অনিয়মের অভিযোগে ভোট বর্জন, বিক্ষোভ

ডাকসু নির্বাচন

আজাদী ডেস্ক

মঙ্গলবার , ১২ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। তবে ভোটে কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করেছে ছাত্রলীগ ছাড়া বাকি সব প্যানেল। তারা একে ‘প্রহসনের নির্বাচন’ উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জুড়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। সমাবেশ থেকে তারা আজ মঙ্গলবারের সকল ক্লাস পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেয়। নির্বাচনের পর গতকাল বিকেলে সিনেট ভবনে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের কাছে নির্বাচনে ভোট কারচুপির লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ছাত্রদল, বাম সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্যানেলের প্রার্থীরা। পুনরায় তফসিলের দাবি জানিয়ে বাম সংগঠনগুলোর প্যানেলে ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী বলেন, সকাল ৮টা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভোটগ্রহণে ব্যাপক কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। হলগুলোতে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব কায়েম রয়েছে বিধায় অনুষদে ভোটকেন্দ্র করার জোরালো দাবি জানিয়েছিলাম আমরা। যেখানে নারীদের হলে দখলদারিত্ব তুলনামূলক কম সেখানে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল, রোকেয়া হল, কবি সুফিয়া কামাল হলসহ বিভিন্ন হলে হাতে-নাতে জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। এছাড়া অন্যান্য হলগুলোর সামনে লাইন জ্যামিং করে শিক্ষার্থীদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধু হলের শিক্ষার্থী ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক ইশতিয়াক সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে পারেননি বলে অভিযোগ করেন।
তবে ভোট বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্বাচন বাতিল করার মতো গুরুতর কিছু ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ গণমাধ্যমকে বলেন, বিক্ষোভ করতেই পারে, কিন্তু আমি যতটা দেখেছি, এরকম দাবি করার মতো অবস্থা মনে হয়নি। তারা কোন প্রমাণ দিলে তদন্ত করে দেখবো উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। কিন্তু নির্বাচন বাতিল করার মতো অবস্থা হয়েছে বলে আমি মনে করি না।
এর আগে সকালে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী আবাসিক হলে আগে থেকে সিল মারা ব্যালট পাওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং বলা হয়, সেগুলোতে হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রার্থীদের নামের পাশে সিল দেয়া ছিল। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে হলের ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। রোকেয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পরে ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
এ ব্যাপারে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সামাদ বলেন, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে কিছু অনিয়ম হয়েছিল, তবে সেখানে নতুন ব্যালট বাঙ ও ব্যালট পেপার দিয়ে আবার ভোটগ্রহণ শুরু করে দেয়া হয়।
এছাড়া সকালে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক পদে ছাত্রলীগের প্রার্থী গোলাম রাব্বানীর উপস্থিতিতে রোকেয়া হলে সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুরুর উপর হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ আসে। স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান বলেন, নুরুসহ অন্তত চারজনের ওপর হামলা করা হয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রলীগ জানায়, রোকেয়া হলে কোটা আন্দোলনের লোকজন খালি ব্যালট পেপার ছিনতাই করে সেখানে ‘নাটক’ সাজিয়েছে। আর বাংলাদেশ কুয়েত-মৈত্রী হলে পাওয়া ব্যালট পেপারগুলো ‘ফটোকপি’।
ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বাম জোটের ভিপিপ্রার্থী লিটন নন্দী, সাধারণ শিক্ষার্থী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ভিপি প্রার্থী নুরুল হক নুরু এবং জিএস পদপ্রার্থী রাশেদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন জানান, ছাত্রলীগের বিজয় নিশ্চিত জেনে তাদের নামে গুজব ছড়ানো হয়েছে। তিনি সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক নুরু অভিনয় করেছেন বলেও দাবি করেন।
নির্বাচনের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলছেন, ‘দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া’ এ নির্বাচন ‘উৎসবমুখর’ হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচনে বিভিন্ন ‘অনিয়ম’ তুলে ধরে এই নির্বাচন স্থগিত করে নতুন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরামর্শ দিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক, যারা নিজেদের উদ্যোগে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার কথা জানিয়েছেন। ভোটগ্রহণ শেষে ওই শিক্ষকরা এক বিবৃতিতে বলেন, বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনের অনিয়মের ঘটনাগুলো আমাদের খুবই লজ্জিত করেছে। এই ঘটনা জনগণের করে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে বিনষ্ট করেছে। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, যা সার্বিকভাবে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ বিঘ্নিত করবে। এত বছর পরে অনুষ্ঠিত এই ডাকসু নির্বাচন সফলভাবে না করতে পারার ব্যর্থতার দায়ভার প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষক সবার এবং এই ব্যর্থতা সমগ্র শিক্ষক সমপ্রদায়ের নৈতিকতার মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব ঘটনার তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিবৃতিদাতা শিক্ষকরা হলেন- গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন ও অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহমিনা খানম ও অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক অতনু রব্বানী।

x