অগ্নিঝরা স্বপ্নের কাছে

নাসের রহমান

সোমবার , ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

এখন আর মনটাকে কোথাও বসাতে পারে না। কোন কিছুই মনোযোগ দিয়ে করতে পারে না। বার বার চেষ্টা করে মনটাকে স্থির করার। কিন্তু কোথাও স্থির হতে চায় না। ভাবনাগুলোও আগের মত নেই। এলোমেলো ভাবনা একসময় আচ্ছন্ন করে রাখতো। কেমন যেন লাগতো নিজের কাছে। এক ধরনের ভাললাগা ঐসব ভাবনার মাঝে খুঁজে পেতো। তখন সময়টা বেশ কেটে যেতো। যদিওবা এসব ভাবনায় ফলাফল তেমন পাওয়া যেতো না। তারপর এর ভেতর নিমজ্জিত থাকতো। নিজের একটা জগত মনে করতো। এখন সে জগতটা আর নেই। তাই ভাবনাগুলো আর ওভাবে আসে না। মাঝে মধ্যে কখনো এলেও এসব ভাবনায় এখন আর স্বপ্ন খুঁজেপাওয়া যায় না। স্বপ্ন না থাকলে কোন ভাবনা আর পাখা মেলতে পারে না। পাখা ছাড়া কোন স্বপ্নই উড়তে পারে না।স্বপ্ন যদি পাখা মেলে উড়তে না পারে তাহলে সে স্বপ্নটা কখনো আনন্দ দিতে পারে না। আনন্দহীন স্বপ্ন বেশিক্ষণ টিকে থাকে না। তাই ভাবনাটা আর কখনো গভীরে যায় না। মনটাকে স্থির করতে না পারলেও সে নিজে কখনো অস্থির নয়। অনেকটা ধীর স্থির বলা চলে। তারপরও কেউ কেউ তাকে কোয়ান্টামের কথা বলেছে। সে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তবে একবার একটা উদ্বোধনী সেশনে অংশ নিয়েছে, খুবই ভাল লেগেছে। তাদের কথার ধরন ও যুক্তিগুলো তার কাছে গ্রহনযোগ্য বলে মনে হয়েছে। কিন্তু এসব কথার বেশিরভাগ তার জানা আছে। যদিওবা তারা অনেক সুন্দর করে উপস্থাপন করেছে। সে কারনে উপস্থিত সবাই মনোযোগ সহকারে শুনেছে। দুই বা তিন দিনের কোন কোর্সে সে অংশ গ্রহন করেনি। তার ধারনা এতে তার তেমন কোন পনিবর্তন হবে না। তার ভবনার বিষয় অনেকটা ভিন্ন, কিছুটা অন্য রকম। এসব বিষয়ের ওপর সাধারণের কোনা চিন্তা ভাবনা নেই। তার ভাবনাগুলো কোন সমস্যার সৃষ্টি করে না। শুধু তার মনকে আছন্ন করে রাখে। কখনো কখনো তাকে বিভোর করে তোলে। সে নিজেও এখান থেকে বের হতে চায় না। কিন্ত এখন সে আর ভাবনায় ডুবে থাকতে পারে না। কৈশোরের স্বপ্নগুলো তাকে এখনো তাড়া করে। শৈশব কৈশোরের স্বপ্ন রঙিন হলেও কখনো কখনো এসব স্বপ্ন আর রঙিন থাকে না। এক ধরনের মায়াজাল এসব রঙিন স্বপ্নকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। আবার কখনো ঘন কুয়াশার আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। ইচ্ছাগুলো মায়াজাল ছিন্ন করতে না পারলে এবং সূর্যের আলো কুয়াশার আবরণ ভেদ করতে না পারলে রঙিন স্বপ্নগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়। এক সময়ে কৈশোর আর থাকে না। স্বপ্নগুলো আর ফিরে আসে না। কিন্তু এসব স্বপ্ন এক ধরনের কষ্ট রেখে যায়। যে কষ্ট কাউকে বলা যায় না। এমনকি বর্ণনাও করা যায় না। এ কষ্ট কখনো কখনো অবচেতন মনে উকি দিয়ে যায়। আবেগ অনুভুতির জায়গাটাকেও ছুঁয়ে