অগ্রযাত্রা : উন্নয়ন ও সাফল্যের অনন্য সংকলন

রেজাউল করিম

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়/ আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/ সিঁথির সিদুর মুছে গেল হরিদাসীর/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো/ দানবের মতো চিৎকার করতে করতে/ তুমি আসবে ব’লে হে স্বাধীনতা/ ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েলস রাইফেল/ আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র/ তুমি আসবে ব’লে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম/ তুমি আসবে ব’লে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার/ ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতা-মাতার লাশের ওপর।’ স্বাধীনতা এলো অনেক ত্যাগ ও মা- বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে।
সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যেসব ইস্যুতে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তার মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি। চট্টগ্রামও এর বাইরে ছিল না।
‘ওরে সাম্পানওয়ালা, তুই আমারে করলি দিওয়ানা’ সাম্পানের মাঝি পাগল করে নদীতীরের তরুণীকে। সাম্পান একটি নৌযান। চট্টগ্রামের নদীতে এটা চলাচল করে।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্য এই সাম্পান। চট্টগ্রাম সবার অগ্রভাগে। ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে সশস্ত্র লড়াই চট্টগ্রামে হয়েছিল। স্বাধীনতার ঝাণ্ডা উড়ে। তিন দিন চট্টগ্রাম ছিল ফিরিঙ্গিমুক্ত। পাকিস্তানিরা যখন মুখের ভাষা কেড়ে নিতে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত করেছিল, তখন এই চট্টগ্রামে বসে অসুস্থ শরীরে কবি মাহবুবউল আলম চৌধুরী রচনা করেন অমর কবিতাখানি ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি।’ আর সেটি প্রকাশ করে কোহিনূর প্রেস। এই চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার উত্তাল দিনগুলোতে এক দফা দাবি উঠে। এরপর কর্ণফুলী, শঙ্খ, বাঁকখালী, মাতামুহুরী দিয়ে অনেক রক্ত প্রবাহিত হয়েছে। অতঃপর এলো স্বাধীনতা।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর তিনি ভঙ্গুর বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়ন, শান্তি-শৃঙ্খলা পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজান। আবার অঞ্চলের গুরুত্ব অনুযায়ী নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র তাঁর এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। দেশ চলতে থাকে পেছনের দিকে। দীর্ঘ একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগোতে থাকে। উন্নয়নের রোল মডেল এখন বাংলাদেশ। উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত রাখতে শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বাংলাদেশ পুলিশ বৃহত্তর পরিসরে এই শান্তির ধারাকে অব্যাহত রেখেছে।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, দুরন্ত কর্ণফুলী বিধৌত চট্টগ্রাম জেলার গ্রামীণ জনপদের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গি দমনের পাশাপাশি গণতন্ত্র, মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে জেলা পুলিশের প্রায় তিন হাজার সদস্য। পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় যুগোপযোগী পুলিশি সেবা নিশ্চিত করতে এই ইউনিটের আধুনিকায়ন ছিল সময়ের দাবি। সেই প্রয়োজনকে উপলব্ধি করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা অভিভাবক হিসেবে অপরাধ দমন, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অভ্যন্তরীণ সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার পাশাপাশি যে যুগান্তকারী উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদন করে চলেছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনা, উদ্যোগ, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা, সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান এবং গতিশীল নেতৃত্বের কারণে প্রায় তিন বছর ধরে সংস্কার ও উন্নয়নে ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে যেমন রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টা তেমনি রয়েছে-পুলিশ লাইন্স, পুলিশ সুপার অফিস ও বাংলোর সংস্কার উন্নয়ন। স্বল্প সময়ে পুলিশি সেবা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস, মাল্টিপারপাস মিলনায়তন, সুসজ্জিত ভাণ্ডার, সুপেয় পানি সরবরাহ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির প্রসার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এম. কামসুল হক পাবলিক স্কুলের সংস্কারসহ নানা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম এবং প্রবাসী সহায়তা ডেস্ক চালুর মতো মাইলফলক সৃষ্টিকারী উদ্যোগ। এছাড়া পুলিশ বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি ও বিনোদনে বছরজুড়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন-সবই তুলে ধরা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উন্নয়ন ও সাফল্যের সংকলন ‘অগ্রযাত্রা’য়। নিরাপত্তার