অটিজম এবং পুনর্বাসনের আবশ্যকতা

সালমা নূর ডলি

মঙ্গলবার , ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫০ পূর্বাহ্ণ
6

“হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস”। মানুষ তার নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। যারা ভীরু, দুর্বল, যাদের আত্মবিশ্বাস কম, শুধু তারাই অদৃষ্টবাদী। মানুষ অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠ শ্রমের দ্বারা তার নিজ ভাগ্যকে সার্থক করে তোলে। বিজ্ঞানের এ যুগেও কোন কোন মানুষ বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেকে সমর্পণ করে অদৃষ্টের অলীক হাতে। আসল কথা মানুষের ভাল কর্ম হল সুপ্রসন্ন সৌভাগ্যের জনক। স্রষ্টা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বিশেষ কর্তব্যের জন্য। মানুষের কাজ হল স্রষ্টার উপাসনা করা। কিন্তু স্রষ্টাকে পাবার জন্য বা তাকে সন্তুষ্ট করতে হলে, তার সৃষ্টি করা জীবকে সেবা করতে হবে। তাই দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন, বিপন্ন জনের কল্যাণে সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েই স্রষ্টার সেবা করা যায়। জীব প্রেমই ঈশ্বরপ্রীতির প্রকৃত পথ। অটিজমের সাথে অদৃষ্ট ও সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি দুটো কথাই সমান ভাবে জড়িয়ে আছে। অটিজম পরিবার গুলোর কোন কর্মের ফলে অটিজম শিশুর জন্ম নয়। এটা একান্তই অদৃষ্টের ফল। আবার সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট এই বিশেষ শিশু গুলোর সেবার মধ্যেও সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভ করা সম্ভব। অটিজমের চলার পথ অবশ্যই কন্টকাকীর্ণ। কিন্তু ক্লান্তির ভয়ে পথিক ভীত হয়ে পড়লে তার পক্ষে গন্তব্য স্থলে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। অটিজম শব্দটিকে এই বিশ্বায়নের যুগে যেমন নতুন করে এতটা পরিচয়ের প্রয়োজন নেই, তেমনি আবার, অত্যন্ত তীব্র যন্ত্রণার মর্ম বাণী হচ্ছে, এই অদৃষ্টের লিখন এবং ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কি পরিণাম হবে? এই সব মা, বাবাদের এই প্রশ্নের জবাব এখন পর্যন্ত প্রশ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাদের অবর্তমানে তাদের এই বিশেষ শিশুদের কে দায়িত্ব নেবে? কিভাবে তারা স্বাবলম্বী হবে? কি তাদের শেষ পরিণাম? এই নিয়ে প্রতি নিয়ত চরম উৎকন্ঠায় দিনাতিপাত করছেন বিশেষ শিশুর অভিভাবকরা। উপর্যুপরি এই বিশেষ শিশুগুলোর পরিচর্যাও অনেক চ্যালেঞ্জিং ও কষ্টসাধ্য।
অটিজমদের জন্য প্রয়োজন : ১।সঠিক ও বিশেষ প্রশিক্ষণ। ২। উৎকৃষ্ট, নিয়মিত এবং প্রয়োজন অনুসারে বিভিন্ন থেরাপী প্রয়োগ জরুরি। ৩।স্বাভাবিক বিদ্যালয়গুলোর মানবিক আচরণ প্রদর্শন ও অটিজম শিশুদেরকে প্রশিক্ষণ বা প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করা। স্বাভাবিক শিশুদের সাথে মেশার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। ৪। বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত উৎকৃষ্ট মানের প্রশিক্ষক দ্বারা তাদের আচরণগত সমস্যা কাটানো অত্যন্ত জরুরি, যা অটিজমের ক্ষেত্রে মূল মন্ত্র।
৫।সামাজিকতা শিক্ষার জন্য পরিবার, আত্মীয় পরিজন ও সমাজের মানুষের সহায়তা বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। যা তাদেরকে অটিজম থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করবে। ৬। মানব সম্পদে রূপান্তর করার জন্য সমাজের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে তাদের কর্মের সুযোগ প্রদান করতে হবে। এটাও একরকম মানব সেবা যা সৃষ্ট জীবের সেবার অন্তর্ভুক্ত এবং স্বাবলম্বী হওয়ার আসল ঠিকানা। ৭। খেলাধুলা সহ অন্যান্য বিনোদন মূলক কার্যক্রমে, তাদের স্ব-স্ব দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে, তাদেরকে সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। ৮। ঊধৎষু ঊহঃবৎ ঠবহঃরড়হ হচ্ছে এমন সময়ের দাবী যা ভবিষৎ পরিকল্পনার পথ সুগম করবে। ৯। অটিজমদের দক্ষতা অনুসারে দক্ষতার মূল্যায়ন করে, তাদেরকে মানব সম্পদে রূপান্তর করা। যাতে রাষ্ট্র উপকৃত হয়। ১০। সব চেয়ে জরুরি পুনর্বাসিত করা।