যেতে চায়। এখান থেকে আর বের হওয়া যায় না। নিজের সাথে সময়ের সাথে এগিয়ে চলে। এরকম একটা ধুসর স্বপ্নের কষ্ট তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কৈশোরের রঙিন স্বপ্নের ভেতর এ ধুসর স্বপ্নটি একসময়ে দুর্বিষহ স্বপ্নে রূপ নেয়। যখন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস চেখের ওপর রঙিন প্রজাপতির ডানা মেলে উড়ছে, চারিদিকে সবুজের সমারোহ তখন স্বপ্নের ডানায় লাল সবুজের পতাকা নতুন এক স্বপ্নের কাছে নিয়ে যায়। এ স্বপ্নটি এত বেশি মায়াময় এক বেশি উজ্জ্বল ছিল, সকল তরুন তরুনী এর উদ্দীপ্ত ছায়াতলে সমবেত হয়ে অভিন্ন স্বপ্নের ভেতর বিভোর হয়েছিল। অনেকে স্বপ্নটি কি তা বুঝার প্রয়োজন মনে করেনি। এ স্বপ্ন কোথায় নিয়ে যাবে তাও ভেবে দেখেনি। আবার অনেকের এসব বুঝার বয়সও হয়নি। কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ, তার এতসব বুঝার প্রয়োজন কি ? তারপরও এ অপূর্ব সুন্দর স্বপ্নটির অবিরাম আকর্ষন সবাইকে টেনে নিয়ে গিয়েছে। একই সূত্রে গেঁথে ফেলেছে। স্বপ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। রঙিন স্বপ্নগুলো দিনের পর দিন অগ্নিঝরা স্বপ্নের কাছাকাছি গিয়ে স্ফুলিঙ্গের মত বিকশিত হয়েছে।
স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা হতো ডিসেম্বরের শেষের দিকে। ফলাফল পেতে জানুয়ারি ও প্রায় শেষ হয়ে যেতো। ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন করে ক্লাস শুরু হতো। বই পুস্তক জোগাড় করতে আরো সময় লেগে যেতো। ক্লাসে দু’ চার জন নতুন বই কিনতে পারতো। অন্যরা পুরানো বই সংগ্রহ করে নিতো। তাই ক্লাস কয়েক ঘন্টা করে চললেও বই পত্র হাতে আসতে এ মাসটা চলে যেতো। কিন্তু মার্চ মাসে পুরোদমে ক্লাস শুরু হয়ে যেতো। এবার সেরকম করে শুরু হয়নি। জানুয়ারিতে পরীক্ষার রেজাল্ট হলেও ক্লাস শুরুটা আর হয়নি। স্কুলে ছাত্ররা এলেও বেশিরভাগ ছাত্র ক্লাসে না এসে মাঠে জড়ো হয়ে থাকছে। তাই শিক্ষকেরা আর ক্লাসে আসেনি। নতুন ক্লাসে উঠার পর ছাত্রদের লেখাপড়ার যে আগ্রহ তাও দেখা যায়নি। সবার ভেতর এমন একটি ভাবনা কোথায় যেন কি হয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু খবর আসতে থাকে যা শুধু ভাবনার নয়, আশঙ্কারও উদ্বেগ করে। উপরের ক্লাসের ছাত্ররা কখনো কখনো চিন্তিত হয়ে পড়ে। স্কুলের আগের ছাত্ররা যারা দুরের কলেজে চলে গিয়েছে তারাও মাঝে মধ্যে আসে। স্কুলের মাঠে ছাত্রদের সাথে কথা বলে কখনো কখনো বক্তৃতাও দেয়। টিসারদেও সাথে যেন পরামর্শ করে। দিন যত যায় ভাবনাটাও বাড়তে থাকে। অনেকটা তার চেয়েও বেশি বেড়ে যায়। ছাত্ররা মাঠে জড়ো হয়ে বসে না থেকে মিছিল বের করে। মিছিলে স্লোগান দেয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের স্লোগান,এগার দফার স্লোগান । এগার দফা কি কি, সবাই