অদক্ষ কর্মীরা শিল্প চালালে কঠিন হবে শিল্পের বিকাশ

শনিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৯ at ৪:১২ পূর্বাহ্ণ
26

শুরুর দিকে দেশে শিল্প বলতে ছিল পাটকল। পরে রফতানিমুখী পোশাক খাত দিয়ে শুরু হয় উৎপাদনমুখী শিল্পের যাত্রা। এ ধারাবাহিকতায় গত চার দশকে অনেকগুলো শিল্প বিকশিত হয়। এগুলোর চালিকাশক্তি ছিল অদক্ষ শ্রমিক। আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ বলছে এখনো অদক্ষ শ্রমিকই চালাচ্ছেন বাংলাদেশের শিল্প। বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা ইউএসএআইডি। প্রতিবেদনে শিল্পভিত্তিক অদক্ষ কর্মীর হার প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, শিল্প ভেদে অদক্ষ কর্মীর হার সর্বনিম্ন ৭৩ দশমিক ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে শিল্পের পত্তনে অদক্ষ শ্রমিকরাই মূল ভূমিকা রেখেছে। তবে অদক্ষতা বা স্বল্প দক্ষতা দিয়ে আগামীতে শিল্পের বিকাশ কঠিন হবে। শিল্পের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে।
এটা স্বীকৃত সত্য যে, বর্তমানে দেশে দক্ষ মানবসম্পদের যথেষ্ট অভাব আছে। গত কয়েক বছরে শিক্ষার হার জ্যামিতিক হারে বাড়লেও সেই অনুপাতে দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি হয় নি। আমরা প্রায়শঃ জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও কোরিয়াকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে উল্লেখ করি। কিন্তু এসব দেশ কী করে রোল মডেল হলো, সেটা ভাবি না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ও সঠিক নেতৃত্বের কারণেই যে এসব দেশ এতটা চমকপ্রদ উন্নয়ন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, সেটা ভেবে দেখি না। বাংলাদেশ উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এখনো জনসম্পদ সে দক্ষতা অর্জন করতে পারে নি। বাংলাদেশে শিল্প ভেদে অদক্ষ কর্মীর হার সর্বনিম্ন ৭৩ দশমিক ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ। উদ্বেগের বিষয়, দেশে শিক্ষিত মানুষ বাড়লেও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে অদক্ষ শ্রম শক্তি। প্রথাগত শিক্ষায় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনসম্পদ তো তৈরি হচ্ছেই না, অফিশিয়াল চিঠি, ই-মেইল ও অফার লেটার আদান-প্রদানের মতো বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন শ্রমশক্তিও তৈরি হচ্ছে না। এ কারণে লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষিতরা যেমন চাকরি পাচ্ছেন না, তেমনি চাকরিদাতারাও দেশে যোগ্য লোক না পেয়ে বাধ্য হয়ে বিদেশিদের বেশি বেতনে নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতো তো হবেই। আর এজন্য সরকারি বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। কারণ ব্যক্তির অদক্ষতায় রাষ্ট্রেরই ক্ষতি বেশি। অদক্ষ কর্মীর কারণে উৎপাদনশীলতা কমছে, এর প্রভাব পড়ছে দেশের জাতীয় উৎপাদনে। আগামীতে শিল্পায়নের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ জনশক্তির কারণে তা বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের বিপুল কর্মক্ষম ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সময়োপযোগী মানব সম্পদে পরিণত করার দায়িত্ব শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। খাতওয়ারি মানবসম্পদ প্রয়োজন। বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি, ব্যবসা বাণিজ্য ও কারিগরি ক্ষেত্রে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারলে ‘সময় এখন বাংলাদেশের’ স্লোগান বাস্তবতার মুখ দেখবে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন পরিষদের কার্যক্রমের আওতায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের সব কর্মজীবীকে আনতে হবে। এ প্রয়োজন মেটাতে এবং সময়োপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তুলতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়’ করা যেতে পারে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং উন্নত দেশ গড়তে জনশক্তিকে মানবসম্পদে তৈরি করা ছাড়া উপায় নেই। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী মালয়েশিয়া নাম দিয়েছে ‘মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়’ তাদের শ্রম মন্ত্রণালয় নেই। শ্রমিক নিয়ে নয়, তারা মাথা ঘামাচ্ছে মানবসম্পদ সৃষ্টিতে। দক্ষতার ভিত্তিতে জনশক্তিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদে পরিণত করছে তারা। উন্নত দেশের অন্যতম রোল মডেল সিঙ্গাপুরে শ্রম মন্ত্রণালয় বলে কোন মন্ত্রণালয় নেই। এ জাতীয় সব কাজ করে ‘জনশক্তি মন্ত্রণালয়’। সিঙ্গাপুর চায় দক্ষ জনসম্পদ। চীনেও শ্রম মন্ত্রণালয় বলে কোন মন্ত্রণালয় নেই। কিন্তু একই ধারণায় আধুনিকোত্তর রূপ নিয়ে কাজ করে দেশটির ‘মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়’। জাতীয় শ্রমনীতি থেকে শুরু করে প্রয়োজন অনুযায়ী মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে তাদের মন্ত্রণালয়। জাপানে ‘স্বাস্থ্য শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ‘শ্রম মন্ত্রণালয়’ দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করছে। রাশিয়া ও ফ্রান্সে এ মন্ত্রণালয়কে বলা হয় ‘শ্রম ও সামাজিক বিষয়াবলি সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়’। জনশক্তিকে মানবসম্পদে পরিণত করার কাজ করে যাচ্ছে তারা। আমাদেরও অদক্ষ জনশক্তিকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। জোর দিতে হবে কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের ওপর। বাড়াতে হবে শিক্ষার মান। জ্ঞান-বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য জোর দিতে হবে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের ওপর। তথ্য প্রযুক্তি, ব্যাংক বীমাসহ কারিগরি উৎকর্ষ অর্জনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। আমাদের দেশে বিপুল জনশক্তি রয়েছে, কিন্তু তারা প্রযুক্তি গতভাবে অদক্ষ হওয়ায় একদিকে যেমন দেশের শিল্পায়ন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জনশক্তি রফতানিতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এমনতর বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমাদের প্রত্যাশা- সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে আরো যত্নবান হবে কর্তৃপক্ষ। পর্যাপ্ত দক্ষ জনশক্তিই পারে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। তাই উন্নতমানের প্রচুর কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক।

x