অতি দারিদ্র্য দূরীকরণের সর্বজনীন পদ্ধতি এবং পুওর ইকোনমিক্‌স

প্রফেসর ড. নারায়ন বৈদ্য

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ

পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। যদিও বলা হচ্ছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে রূপান্তর হবে, তবুও বলা যায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত এ দেশে প্রায় ২০ শতাংশ লোক দরিদ্রসীমার নীচে অবস্থান করছে। অবশ্য জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে এখনো পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ লোক দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৯ অনুসারে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৩৭ লাখ। সে হিসেবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে এদেশের অতি দরিদ্র জনসংখ্যার পরিমাণ হয় ৩ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার। আর যদি জাতিসংঘের হিসাবকে মেনে নেয়া হয় তবে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র্যের পরিমাণ হবে ৪ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার। অতি দরিদ্র কারা? এর সংজ্ঞাইবা কি? ২০১৯ সালের বিনিময় হার অনুযায়ী বলা যায় অতি দরিদ্র বলতে তাদেরকে বোঝানো হবে, যারা দৈনিক ১.২৫ ডলার বা ১০৬ টাকার কম আয় করে [ ৳ ১ = ৳ ৮৫ হারে ]। দরিদ্ররা যে দরিদ্র, তার কারণ শুধু এই নয় যে তাদের টাকা নেই। আরো নানাবিধ অভাবের কারণে তারা দরিদ্র। যেমন- অনেক মৌলিক বিষয়ে সম্যক জ্ঞান। আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধা এবং নিজদের সক্ষমতার ওপর আস্থার অভাব। এ কারণে ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’-র (এমআইটি) অর্থনীতি বিষয়ের অধ্যাপক অভিজিত বিনায়ক বন্দোপাধ্যায় এবং এস্তার ডুফলো তাঁদের ২০০৪ সালে প্রকাশিত বই ‘পুওর ইকোনমিকস’-এ বলেছেন- দরিদ্রদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শুধু দক্ষতা, ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ালেই হবে না, আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন হবে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, অতি দরিদ্র থেকে মুক্তি পাওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়।
অতি দারিদ্র্য দূরীকরণের যত রকম কর্মসূচি আছে তাতে দেখা গেছে শুধু অল্প কিছু এলাকার অল্প কিছু লোক অল্প কিছু সময়ের জন্য উপকৃত হয়েছে। এসব কর্মসূচীতে যে দরিদ্র পরিবারগুলোকে আওতাভুক্ত করা হয়, শুরুতে তাদের অনেকেই দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসে। কিন্তু এ উঠে আসাটাকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায় না। অধিকাংশ পরিবার কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ক্ষুদ্র ঋণ। এ ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে শুধুমাত্র তারাই উন্নতি করতে পারে যারা ব্যক্তি হিসেবে উদ্যোগী প্রকৃতির। তবে অতি সত্য কথা হলো যে, বাংলাদেশে অতি দরিদ্রের মধ্যে এ ধরণের উদ্যোগী মানুষের সংখ্যা খুবই কম। একইভাবে বলা যায়, ‘শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ’- এ ধরনের প্রকল্পের সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। আবার এ তত্ত্ব বা বিধি পৃথিবীর সব দেশে সমভাবে প্রযোজ্য হয় না। কারণ একটি দেশের সাথে অপর একটি দেশের লোকদের মধ্যে আচার ব্যবহার, নিয়মনীতি, সংস্কৃতি এবং মানসিকতার পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া রয়েছে পারিপার্শ্বিকতার ভিন্নতা। এসব কারণে অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তন আনাটা সবচেয়ে কঠিন। তাই দরিদ্ররা বৃত্তের মধ্যে যুগ যুগ ধরে ঘুরপাক খায়। তবে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সঠিক নেতৃত্ব পেলে এ অবস্থা থেকে অনেকাংশে উঠে আসা সম্ভব। এমআইটি-এর অধ্যাপকবৃন্দ (অধ্যাপক ব্যানার্জি ও অধ্যাপক ডুফলো) দীর্ঘদিন গবেষণা করে দারিদ্র্য দূরীকরণের এমন একটি কৌশল বের করেছেন যা পৃথিবীর সব দরিদ্র দেশে প্রযোজ্য হবে। সাত