জানে না। ছোট ছোট কাল ব্যাজে এগার দফা মানতে হবে এরকম স্লোগান লিখে নিয়ে আসছে কলেজ ছাত্ররা। এ ব্যাজ গুলো পেয়ে স্কুলে ছাত্ররা এরকম ভাবনার ভেতর একধরনের অনুপ্রেরনা খুঁেজে পায়। এখন প্রতিদিন স্কুলে এলে আর ক্লাস হয় না। এদিক সেদিক থেকে খবর আসে, উড়ো খবর, নানা ধরনের খবর। ছাত্রারা সব এক হচ্ছে, আন্দোলনে নেমেছে। এগার দফা না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। শুধু শহরের স্কুল কলেজে নয় গ্রামের স্কুল কলেজেও এ আন্দোলনের ঢেঊ এসে পৌঁেছছে। কোন স্কুল কলেজে এখন আর ক্লাস হয় না, তারপরও ছাত্ররা স্কুলে যায়। মিটিং মিছিল স্লোগান আর বক্তৃতা শুনে বাড়ি ফিরে আসে। ফেব্রুয়ারি শেষ হতে না হতে পরিস্থিতি অন্যরকম হয়ে যায়। ছাত্ররাও আর ছাত্র থাকেনা। মিছিল স্কুল কলেজের আঙ্গিনা পেরিয়ে বাইরে চলে আসে। ছাত্ররা এবার বাস্তায় নেমে আসে, হাট বাজারে মাঠে ময়দানে মানুষ জড়ো হতে থাকে। এতদিন মানুষ শহরের বড় বাস্তায় মিটিং মিছিল করেছে, এখন গ্রামে তারা তা ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে একদিন দু’ দিন করে সারা দেশ অশান্ত হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও থেকে গোলাগুলির খবর আসে। পুলিশের গুলিতে অনেকের মৃত্যু হয়েছে এরকম সংবাদ দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে যায়। চরিদিকে উত্তাল হয়ে উঠে। এভাবে একদিন দু’দিন তিন দিন উত্তাল তরঙ্গ মালাকে যেন আর থামানো যায় না। লাঠি, গুলি, টিয়ার গ্যাস, কোন কিছু আর থামাতে পারে না।বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে দ্বিধা করে না। অগ্নিঝরা মার্চের ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। সমগ্র জাতি নতুন এক স্বপ্ন দেখলো। মুক্তির স্বপ্ন, স্বাধীনতার স্বপ্ন। শুধু স্বপ্ন নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নের দিক নির্দেশনাও । যা দেশের সকল মানুষকে নতুন করে তারুণ্যে উদ্দীপ্ত করলো। সকল প্রকার বিভেদ ভুলে গিয়ে মুক্তিযুদ্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলো। গ্রামে গ্রামে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। রাস্তা-ঘাট, হাট- বাজার মিটিং মিছিলে প্রতিবাদী হয়ে উঠলো। এদেরকে আর কে রাখতে পারে, বঙ্গবন্ধুর অমোগ বাণী ৭ই মার্চের বজ্র কন্ঠ গ্রামে গঞ্জে মাঠে প্রান্তরে বাতাসের সাথে মিশে গেল। প্রতিটি বাঙালীর ভেতর এক অসীম সাহসিকতার বীজ বপন করা হলো। তারা সংগ্রামী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। শহর বন্দর নগর গ্রাম পাড়া মহল্লা সর্বত্র প্রতিরোধের দেওয়াল গড়ে উঠলো।
