অগ্নিঝরা মার্চ : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ

আলহাজ্ব মোঃ গোলাম নবী

মঙ্গলবার , ২৬ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ
239


৭ই মার্চ ১৯৭১ সাল জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকন্ঠে তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশ, মাটি আর মানুষের টানে সেদিন ঘরে বসে থাকতে পারি নি। মা-বাবার নিষেধ থাকা সত্বেও জোর করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই দেশের ভালবাসার টানে। আমি, আমার বড় ভাই আবু ইউসুফ, জেঠাতো ভাই সিরাজুল ইসলাম ও ইসমাইল, আব্দুর রাজ্জাক। বাড়ি হতে বের হয়ে গেলাম। ময়নামতি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া সিএমবি রোড কুমিল্লা ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া রেল লাইন অতি সতর্কতার সাথে অতিক্রম করি। কারণ পাকিস্তানির বাহিনীর পেট্রোল ডিউটি ছিল।
সারা রাত এবং পরের দিন পায়ে হেটে বস্কর নগর শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছি। শরাণার্থী ক্যাম্পে রাত্রি যাপন করার পরের দিন ১৫ই জুন ১৯৭১ সালে উদয়পুর হয়ে আগরতলা দিয়া বাসযোগে পালাটানা ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছি। সেখানে প্রথমে আমাদের সাক্ষাৎগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন সুজত আলী পরিচালিত ট্রেনিং সেন্টার পালাটানা হান্টার কোম্পানির ১ম বেইসে ট্রেনিংয়ের জন্য নিযু্‌ক্ত করেন। কোম্পানি কমান্ডার হাবিলদার মেজর আলী আহমদ এবং ভারতীয় যৌথ বাহিনির কমান্ডে ২৮ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করি। প্রশিক্ষণ শেষে ২নং সেক্টর আঞ্চলিক অধিনায়ক মেজর হায়দার সেক্টর কমান্ডার দিদারুল আলম ও কোম্পানীর কমান্ডার হাবিলদার মেজর আলী আহমদ প্লাটুন কমান্ডার আবু তাহেরের নেতৃত্বে ২৫ জনের সহযোদ্ধা মনতলী অপারেশন ক্যাম্পে কয়েকদিন অবস্থানের পর অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে আমাদের কে পাঠানো হয়, দেশের অভ্যন্তরে আমরা বিভিন্ন গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। দেবিদ্ধারের লাল মিঞা, শহিদুল ইসলাম, সামাদ মোল্লা, নুরুল ইসলাম, বারুর গ্রাম, শাহজাহান ভূইয়া গুনাইঘর আমার নিজ গ্রামের সহ দেবিদ্ধার নিউ মার্কেট চত্বরে ৪৮ জন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার নাম স্মরণীতে লেখা আছে।
১৯৭১ সালের ২৬ই মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মাত্র ৫দিন পর ৩১ই মার্চ আধুনিক অস্ত্র সু-সজ্জিত ১৫ সদস্যের পাক সেনাদলের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। যখন মুক্তিযোদ্ধা নামক সংগঠনটি জন্ম হয় নি দেশের রাজাকার আলবদর, আল শামস, শান্তি কমিটি, পিচ কমিটি, কোনটির সৃষ্টি হয়নি, এমনকি প্রবাসী সরকারও গঠন হয় নি। বিজয় ছিনিয়ে আনতে দেবীদ্ধার থানার অস্ত্রাগার লুন্ঠনে আমিসহ ছোট আলমপুর গ্রামের আবু তাহের সহ আমরা ২৫-৩০ জনের একটি দল ওসি কে ঘেরাও করি। তৎকালীন ওসি এস.এম. রকিবুল হক চৌধুরী থানার অস্ত্রাগারের তালা খুলে দেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা অস্ত্রাগারে অস্ত্র ছিনিয়ে দেয়। পরবর্তীতে পাক সেনাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে ওসি এস.