সাথে প্রগতির পথে জেলা পুলিশের নানা কার্যক্রম, ছবিসহ সুনিপুণভাবে বিধৃত করা হয়েছে। অগ্রযাত্রা প্রকাশিত হয়েছে এ বছরের অক্টোবরে। পরিকল্পনা ও সম্পাদনা পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা। পরিষদের অন্য উপদেষ্টারা হলেন-পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রেজাউল মাসুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জিয়াউর রহমান। সদস্যরা হলেন-অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) এ কে এম এমরান ভূঁইয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. মশিউদ্দৌলা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মহিউদ্দিন মাহমুদ সেলিম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মো. জাহাঙ্গীর। সমন্বয় ও চিত্রগ্রহণে এসআই শফিকুল ইসলাম। প্রচ্ছদ ও অলংকরণে বিশ্বজিত তলাপাত্র। পরামর্শ, তত্ত্বাবধানে এজাজ মাহমুদ। সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম সুমন। সহযোগিতায়-মাহবুব উর রহমান, ইকবাল ভূ্‌ঁইয়া, মিনহাজুল ইসলাম। স্থিরচিত্রে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল ইমরুল কায়েস। সরবরাহে-কনস্টেবল রিয়াজ উদ্দিন, কনস্টেবল হাফিজ, কনস্টেবল তানভীর হাসান ও মো. রোমান। প্রোডাকশনে নোঙর।
অগ্রযাত্রার আমাদের কথায় জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা লিখেছেন, বাংলাদশ পুলিশের কল্যাণে বর্তমান সরকারের অসামান্য অবদান রয়েছে। গত ১০ বছরে সরকার পুলিশের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এক যথাসাধ্য আধুনিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৮৫ হাজার নতুন জনবল নিয়োগ হয়েছে। অনেক পদ বেড়েছে, বাড়ানো হয়েছে বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও যানবাহন সরবরাহ করে বাহিনীকে বিশ্বমানের করা হয়েছে। বরাদ্দ করা হয়েছে সর্বোচ্চ বাজেট।
অগ্রযাত্রায় ১০ টি অধ্যায়ে ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাশাপাশি চলমান কার্যক্রম, উন্নয়নের সচিত্র প্রতিবেদন সন্নিবেশিত করা হয়েছে। অধ্যায়গুলো হচ্ছে-বিবর্তনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ( জেলা পুলিশের ইতিহাস, জেলা পুলিশের বিদ্যমান অর্গানোগ্রাম, জেলা পুলিশ সুপার যুগে যুগে), অপরাধ প্রতিরোধে সাফল্য (চট্টগ্রাম জেলার অপরাধ পরিসংখ্যান, থানা পরিক্রমা, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, অপারেশন এ্যাসলাট-১৬, ৬ শত পিস স্বর্ণের বার উদ্ধার), উন্নয়ন সংস্কার (জেলা পুলিশ লাইন্সের উন্নয়ন ও সংস্কার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এম. কামসুল হক পাবলিক স্কুল, পুলিশ সুপার বাসভবন উন্নয়ন, যানবাহন প্রাপ্তি), উদ্যোগ (নারী ও শিশু নির্যাতন সেল, পুনাক, চট্টগ্রাম জেলা শাখা, কমিউনিটি পুলিশিং, গ্রাম পুলিশ, প্রবাসী সহায়তা ডেস্ক, পুলিশে চাকরি ১০০ টাকায়), কর্মসূচি পালন (জাতীয় দিবস, মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের সম্মাননা প্রদান, পুলিশ মেমোরিয়াল ডে, পুলিশ সেবা সপ্তাহ, কল্যাণ সভা, সুধী সমাবেশ, বিশেষ নিরাপত্তা, ট্রাফিক সচেতনতা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ কর্মশালা, ট্রেনিং ও মোটিভেশন, পদোন্নতি ও র‌্যাংকব্যাজ পরিধান, জাতীয় উন্নয়ন মেলা, ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা, বিদায় ও বরণ, প্রকাশনা ও উপহার সামগ্রী, ইফতার মাহফিল, প্রীতিভোজ, ফল উৎসব), খেলাধুলা (বার্ষিক পুলিশ সমাবেশ ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা-২০১৭, প্রীতি ফুটবল, কাবাডি), সাংস্কৃতিক আয়োজন (রাজারবাগ’৭১, পদোন্নতিপ্রাপ্তদের সম্মানে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, বার্ষিক প্রীতিভোজ ২০১৭), স্বীকৃতি ও প্রাপ্তি (সর্বোচ্চ পদক অর্জন, আইজিপি ব্যাজ অর্জন, রেঞ্জ সেরা হলেন যারা), ভালবাসা (প্রবাসীর প্রতি ভালবাসা), মানবিকতা (এক সহযোদ্ধার জীবন বাঁচানোর যুদ্ধ, মেধাবী শিক্ষার্থী নোমানের ভবিষ্যত রচনা, আহত সাংবাদিকের পাশে, আহত শিক্ষিকার পাশে, অসহায় বিধবার পাশে, লাশের উপর দাঁড়িয়ে ইফতার হয় না, তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের পাশে, এখন তারা চুরি ছেড়ে ভ্যানচালক, বদলে গেল ১০ শিক্ষার্থীর জীবন, ভালোবাসা দিয়েও নিয়ন্ত্রণ হয় অপরাধ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা বানিয়ে দিল পুলিশ, সদা প্রস্তুত, নিরাপত্তার স্বার্থে)।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী চট্টগ্রাম জেলার তৎকালীন পুলিশ সুপার এম. শামসুল হকের সাহসিকতার বিবরণ এতে আছে। একই সাথে তাঁর শহীদ হওয়ার ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে।
৩৪৪ পৃষ্ঠার সংকলনে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কার্যক্রম, উন্নয়ন, মানবিকতা, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি তথ্যচিত্রে পরিপূর্ণ। আমজনতার কিছু অংশের মাঝে পুলিশ-ভীতিকে দূর করবে। পুলিশ সত্যিকার অর্থে জনগণের বন্ধু অগ্রযাত্রায় তার প্রমাণ বহন করে। সাফল্যের অগ্রযাত্রা আরো বৃদ্ধি পাবে-এটা সবাই আশা করে।

x