হঠাৎ মিটিং মিছিল স্লোগান থেমে গেল। চারদিকে যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মানুষ দলে দলে শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ছুটে এলো। খবর হলো শহরের রাস্তায় রাস্তায় মানুষের লাশ পড়ে আছে। শহরের মানুষেরা গ্রামে আশ্রয় নিলো। কিন্তু কিছুদিন পর গ্রামও আর নিরাপদ রইল না। হানাদারের দাবানল শহর বন্দরকে পদদলিত করে গ্রামকে ছিন্ন ভিন্ন করতে শুধু করলো। গ্রামের বাড়িতে যারা আশ্রয় নিয়েছে তারা এখন কোথায় যাবে ঠিকানা খুঁজে পেল না। তারপরও এ বাড়ি থেকে সে বাড়িতে, এ গ্রামে থেকে আরেক গ্রামে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিতে চেষ্টা করলো। কিন্তু এ সময় কাকে কে ঠাঁই দেবে। নিজের থাকার জায়গাটা ঠিক নেই। তবুও দূরবর্তী গ্রামে যেখানে হানাদারেরা সহজে যেতে পারবেনা সেখানে চলে যেতে শুরু করলো। একদিন খবর এলো বাড়িতে তল্লাশী চালাবে। ইপিআর এর একটি গ্রুপ বর্ডারের দিকে যাওয়ার পথে বাড়িতে উঠেছিল। পড়ার লোকেরা সবাই মিলে এদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এরা একরাত একদিন লম্বা কাচারী ঘরে অবস্থান করে রওনা দিয়েছিল। এ খবর হানাদারের কাছে পৌঁছেছে। রাজাকারেরা আগের দিন এসে পুরা বাড়ির চারপাশে রেকিং করে গিয়েছ্‌ে। বাড়িতে উঠতি বয়সের ছেলে মেয়েরা কেউ নেই। সবাই অন্যত্র সরে গিয়েছে। বিশেষ করে দুরের আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। ভাই বোনকে নিয়ে হালদা খাল পার হয়ে পাশের গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠে। হালদায় তখন হাঁটুর উপরে পানি । এরা কয়েকজন বাড়ি থেকে বের হয়ে মেঠো পথ ধরে হেঁটে হেঁটে একের পর এক দু’টি বিল পার হয়ে হালদার কাছে এসে পৌঁছে । এ দু’টি বিল তারা আগেও পার হয়েছে। হালদার কাছে অনেক বার এসেছে। কিন্তু আজ মনের ভেতর কোথায় যেন ভয় ভয় লাগছে। পেছন থেকে কেউ যেন তাদের অনুসরণ করছে এরকম মনে হচ্ছে। রাতের অন্ধকারে বিল দু’টি একেবারে ডুবে থাকে। কেউ কেউ ভুতের ভয়ের আশস্কা করে, বিলের মাঝে রাতে একা পেয়ে ভুতের খপ্পরে পড়ার গল্পও চালু আছে। তবে জোৎস্না রাতে বিলটি আবার অন্যরকম হয়ে যায়। চাঁদের আলোতে পুরা বিলটি যেন চোখের উপর ভাসতে থাকে। এমনকি হালদার তীর ঘেষে কাশফুলের বাগানও বিলের সাথে একাকার হয়ে যায়। এখন এরকম কিছু মনে হচ্ছে না। বিল দু’টি পার হতে অনেক সময় লেগে যায়। যত দ্রুত পা ফেলে এগুতে চায় ততই যেন পেছন থেকে একধরনে বাধা আসছে। কয়েকজন একসাথে যাচ্ছে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে । খাল পার হতেও অসুবিধা হয়নি। হাঁটু জল মৃদু শ্রোতধারা, তবে আগে পার হতে এক ধরনের আনন্দ অনুভব হতো। এখন সেরকম কিছু যেন নেই। বরং এক ধরনের অজানা অচেনা ভয়ের মত কিছু ্‌একটা যেন তাদের পিছু নিয়েছে। এরা একজনের দিকে আরেকজন তাকায়, কেউ কাউকে কিছু বলে না। তাদের চোখে মুখে ভয়ের কোন চিহ্ন না থাকলেও আনন্দের কোন রেখা নেই। খাল পাড় হয়ে আরো পথ পাড়ি দিতে হবে, এ পথ মেঠো পথ নয়। মাটির