অগ্নিঝুঁকি এড়াতে দমকল বাহিনীর সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগী হোন

সোমবার , ৯ মার্চ, ২০২০ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
83

ঢাকার মগবাজার দিলু রোডে পাঁচতলা ভবনের গ্যারেজে আগুন লাগার ঘটনায় নিহত ছেলে শিশু রুশদি ও স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীর পথ ধরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন শহীদুল কিরমানি রনিও। পুরো পরিবারের এই মর্মান্তিক মৃত্যুটি আমাদের মনে করিয়ে দিল আসছে শুষ্ক মৌসুম। বাড়ছে অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি। বিদ্যুতের শর্টসার্কিট, গ্যাস বিস্ফোরণ, দাহ্য কেমিক্যাল গোডাউন, রান্নাঘরসহ ছোটখাট অনবধানতায় ঘটে যাচ্ছে বড় দুর্ঘটনা। প্রতি বছরই অগ্নিকান্ডের ঘটনায় হতাহত ও সম্পদহানি ঘটছে। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়। কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে অগ্নিকান্ডের কারণ উল্লেখ করে। সতর্কতা অবলম্বনের জন্য কিছু সুপারিশও করে এ প্রতিবেদন। কিন্তু এসব সুপারিশের বাস্তবায়ন হয় খুবই কম। অসাবধানতা ও অসতর্কতার কারণে প্রতি বছরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অসংখ্য মানুষ হতাহত হচ্ছে এবং সম্পদদহনের মাধ্যমে রিক্ত, নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। গত বছরেই সারাদেশে ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে মারা গেছেন ১৮৫ জন। আহত হয়েছেন এক হাজারেরও বেশি। সম্পদহানি হয়েছে ৩৩০কোটি ৪১ লাখ টাকার। গত ১৩ বছরে বাংলাদেশে আগুনে পুড়েছে অন্তত ১২ হাজার মানুষ। আর এর মধ্যে মারা গেছেন এক হাজার ৯১৬ জন। গত ১৩ বছরে সম্পদহানির পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখিত এসব পরিসংখ্যান দমকল বাহিনীর প্রতিবেদন সূত্রে পাওয়া এবং পত্রিকান্তরে প্রকাশিত।
দমকল বাহিনীর ধারনা, ভবনটির নিচ তলায় গ্যারেজের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। অগ্নিকান্ডের সময়ে পাঁচতলা ভবনের ফ্ল্যাটগুলোর পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম চোখে হুড়াহুড়ি করে নামতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় শিশু ও স্ত্রীসহ তিনজনের একটি পরিবারও চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন। হাসপাতালে এখনও চিকিৎসাধীন আছেন দশজন। চলতি বছরে রাজধানীতে এটাই সবচেয়ে মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ।
২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর অগ্নিকান্ডে নিহত হয়েছিল ১২৪ জন। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টায় ওয়াহেদ ম্যানসনের আগুনে ৭০ জন প্রাণ হারান। এর এক মাস পর গত বছরের ২৮ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার ঘটনায় ২৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১১১ জন মারা যায়। এতে সরাসরি আগুনে পুড়ে মারা যায় ১০১ জন পোশাক শ্রমিক। পুরান ঢাকার নিমতলী চুড়িহাট্টা ও বনানীর অগ্নিকান্ডসহ কয়েকটি বড় অগ্নি দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীরা ছাড়াও যারা ঘটনার বিবরণ শুনেছেন তাঁরাসহ দেশের মানুষের মনে আতংকের বেদনাবহ স্মৃতি ও ক্ষত হয়ে রয়েছে।
দমকল বাহিনী সূত্রে জানা যায়, অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি ১৭ দফা সুপারিশ করে। সুপারিশগুলোর মধ্য রয়েছে, জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া জোরদার করা, ‘অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্যের মজুদ বা বিপণনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা, এসব বিক্রয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, ঘরবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক তারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, রাস্তায় স্থাপিত খোলা তারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা পরিহার করতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সরজমিনে গিয়ে পরীক্ষা করা, দ্রুত আগুন নিভানোর জন্য স্থানীয়ভাবে পৃথক পানির লাইনসহ হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা, দুর্ঘটনা মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে টাস্কফোর্স গঠন, রাসায়নিক ও রাসায়নিক জাতীয় দাহ্য বস্তুর আলাদা দফতরের পরিবর্তে সব দফতরের সমন্বয় সাধন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো, জনবল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের আধুনিকায়ন, জনসচেতনতা বাড়ানো অগ্নিকান্ডের সময় যেন উৎসুক জনতা উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সেজন্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো, পাঠ্যসূচিতে অগ্নিকাণ্ড উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা, ৬২ হাজার কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, কমিউনিটি সেন্টারগুলো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ডেকোরেটরের উপকরণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা ইত্যাদি।
আমাদের বিবেচনায় দমকল বাহিনীর উল্লিখিত সুপারিশগুলো সুচিন্তিত এবং প্রয়োগযোগ্য। তাই আমাদের প্রত্যাশা সরকার সুপারিশগুলো যথশীঘ্র সম্ভব বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবে।