শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব

প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী

শনিবার , ২১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:২৫ পূর্বাহ্ণ
39

শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে তিনটি বিষয়ের উপর জোর দেয়া হয়েছে

. শিশুর জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং শিশুকে শাল দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করা।

. শিশুর বয়স ৬ মাস (১৮০ দিন) বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো।

. শিশুর বয়স ৬ মাসের পর থেকে ঘরের তৈরি বাড়তি খাবার খাওয়ানোর পাশাপাশি শিশুকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানো।

শিশুর বয়স পূর্ণ ৬ মাস হওয়া পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো এবং ২ বছর বয়স পর্যন্ত ঘরের তৈরি বাড়তি খাবারের পাশাপাশি মায়ের দুধ খাওয়ানোর উপকারিতা:

শিশুদের বুদ্ধিমান ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য মায়ের দুধের কোন বিকল্প নেই। চরম দারিদ্র্র্য অথবা চরম প্রাচুর্য যে অবস্থায়ই শিশু পালিত হোক না কেন, মায়ের দুধ খেলে শিশু সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে ও বিভিন্ন রকম অসুখের হাত থেকে রক্ষা পাবে।

() মায়ের দুধ এবটি পরিপূর্ণ খাবার

 ছয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত শিশুর পুষ্টির জন্য যা প্রয়োজন তার সব উপাদানই শুধুমাত্র মায়ের দুধে সঠিক পরিমাণে আছে।

 শিশু খুব তাড়াতাড়ি ও সহজেই মায়ের দুধ হজম করতে পারে।

 মায়ের দুধ শিশুকে বিভিন্ন রোগ জীবাণু থেকে রক্ষা করে।

 মায়ের দুধ খেলে শিশুর সর্বোচ্চ শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি হয়।

 মায়ের দুধ সময়ের সাথে সাথে এবং খাবারের পরিমাণের সাথে সাথে শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তাই শিশুকে যে কোন খাবার এমন কি পানি দিলেও মায়ের দুধের উপকারিতা কমে যায় এবং শিশুর অপুষ্টি এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 মায়ের দুধে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে যে কারণে গরমকালেও শিশুকে আলাগদাভাবে পানি দিতে হয় না।

মায়ের দুধে লাইপেজ নামক এক ধরনের এনজাইম থাকে যা চর্বি হজম করতে সাহায্য করে

 মায়ের দুধ খেলে পরবর্তী জীবনে শিশুর ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, কানের প্রদাহ এবং দাঁতের সমস্যা কম হয়।

() বন্ধন

 মায়ের দুধ খাওয়ালে শিশু ও মায়ের মধ্যে একটা ভালবাসার বন্ধন গড়ে ওঠে।

 মায়ের সঙ্গে এই সুন্দর সম্পর্ক শিশুকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। এর ফলে শিশু বড় হয়ে অন্যদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়তে শেখে।

() মায়ের স্বাস্থ্য

 জন্মের পর পর শিশুকে মায়ের দুধ দিলে মায়ের রক্তক্ষরণ কম হয়। যা পরবর্তীতে মাকে রক্তস্বল্পতা হওয়া থেকে রক্ষা করে।

 মায়ের দুধ খাওয়ালে মায়ের শারীরিক গড়ন আগের অবস্থায় দ্রুত ফিরে আসতে সাহায্য করে ।

 শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ালে পরবর্তীতে মায়ের খুব দ্রুত গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

 স্তন ও জরায়ু ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।

() মায়ের দুধের মনস্তাত্ত্বিক উপকারিতা

 মায়ের দুধ খাওয়ালে শিশু ও মায়ের মধ্যে একটি গভীর ভালবাসার বন্ধন তৈরি হয় যা মাকে অনেক তৃপ্ত রাখে।

 শিশুরা যদি মায়ের দুধ খায় তবে তারা কম কান্নাকাটি করে এবং মানসিকভাবে পরিতৃপ্ত থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মায়ের দুধ খাওয়ানো শিশু বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন গুঁড়া দুধ খাওয়া শিশুদের চেয়ে ১০ গুণ ভাল হয়।

() মায়ের দুধ খাওয়ানোর অন্যান্য সুবিধা

হ মা যে কোন সমায় শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে পারে। এজন্য মাকে কোন বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হয় না।

হ কিছুদিন শিশুকে মায়ের দুধ দিতে না পারলে অনেক মা মনে করেন মায়ের দুধ খারাপ হয়ে গেছে। মায়েদের বুঝিয়ে বলতে হবে যে মায়ের দুধ কখনও নষ্ট হয় না।

 মায়ের দুধ কিনতে হয় না ফলে এটি অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী।

 মায়ের দুধ তৈরীর জন্য বাইরের কোন পাত্র, পানি বা সরঞ্জামাদি ইত্যাদি কিছুই প্রয়োজন হয় না বলে জীবাণু সংক্রমণ হওয়ার কোন সুযোগ নেই।

মায়ের দুধে কোন রোগজীবাণু নেই বলে এ দুধ খেলে শিশুর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি খুব কম থাকে। এতে আছে রোগ প্রতিরোধক বহু উপাদান যা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে। এ উপাদানগুলোর মধ্যে আছে:

 জীবাণু ধ্বংসকারী জীবিত শ্বেতকণিকা (লিউকোসাইটস)

 রোগ প্রতিরোধক ইমিউনোগ্লোবিউলিন বা এন্টিবডি যা শিশুকে নানা রকম রোগ থেকে রক্ষা করে।

 ‘বাইফিডাস ফ্যাক্টর’ যা শিশুর পাকস্থলীতে ‘ল্যাক্টোবেসিলাস’ কে বাড়াতে সাহায্য করে। ‘ল্যাক্টোবেসিলাস’ অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণুকে ধ্বংস করে শিশুকে ডায়রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করে।

হ ‘ল্যাক্টোবেসিলাস’ এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল এটি পাকস্থলীতে লৌহ বেঁধে রাখতে পারে। ফলে যে সব জীবাণু লৌহ ছাড়া বাঁচাতে পারে না সেগুলো ধ্বংস হয়ে যায় ও শিশু রোগমুক্ত থাকে।

 শিশু মায়ের দুধ খেলে পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া, শ্বাসনালীর অসুখ এমন কি কান পাকার হারও অনেক কমে যায়।

 যে কোন অসুখের সময় শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে, এতে করে শিশু তুলনামুলকভাবে অনেক দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।

পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া হলে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো বন্ধ না করে আরো বার বার খাওয়াতে হবে। এতে করে শিশুর ডায়রিয়া জনিত পানিশূন্যতা এবং অপুষ্টি রোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

x