রাস্তা পথে স্কুল, হাঁট, বাজার- পুরানো দু’একটা ব্রিজ পার হয়ে যেতে হয়। কিছুদূর গিয়ে এরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, পুরানো একটি পুকুরের ঘাটে গিয়ে বসে। চোখে মুখে পানি দিয়ে ক্লান্তি কিছুটা তাড়াতে চায়। পুকুরটির পাশে জীর্ণ একটি পাকা বাড়ি, এখন অনেকটা বিধ্বস্ত, একজন নামকরা হিন্দু ডাক্তারের বাড়ি। তারা কেউ নেই। অনেক আগেই চলে গিয়েছে, অনেকটা পরিত্যক্ত। কোন সাড়া শব্দ নেই। সবকিছু সুনশান নীরবতার মাঝে ডুবে আছে। বাড়িতে মানুষ ছাড়া যেন অন্য প্রাণীও নেই। পাখিদের আনা গোনাও দেখা যাচ্ছে না। তবে গাছের ডালে পাতার আড়ালে পাখিরা থির হয়ে বসে আছে। বাতাসে পাতা নড়লে পাখিদের ছায়া পুকুর জলে ভেসে উঠে। কিছুক্ষণ বসার পর তাদের ক্লান্তি কেটে যায়। তারা আবার হাঁটতে শুরু করে।
যে বাড়িটিতে উঠেছে সেটা অনেকটা টিলার মাঝে। আশে পাশের ছোট বড় কয়েকটি টিলা। তবে ঝোপ ঝাড় তেমন নেই। গাছ গাছালি টিলা গুলোকে আলাদা করে রেখেছে। পুকুরটির পাড়ে এমনভাবে গাছ লাগিয়েছে বাড়িটা দূর থেকে আর চোখে পড়ে না। গাছগুলোর ছায়া শুধু পুকুরের পানি নয় বড়িটাকেও সবসময় ছায়াশীতল রাখে। গরমের দিনে আরাম দায়ক হলেও শীতের সময় রোদের অভাব বোধ করে। পাতার ফাঁকে রোদ এসে পড়তে পারে না। পুকুরের পানি কখনো কখনো হীম শীতল হয়ে যায়। পুকুরে নেমে গোসল করা যায় না। এখন অবশ্য শীত নেই। গরমও সেভাবে শুরু হয়নি। কয়েকটি দিন তাদের ভালভাবে কেটে গেল। পুকুর পাড়ে এ টিলা থেকে আরেক টিলায় ঘুরে ঘুরে সময় কাটালো। খাওয়া দাওয়া ভালো। পুকুরের মাছ ক্ষেতের তরি তরকারি খেতে ভাল লাগলো। এ বাড়িতে লোকজন তেমন নেই। গৃহস্তের একটি ছেলে একটি মেয়ে। মেয়েটি বড় গৃহস্থালি কাজ করে। ছেলেটি দূরের একটি স্কুলে যায়। এখন স্কুল বন্ধ, সে বাড়িতে নতুন মেহমান পেয়ে খুব আনন্দে আছে। এদের পেছনে পেছনে ঘুরে। এটা সেটা দেখাতে চেষ্টা করে। গাছ থেকে পেয়ারা বড়ই পেড়ে এদের খাওয়াতে আনন্দ পায়। মেয়েটাও কম না, রান্না বান্না থেকে শুরু করে ঘরের সব কাজে মাকে সাহায্য করে। দেখতেও সুন্দর, বাড়ন্ত গড়ন। তাদের ঘরে আগে কোনদিন এত মেহমান একসাথে আসেনি। বিছানা পাটিও এত নেই। তারপরও মেহমানদের পেয়ে এরা অনেক খুশী। ওদের খাওয়াতে পেরে এরা আনন্দ পাচ্ছে। বিপদে পড়ে ওরা এখানে এসেছে। দূর সম্পর্কের অনেক পুরানো আত্মীয়তার পরিচয় ধরে এসেছে। বিয়ে শাদী বড় কিছু হলে দাওয়াত দিতো, এমনিতে তেমন যোগাযোগ ছিলনা। কিন্তু চার জন কিশোর কিশোরীকে কয়দিন এরা রাখতে পারবে? খাওয়া দাওয়ার যোগান দিবে ? এসব নিয়ে এদের কোন চিন্তা ভাবনা নেই। ঘরে ধান চালের কমতি নেই, আলু তরিতরকারি আছে, পুকুরে মাছ আছে। তাহলে খাওয়ার চিন্তা কেন করবে ? এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর গৃহস্থ একদিন হাঁটে গিয়ে জানতে পারে