গোটা বিশ্বে অটিজমের হার যেমন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি আবার তাদের কল্যাণে ও স্বাবলম্বিতার প্রশ্নে নব নব প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কাজটিও সমান তালে দ্রুততার সাথে, রাষ্ট্রের উন্নতির স্বার্থেই এগিয়ে যাচ্ছে উন্নত রাষ্ট্র গুলোতে। কারণ, বিশ্বের উন্নত দেশ গুলো এখন প্রত্যেকটা ধাপই এগুচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে। অটিজমদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, পুনর্বাসন ও তাদের ভবিষৎ ইত্যাদিও তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়ে না। কারণ, এটা এখন অনেক দেশেরই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটা অংশ জুড়ে আছে। তাদেরকে এক পাশে রেখে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো যায় না। তাই অটিজমদের দক্ষতার মূল্যায়ন উন্নত রাষ্ট্র গুলোতে অনেক বেশি হয়। যার কিছু কিছু সুফল আমরা মিডিয়ার বদৌলতে বা দেশের বাইরে যেয়ে চাক্ষুষ যা দেখি তা হল, স্বাভাবিকদের দক্ষতাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা হার মানায়। তাদেরকে দিয়ে কাজ করানো চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। আবার মনে রাখতে হবে, তাদের কাজের পরিধির সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু যতটুকু অর্জন তা আবার বিস্ময়কর। সঠিক ও বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ, সুবিধা মানবিক আচরণ, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা তাদেরকে বিফলতার অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ থেকে আলোর পথ দেখাবে এটা এখন সময়ের দাবি মাত্র।
বাংলাদেশ আয়তনের তুলনায় তৃতীয় বিশ্বের একটি অত্যন্ত জনবহুল দেশ। বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে, বাংলাদেশের উন্নয়ের ধারা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি, সামাজিক অবক্ষয় সহ, বিচিত্র ধারার সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ। উপর্যুপরি অটিজমে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম নয় এবং এটা প্রতিরোধ যোগ্যও হয়ে উঠেনি। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তর সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশে বর্তমান শিশুরাই যদি এই দেশকে ভবিষ্যৎ কাণ্ডারী হিসাবে দেশকে পরিচালনার দায়িত্ব কাঁধে নেয়। দেশ গড়ার কারিগর হয়। তবে, অটিজমরা দেশের বোঝা হয়ে দেশকে পিছিয়ে রাখবে কেন? এই বিষয়টি ভাববার সময় কি এখনো আসেনি? এখনকার ছোট শিশুগুলোর সাথে যেই অটিজম শিশুগুলো এখনো ছোট, তারা কি একদিন যুবক হবেনা? তখন তাদের দক্ষতার মূল্যায়ন না হলে, বা স্বাবলম্বী বা পুনর্বাসনের পথটি কন্টকাকীর্ণ রয়ে গেলে, তারা তাদের পা ফেলবে কোথায়? তাদের জায়গাটি মসৃণ করার দায়িত্ব সমাজ বা রাষ্ট্রের। কারণ, তারা তো অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসের শিকার। অটিজমদের এই বিশাল অংশের বৃদ্ধি যেমন থেমে নেই, তেমনি তাদের নিয়ে ভাববার সময় অপচয় করার ও সময় নেই। সময়ের কাজ সময়ে করে এই কঠিন বাস্তবতাকে অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে না দিয়ে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার কাজটি দু্রত শুরু করতে হবে। বিশেষ শিশু ও পরিবারগুলোর প্রতি আর্ত মানবতার সেবার মূল বাণী হোক।
‘হে বিশেষ শিশুরা তোমরা যেই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি, আমরাও একই সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টি, শুধু আমাদের সাথে তোমাদের পার্থক্য হলো, তোমরা ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকার। তবে, তোমরাও সৌরভ ছড়াতে জান।’এভাবেই স্বপ্নের পুনর্বাসনের স্তম্ভ একের পর এক বাস্তবে রূপ নেবে। মা, বাবাদের চোখের পানি শুকিয়ে মরুভূমিতে রূপান্তরের পূর্বে ফুল ফোটাতে হবে, বিশেষ শিশুদের ভবিষৎ রচনা করে। যেন মা বাবাদের অবর্তমানেও তাদের অভাব তারা বুঝতে না পারে। সমাজের মানবিকতার হাত এতটা শক্তিশালী হোক ও ওয়াদা রক্ষার কাজটি নিখুঁত হোক। আশা রাখি অন্যদের প্রসারিত হাত তাদেরকে একা হতে দেবে না। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য বলতে, এই ধারায় এগুনোকেই বোঝায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সমাজকর্মী

x