এম. রকিবুল হক চৌধুরীর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ঘটনার এক সপ্তাহের মধ্যে অর্থ্যাৎ ৭ই এপ্রিল ১৯৭১ সালে থানায় কর্মরত অবস্থায় মারা যান। আমরা স্থানীয়রা আবু তাহেরের বাড়ির পাশে তাহার দাফন কাজ সম্পাদন করি। তার নাম ফলকে লেখা আছে বীর মুক্তিযোদ্ধা এস.এম. রকিবুল হক চৌধুরী অফিসার ইনচার্জ দেবীদ্ধার থানা বাংলাদেশ পুলিশ। জন্ম ২৮ই মার্চ ১৯২৬ইং মৃত্যু ৭ই এপ্রিল ১৯৭১। যদিও তাহার আদিবাস সিলেট জেলায় ছিল।
ঐ লুন্ঠিত হাতিয়ারের পাশাপাশি বঙ্গজ হাতিয়ার যেমন দা, খন্তা, চল, টেটা, লাঠি, বল্লম দিয়ে পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করি। বানিয়া পাড়ার ফুল তলায় ইদন মিঞা সরকার শহীদ হন। বারেরা কোরের পাড় এলাকায় পাক হানাদের গুলিতে ছৈয়দ আলী শাহদাত বরেণ করেন। এই স্থানে গুলি ও লাঠির পিঠায় এক পাক সেনা নিহত হয়। বারেরা গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার খালেক সরকার, দেলোয়ার হোসেন সরকার, শামশুল হক সহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়। এলাহাবাদ গ্রামের ন্যাপ নেতা মুস্তাকুর রহমান, ফুল মিয়া, দুই পাকসেনাকে গুলি করে হত্যা করেন। লক্ষীপুরে জনতার ইট পাটকেল নিক্ষেপ ও গুলিতে এবং লাঠির আগাতে আরো ২জন পাক সেনা নিহত হয়। আলফুমিয়া ফকিরসহ আরো ২জন গুলিবিব্ধ হয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়। বেগমাবাদ গ্রামের ওসমান আলী এক পাকসেনাকে লক্ষ্য করে কুচের আগাতে নাড়ি ভুরি বের করে হত্যা করে। ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া হতে আসা ১৫জনের পাকসেনা দলের একজন ব্রাক্ষ্মণপাড়া, ২জন চরবাকর, ২জন লক্ষীপুর, ২জন বেগমাবাদ, ১জন কালিকাপুর সর্বমোট ৮ জন নিহত হওয়ার পর বাকি ৭জন জাফরগঞ্জ শ্রীপুকুর পাড় জামে মসজিদে আশ্রয় নেয়।
জনতা, কাথা, লেপ তুষকের পেট্রোল ও মরিচের গুড়াসহ আগুন পুটো দিয়ে মসজিদের ভিতের প্রবেশ করিয়া দিলে। ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, অবরুদ্ধ পাক সেনারা উপায়ন্তর না বুঝে বস্ত্র খুলে হাত উচু করে আত্মসমর্পণ করেন।
বিক্ষুব্ধ জনতা আত্মসমর্পণ কারীদের হত্যা করে মুনা রেশি প্রকাশ ঋষি লাশগুলোকে টুকরো টুকরো করে বস্তা ভরে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এই জনযুদ্ধটি এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক প্রকাশিত ৬ষ্ঠ খন্ডের ৪০৩ পৃষ্ঠায় দেবীদ্ধার উপজেলার ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যে ভিংলাবাড়ি, জাফরগঞ্জ, শ্রীপুকুর পাড়, জামে মসজিদ যুদ্ধ সম্পর্কে ১৯৭১ সালের ৩১শে মার্চ কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কে পাকবাহিনীদের সাথে বাঙালির এক সংঘর্ষ হয় এতে ৩৩জন বাঙালি শহিদ এই মর্মে উল্লেখ আছে।
এই জনযুদ্ধের পরবর্তীতে জাফরগঞ্জ গ্রামে পাকবাহিনীর সহায়তায় রাজাকার কমান্ডার হিসাবে আফসু রাজাকার বাহিনি গঠন করে। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আমিও যুদ্ধকালীন প্লাটুন কমান্ডার আবু তাহের সিরাজুল ইসলাম সহযোদ্ধাদের আক্রমনে জাফরগঞ্জ গ্রামের রাজাকার কমান্ডার আফসু রাজাকারসহ তাহার বাহিনীকে গুলি করে হত্যা করি।