এদিকে মিলিটারি আসবে। একথা শুনে তার ভেতরে এক ধরনের ভয় এসে যায়। কিছুটা চিন্তায়ও পড়ে, শান্তি কমিটির লোকেরা গ্রামের লোকজনের হিসাব নিচ্ছে। কার বাড়িতে কয়জন আসে, বাইরের কেঊ আছে কিনা, এসব নাকি তালাশ করছে। দূরের গঞ্জে বাজারে মুক্তির ছেলোরা নাকি বোমা ফাটাইছে। মিলিটারী ঐ বাজার জালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে। উঠতি বয়সের ছেলে পুলে সব ধরে নিয়ে গেছে। এখন তার ঘরে বাইরের চারজন ছেলে মেয়ে আছে জানলে কি বিপদ এসে পড়ে। সে ভাবনায় পড়ে যায়। এদের কাথাটা কিভাবে জানাবে। আর এরা কোথায় যাবে? এ এলাকায় মিলিটারী আসবে এ খবরটা তাড়াতাড়ি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তারাও ভাবনায় পড়ে যায়, ভয়ও করতে থাকে। বাড়িতে মিলিটারি আসার কথা শুনে চিন্তায় পড়ে গেল। কয়েকদিন পর তাদের চিন্তার মোড় ঘুরে গেল। দুই কিশোর বিকেলে হাঁটতে গিয়ে টিলার তলিতে সাত আট জনকে গোল হয়ে বসে থাকতে দেখলো। ধীর পায়ে তাদের দিকে হেঁটে গেল। এখানে সাধারণত এরকম কাউকে দেখা যায়না। কাছে গিয়ে দেখলো এদের মাঝে কয়েকজন তরুন কি যেন বলছে। এ দু’জনকে কাছে ডেকে পরিচয় নিলো। এদেরকে মুক্তিতে যোগ দিবে কিনা জানতে চাইলো। ওদের কয়েকজনের হাতে ছোট ছোট অস্ত্র গোলা বারুদ। কিশোর দ’জন প্রথমে থতমত খেয়ে গেল, কি জওয়াব দেবে ভাবতে পারল না। ওরা আরো বুঝাতে চেষ্টা করলো, মুক্তি কি? মুক্তিতে যোগ দিতে বলছে। ছেলে দু’টি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কিছুক্ষণ পর ওরা এখান থেকে চলে গেল। ওদের কথা শুনে দুই কিশোর আর স্থির থাকতে পারলো না। এরাও ওদের অনুসরণ করতে লাগলো। পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করলো। কখন যে এ গাঁ পার হয়ে ভিন্ন গাঁয়ে চলে এলো বুঝতে পারলো না। তবুও এদের পেছন ছাড়লো না। এ গাঁ সে গাঁ থেকে আরো তরুণেরা যোগ দিতে লাগলো।
কয়েক দিন পরে মেয়ে দু’টিকে গৃহস্থ ওদের বাড়িতে পৌছেঁ দিয়ে আসে। এখানেও নিরাপদ নয়। রাজাকারদের আনা গোনা বেড়ে গেছে। হানাদারেরা ক্যাম্প করেছে থানার পাশে। সকালে বিকালে এদিক ওদিক টহল দিয়ে যায়। এবার মেয়ে দু’টিকে গ্রাম থেকে বেশ দূরে আরেকটি আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। সেদিকে তেমন রাস্তা নেই। মেঠো পথ ধরে বিলের পাশ দিয়ে যেতে হয়। ভাইদের চিন্তায় মেয়ে দু’টি অস্থির । কিন্তু তাদেরকেও হায়েনার ভয়ে এ গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিতে হচ্ছে। কৈশোর উত্তীর্ণ এ মেয়ে দ’ুটির বুঝার বয়সই বা কি? মুরুব্বীরা যে দিকে বলতেছে তারাও সেদিকে ছুটে চলছে। কার খবর কে দিবে, বেশি খবর নিতে চাইলে রাজাকারেরা খবর পেয়ে যাবে। তখন এ বড়িতেও আর থাকা যাবেনা। তবে এটুকু বুঝতে পারে পাড়া গাঁয়ে বাড়ন্ত ছেলে মেয়ে নেই। মেয়েরা না হয় দূর দূরান্তের আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু ছেলেরা কোথায় লুকিয়ে রইলো। না এরা লুকিয়ে যায়নি, এরা গোপনে মুক্তিতে যোগ দিয়েছে। এদের সাথে তরুনেরা, কিশোরেরাও আছে। এরা ট্রেনিং নিচ্ছে, অস্ত্রের ট্রেনিং, ট্রেনিং নিয়ে ফিরে আসবে।