অচল হাছানের সচল মেধা

কাজী মোশাররফ হোসেন : কাপ্তাই

সোমবার , ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ
46

মাদ্রাসা ছাত্র মোঃ হাছানের কথা আজাদী পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে। গত ২ ডিসেম্বর ‘মায়ের কোলে চড়ে মাদ্রাসায়’ শিরোনামে মোঃ হাছানের ছবিসহ আজাদীর ১০ নম্বর পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। লিচুবাগানের চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটে অবস্থিত ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেন’ এর ৫ম শ্রেণির ছাত্র ছিল মোঃ হাছান। সে হাঁটতে পারেনা। মায়ের কোলে চড়ে প্রতিদিন মাদ্রাসায় যাতায়াত করতো। ডান হাতও প্রায় অচল। মায়ের কোলে চড়ে মাদ্রাসায় যাতায়াত করে এবং প্রায় অচল হাত দিয়ে লিখে হাছান এবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। হাছান হাঁটতে পারেনা। ডান হাতে লেখার শক্তিও নেই। বলতে গেলে একেবারে অচল। কখনো মা আবার কখনো বোনের কোলে চড়ে ছোট বেলা থেকে মাদ্রাসায় যাতায়াত করতো হাছান। বন্ধুরা যখন একে অপরের সাথে গায়ে গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে মাদ্রায় যাতায়াত করতো তখন সে মা অথবা বোনের কোলে চড়ে মাদ্রাসায় যাতায়াত করতো। মাদ্রাসার টিফিন আওয়ারে ছাত্রছাত্রীরা যখন খোলা চত্ত্বরে খেলাধুলা করতো, হাসা হাসি করতো, খেলারছলে একে অপরের গায়ে ধাক্কা দিত হাছান তখন বেঞ্চে বসে ড্যাব ড্যাব সবার দিকে তাকিয়ে থাকতো। আর মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো। অচল বসে থাকার বাইরে সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করার মত হাছানের আর বিশেষ কোন শক্তি ছিলনা। অবশ্য শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মোঃ ছিদ্দিকুর রহমান সবসময় হাছানের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। অন্য শিক্ষকরাও হাছানকে নজরদারিতে রাখতেন।
হাছান অচল বসে থাকলেও তার যেকোন প্রয়োজনে সহপাঠী বন্ধুরা কে কার আগে তাকে সাহায্য করবে এই নিয়েও ব্যস্ত থাকতো সবাই। সকলের ধারণা ছিল হাছান পরীক্ষায় সবার চেয়ে ভালো ফল করবে। সত্যিই হাছান ভালো ফল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এবতেদায়ী সমাপনীতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে হাছান এখন শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনের আলোকিত মুখ।
শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মোঃ ছিদ্দিকুর রহমান আজাদীকে বলেন, এবতেদায়ী, পিইসি, জেএসসি অথবা এসএসসিতে শতশত শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়। সেইসব শিক্ষার্থীরা সবাই শারীরিকভাবে সুস্থ। একজন সুস্থ শিক্ষার্থীর ফলাফলেও আশপাশের সবাই খুশি হয়। কিন্তু হাছানের মত প্রতিবন্ধী, যে নিজে চলার শক্তি রাখে না, নিজের হাতে কাগজ কলম টেনে নেবার ক্ষমতাও রাখে না সেই ছাত্র যদি এবতেদায়ী পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ পায় তা অবশ্যই সর্বত্র আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
হাছানের মা হাছনুর বেগম আজাদীকে বলেন, আমি এবং আমার মেয়ে তানিয়ো অনেক কষ্টে কোলে করে প্রতিদিন হাছানকে মাদ্রাসায় নিয়ে যেতাম। এবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষায়ও হাছানকে কোলে করেই পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যাই। আমার সেই ছেলে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এই জন্য আমি প্রথমে মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। পাশাপাশি শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ছিদ্দিকুর রহমানসহ সকল শিক্ষক মণ্ডলী এবং ছাত্রছাত্রীদের প্রতিও আমি অনেক কৃতজ্ঞ।
হাছানের মা বলেন আমার হাছান জন্ম থেকে এরকম প্রতিবন্ধী ছিল না। অজ্ঞাত এক রোগে হাছানের পা অচল হয়ে পড়ে। তার ডান হাতেও কোন সাড়া নেই। অনুরূপ এক রোগে আক্রান্ত হাছানের বড় ভাই মোঃ শামীম ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই মারা যায়। হাছানের ছোট ভাই একই মাদ্রাসার ছাত্র মোঃ আমিনও (৬) বর্তমানে একই রোগে আক্রান্ত। ছেলেদের চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ করেও কোন সুফল পাননি তিনি। এমন করুণ অবস্থায় থেকেও আমার ছেলে হাছান এবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ জন্য তিনি অনেক খুশি বলেও জানান।
শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মোঃ ছিদ্দিকুর রহমান জানান, হাছান অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। কখনো মা আবার কখনো বোনের কোলে চড়ে মাদ্রাসায় যাতায়াত করলেও সে লেখাপড়ায় অনেক ভালো। এবতেদায়ী সমাপনী পরীক্ষায় তাঁর মাদ্রাসা থেকে হাছান জিপিএ-৫ পাবে এটা তিনি আগেই ধারণা করেছিলেন। সেই হাছান জিপিএ-৫ পাওয়ায় মাদ্রাসার সকল শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী অনেক খুশি। ছিদ্দিকুর রহমান বলেন লেখার শক্তি না থাকলেও হাছানের হাতের লেখা অনেক সুন্দর। তার হাতের কাছে খাতা কলম ধরে দিলে সে অনেক সুন্দর করে লিখতে পারে। মাদ্রাসার প্রতিটি পরীক্ষায় হাছান বরাবর ভালো ফলাফল করতো বলেও তিনি জানান।
জিপিএ-৫ পাবার পর মেধাবী ছাত্র হাছানকে চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজারে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈয়্যবিয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়। ভর্তি হবার পর থেকে হাছান নিয়মিত মা অথবা বোনের কোলে চড়ে যথারীতি মাদ্রায় যাতায়াত করে। নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও হাছানকে মাদ্রাসার শিক্ষক মণ্ডলী পরম স্নেহে কাছে টেনে নেন। তার প্রতি সকলের বাড়তি নজরদারি থাকে। নতুন পরিবেশে নতুন শিক্ষার্থীরাও তার প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক রয়েছে। জানা গেছে চন্দ্রঘোনা তৈয়্যবিয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবু তৈয়ব নিজে এবং সবাইকে হাছানের প্রতি সুনজর রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। মাদ্রাসায় থাকা অবস্থায় হাছান যাতে কখনো কনে কষ্ট না পায় সে দিকে খেয়াল রাখার জন্য তিনি সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
হাছানের পূর্বের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মোঃ ছিদ্দিকুর রহমান এই প্রতিনিধিকে বলেন, হাছানের প্রতি আগে বাহিরের কারো তেমন লক্ষ্য ছিল না। কিন্তু আজাদীর কাপ্তাই প্রতিনিধি কাজী মোশাররফ হোসেন প্রথম যখন হাছানকে নিয়ে গত ২ ডিসেম্বর আজাদীতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তখন থেকে হাছান সকলের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়।
পাশাপাশি গত ৩১ ডিসেম্বর এবতেদায়ী পরীক্ষার ফল প্রকাশ হবার যখন দেখা যায় হাছান জিপিএ-৫ পেয়েছে। সেই খবরটিও কাপ্তাই প্রতিনিধির মাধ্যমে ১ জানুয়ারি যথারীতি আজাদীর শেষ পৃষ্ঠায় ছবিসহ প্রকাশিত হয়। বহুল প্রচারিত আজাদীতে একাধিকবার হাছানের পৃথক পৃথক ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশ হবার বিষয়টি নিয়ে সর্বত্র সাড়া পড়ে। পরবর্তীতে অন্যান্য গণমাধ্যমে হাছানের খবর প্রকাশিত হলেও হাছানকে সমাজের সামনে তুলে ধরার কাজটি সর্বপ্রথম করে দৈনিক আজাদী। এরপর থেকে মাদ্রাসায় আজাদীর পাঠক সংখ্যাও বেড়ে যায়। ছিদ্দিকুর রহমান বলেন হাছান শাহ মাহমুদিয়া ইসলামী মাদ্রাসা ও কিন্ডার গার্টেনে পড়ালেখা শেষ করে বর্তমানে চন্দ্রঘোনা তৈয়্যবিয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসায় পড়ছে। আমরা সবসময় তার খোঁজ খবর রাখার চেষ্টা করি। তার যে কোন প্রয়োজনে সহযোগিতা দিতেও তিনি প্রস্তুত আছেন বলে জানান।
হাছানের বাবা মোঃ আবু তাহের বলেন, অচল ছেলেই এখন আমাদের স্বপ্ন। তাকে লেখাপড়া শেখাতে আমরা আরো বেশি সচেষ্ট থাকবো।
তিনি বলেন, অনেক পরিবারে প্রতিবন্ধী সন্তানকে ভিক্ষায় নামিয়ে দেয়। এই ধরনের সন্তানকে শিশু বেলা থেকেই হাতে থালা ধরিয়ে দিয়ে আয় উপার্জনের জন্য পথে নামিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিবন্ধী শিশুটির কোন মেধা থাকলেও তা সে কাজে লাগানোর সুযোগই পায় না। ভবিষ্যতে এই ধরনের কোন সন্তানকে অবহেলা না করার জন্য তিনি সকলের প্রতি আহবান জানান।