কয়েকটি যুদ্ধ ও পাক হানাদারদের নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ :
১। ১৯৭১ সালের ১৪ই এপ্রিল আমার নিজ গ্রাম গুনাইগরে ১০ জন পাকসেনা ও নাগাইশ গ্রামের আলী আহমদ রাজাকারের সহযোগিতায় গ্রামে ঢুকে পিতা মৃত. পান্ডব চন্দ্রদের পুত্র মন মোহন দে কে আম গাছের সাথে রশি দিয়ে বেধে গুলি দিয়ে হত্যা করে। গ্রামের অধিকাংশ হিন্দু বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়, লুটপাত করে। জালিয়ে দেওয়া ঘর বাড়ি গুলো হল সুরেশ ডাক্তার, নন্দী, নাহার, দত্তের, দিরেরা বাড়ি উল্লেখযোগ্য।
২। ১৯৭১ সালের ২৪শে জুলাই দেবীদ্ধারে ডাকবিভাগ সংলগ্ন শহীদদের গণকবর। দেবীদ্ধারের রামচন্দ্রপুর ও বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৯ জনকে ধরে এনে তাদেরকে দিয়ে গণকবর খনন করে লাইন ধরে দাড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে গণকবরে মাঠি চাপা দেয়।
৩। ১৯৭১ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বারুর গ্রামে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে সাত বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। পুনেরা গ্রামের পাক সেনাদের সাথে সম্মুখ সমরে নৌ-কমান্ডো গ্রুপের উপর হামলা ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হয়।
৪। ১৯৭১ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর মহেশপুর গ্রামে পাক সেনাদের বিভিন্ন বিভীষিকাময় হত্যাযজ্ঞের শহিদ ১৪ জন নিরীহ বাঙালি।
৫। ১৯৭১ সালের ২৯ই সেপ্টেম্বর ধামতি, ভূষণা, মাসিকারা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ঘাঁটি চিহ্নিত করে ২ প্লাটুন পাক সেনা গাড়ি বহর নিয়ে হামলা চালিয়ে ৮ গ্রামবাসিকে হত্যা সহ শতাধিক গাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় ও লুঠপাট করে।
৬। মুক্তিবাহিনী কর্তৃক কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কোম্পানীগঞ্জ গোমতী নদীর উপর সেতু উচ্চ ক্ষমতা সমপন্ন এক্সক্লোসিভ বিস্ফোরণে ওড়িয়ে দেওয়া হয়। মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনের জেনারেল আর.ডি. হিরার নেতৃত্বে বৃহত্তর কুমিল্লা এ অভিযান পরিচালিত হয়। মিত্র বাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুরিচং ব্রাক্ষ্মণপাড়া দিয়ে দেবীদ্ধার উপজেলায় আসে। মিত্রবাহিনির ট্যাঙ্কবহরটি দেবীদ্ধার থেকে চান্দিনা রোডে ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার সময় মোহনপুর এলাকায় ভুল বুঝাবুঝির কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গুলি বিনিময়ে মিত্রবাহিনীর ৬জন সেনা সদস্য নিহত হয়। ১৯৭১ সালের ৪ই ডিসেম্বর দেবীদ্ধার হানাদার মু্‌ক্ত হয়। ১৯৭২ সালের ৩১ই জানুয়ারি ময়নামতির সেনানিবাসে মিলিসিয়া ক্যাম্পে মেজর হায়দার ও হাবিলদার মেজর আলী আহমদ, প্লাটুন কমান্ডার আবু তাহেরের নেতৃত্বে আমার এস.এল.আর অস্ত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়ে সার্টিফিকেট গ্রহণ করে থাকি। লেখক : মুক্তিযোদ্ধা

x