই। এই দলের মধ্যে পুলিশের সাবেক আইজি খোদাবক্স চৌধুরীও ছিলেন। ভারতে ফিরে যাওয়ার সময় মা কিছু টাকা, তিনটা স্বর্ণের আংটি, কিছু গুড় ও চিড়া দিয়েছিলেন এবং আমার জন্য প্রচুর কান্নাকাটি করেছিলেন বাবা ও মা।
আমার বয়স এখন ৭৫ ছুঁই ছুঁই। সংসারে আমি আর স্ত্রী। এক কন্যা ছিল। বিয়ে দিয়েছি। সংসারে আয় রোজগার করার কেউ নেই। মেয়ের জামাই দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিনের সহায়তায় ২০০৮ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যার ২য় বারের শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাবদ্ধ হয়েছিলাম। প্রথমে ২ হাজার টাকা করে ভাতা পেলেও এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার তা বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করেছে। তা দিয়েই আমাদের ভরণ-পোষণ, ওষুধ খরচ সহ যাবতীয় সবকিছু চলছে। জীবনে কোন সম্পদ অর্জন করতে না পারলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। তার কন্যার হাত ধরে মাসিক ১২ হাজার টাকা ভাতা পেয়ে বাকী জীবন কাটাচ্ছি। জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই, স্বপ্ন নেই। তবে একটি অপূর্ণ ইচ্ছে আছে, মৃত্যুর আগে যদি একবার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে পারতাম, জীবনটা সার্থক হতো।

x