একদিন হানাদার মুক্ত করবে। মেয়ে দু’টি এতটুকু ভাল করে বুঝতে পারে। তাই সব কিছু মুখ বুজে চুপ করে আছে। তবে খুব ইচ্ছা হয় এদের সাথে মুক্তিতে যোগ দিতে। কিন্তু কেউ কখনো তাদের ডাকেনি। এদের ঠিকানাও জানা নেই। কোথায় গেলে এদের খোঁজ পাওয়া যায়। এরকম এলোমেলো ভাবনা তাদেরকে মাঝে মধ্যে আছন্ন করে। একবার ট্রেনিং নিতে পারলে রাজাকারের বাচ্চা আর হায়েনাদের দেখিয়ে দিতো। গুলি মেরে মাথার খুলি উড়িয়ে দিতো। তবে একটি খবর তাদেরকে একেবারে মাটিতে পুতে পেলে। তারা য়েন আর দাড়িঁয়ে থাকতে পারেনা। টিলায় যে বড়িতে তার প্রথম আশ্রয় পেয়েছিল সে বাড়িতে হায়েনারা হানা দিয়েছে । মেয়েটিকে ধরে নিয়ে গেছে। মা চিৎকার করে বাধা দিলে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দিয়েছে। বাবা মাঠে কাজ করতে গিয়েছে। ছেলেটি গরু নিয়ে ফিরে এসে দেখে বোনকে নিয়ে যাচ্ছে। সে আর স্থির থাকতে পারেনি। হাতে তার দোলাইল থাকতো, এটা দিয়ে সে পাখি শিকার করতো। রাস্তার পাশে গাছের আড়াঁলে দাঁড়িয়ে দোলাইল টেনে একটা গুলি ছোড়ে। যে হায়েনা তার বোনকে হাত ধরে রেখেছে তার চোখে গিয়ে পড়লো। সাথে সাথে তার চোখ থেকে রক্ত ঝরে পড়তে শুরু করলো। দ্রুত তারা আশেপাশে দেখতে লাগলো। রাজাকার একজন গাছের আঁড়ালে তাকে দেখতে পেয়ে দৌঁড়ে ছুটে এলো। সে আরো জোরে দৌঁড়াতে লাগলো । বিলের মাঝ পথ ধরে প্রাণপণে দৌঁড়াতে লাগলো। তখনই পেছন থেকে রাইফেলের গুলি তাকে স্তব্ধ করে দিলো। সে জমিনে লুটিয়ে পড়লো । বোনটি জ্ঞান হারিয়ে তখন রাস্তায় পড়ে গেল। তারপরও এরা মেয়েটিকে ছাড়লো না। টেনে হেচড়ে নিয়ে চললো। এসব দৃশ্য দেখার কোন লোকজন নেই। সবাই আগে পালিয়ে গিয়েছে। বাড়ি ঘর ছেড়ে অনেকে প্রান নিয়ে পালিয়ে বেচেঁছে। কিন্তু এ কিশোর বালকটি বাচঁতে পারলো না। মেয়েটিও তাদের লালসার বিভৎস শিকারে পরিণত হলো। মানুষেরা প্রাণে ভয়ে পালিয়ে গেলেও পশু পাখিরা পালাতে পারেনি। গুলির আওয়াজ বেশি হলে হয়তো এসবও পালিয়ে যেতো। কিশোর বালককে মারতে একটি গুলিই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এখানে পর পর কয়েকটি বুলেট তার পিঠে বিদ্ধ হয়ে ভেতরটা ছিন্ন ভিন্ন করে বুক দিয়ে বের হয়ে যায়। রক্তে লাল হয়ে যায় মাটি। যে মাটিতে সে তার বাবার সাথে চাষ দিয়ে ফসল ফলাতো। এ মাটি তার রক্তে উর্বর হয়ে উঠলো। এখান থেকে হাজারও কিশোর লক্ষ তরুণ বুলেট হাতে দাঁড়িয়ে গেল। এদের আর কেউ রুখতে পারলো না। এরাই হানাদার মুক্ত করলো। এদের রক্তেই লাল সবুজের পতাকা আকাশে উড়তে লাগলো।

x