বছর ধরে বিশ্বের ছয়টি দেশে ১০ হাজার অতি দরিদ্র পরিবারের ওপর তাঁরা গবেষণাটি পরিচালনা করেন। পরিবারগুলোকে প্রথমে কিছু সম্পদ যেমন- গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি হস্তান্তর করা হয়। এরপর দরিদ্র পরিবারগুলোকে দেয়া হয় কিছু নগদ অর্থ সহায়তা। সবশেষে দুই বছর ধরে তাদেরকে নানারকম প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেয়া হয় যাতে তারা প্রাপ্ত সম্পদগুলোকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। ঘানা, পেরু ও পাকিস্তানের মতো কয়েকটি দরিদ্র দেশে দেখা গেছে অতি দরিদ্র পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদী জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমআইটির গবেষক ব্যানার্জি, ডুফলো ও তাঁদের সহযোগীরা স্থানীয় এনজিওদের সাহায্য নিয়ে এ মডেলটি পরীক্ষা চালিয়েছেন ইথিওপিয়া, ঘানা, হন্ডুরাস, পেরু, পাকিস্তান ও ভারতে। সব জায়গায়ই অতি দরিদ্রদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। ভারতে যে পরিবারগুলো এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে তাদের ৭৩ শতাংশ ছিল অতি দরিদ্র। ইথিওপিয়ায় ছিল ৬৬ শতাংশ। এদের সবার দৈনিক আয় ছিল ১.২৫ ডলারের কম। এ ছয়টি দেশে দরিদ্র পরিবারগুলোকে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি- এগুলোর মধ্যে একটি সম্পদকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়। পাশাপাশি এক বছর ধরে প্রতিদিন এক কেজি চাউল কেনার জন্য যে পরিমাণ টাকার প্রয়োজন সেটাও তাদেরকে দেয়া হয়। প্রদত্ত সম্পদ ব্যবহার করে কিভাবে আয় রোজগার করা যায় তা নিয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সাথে তারা যাতে ভেঙে না পড়ে সেজন্য উৎসাহও দেয়া হয়। অর্থ সঞ্চয় করার ব্যাপারে কোন কোন দেশে বেশি জোর দেয়া হয় আবার কোন কোন দেশে কম জোর দেয়া হয়। তবে কর্মকৌশলের প্রক্রিয়া ছিল সবখানে একই। এ কর্মসূচিগুলোর দুই বছরের মেয়াদ শেষে দেখা গেছে, অন্যদের তুলনায় অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলো মাসিক খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ বেড়েছে ৫ শতাংশ। প্রতিটি পরিবারের আয়ও বেড়েছে। রাতে খালি পেটে ঘুমাতে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কমেছে। সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আরো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, অতি দরিদ্র পরিবারগুলোকে প্রাথমিক অবস্থায় যে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল দেয়া হয়েছিল সেগুলো তারা খেয়ে ফেলেনি। তারা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে দৈনিক গড়ে সাড়ে ১৭ মিনিট বেশি কাজ করেছে। অবশ্য এক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন- হন্ডুরাস ও পেরুতে কাজের সময় তেমন একটা বাড়েনি। ইথিওপিয়ায় বেড়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি হলো যে, অতি দরিদ্রদের মধ্যে যারা দরিদ্রতম (অর্থাৎ একেবারে নীচের দিকে ১০ শতাংশ পরিবার) তাদের পারিবারিক ব্যয় ও সম্পদের ব্যবহারের ওপর একটা দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। গবেষকরা যখন কর্মসূচিগুলো শুরু হওয়ার এক বছর পর এই পরিবারগুলোর সদস্যদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলেছেন, দেখা গেছে তখনই তারা আগের চেয়ে বেশি সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেছেন। আগের চেয়ে বেশি আয় করেছেন। তাদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণও বেড়েছে।
বিশ্বের হৃত দরিদ্রদের কথা ধনী ব্যক্তিরা ভাবে না। কিন্তু দারিদ্র্য দূর করা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বের যে সব অর্থনীতিবিদরা গবেষণায় নিয়োজিত তাদের মধ্যে অভিজিত ব্যানার্জি ও এন্তার ডুফলো অন্যতম। আর তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণের কৌশলই হল ‘পুওর ইকোনমিক্‌স’।
লেখক : পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক,
বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

x