তাঁদের আইনজ্ঞ হয়ে ওঠার গল্প

শনিবার , ৩১ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ
50

ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহৃত অপরাধমূলক অন্যায়ের শিকার থেকে বেঁচে যাওয়া মেয়েরা আজকের দিনে প্রথম শ্রেণির উকিল হতে চায়! তাঁদের সবারই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। কয়েকজন বাল্যবিবাহের শিকার, কোনো কোনো মেয়েকে তার স্বামী পতিতাবৃত্তির উদ্দেশ্যে বিক্রি করে দিয়েছিল, কয়েকজনকে তাঁদের পরিবার দূরের কোন অচেনা বাড়িতে গৃহকর্মে নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিল। গল্প যা-ই হোক, তাঁদের সবারই একটি বিষয় সমানভাবে বিদ্যমান। এরা সবাই-ই ন্যায় প্রত্যাশী। এবং তাঁরা আইন বিষয়ে পড়তে চায় যাতে পাবলিক প্রসিকিউটর হয়ে মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যায় দমন করতে পারে। আর এই মেয়েদের সাহায্য করছে ‘স্কুল ফর জাস্টিস’ নামের একটি সংস্থা। এ- কোন সাধারণ স্কুল নয়। প্রতিষ্ঠানটি দেশের শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলোর সাথে জোট বেঁধেছে। সেই প্রসঙ্গে ফ্রি এ গার্ল মুভমেন্ট ইণ্ডিয়া-এর সিইও ফ্রান্সিস গ্রাসিয়াসের সঙ্গে কথা বলেছেন ইণ্ডিয়ান উইম্যান ব্লগ-এর কেশব খান্না, অনুবাদ করেছেন নীলাঞ্জনা অদিতি।

ভারতে ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহৃত নারীদের চিত্র কতটা যন্ত্রণাদায়ক?

ফ্রান্সিস: ২০১৪ সালে ECPAT এর একটি গবেষণা হয়েছিল যেখানে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়ায় এই অপরাধের থেকে কীভাবে বছরে ১.২ মিলিয়ন শিশুরা বেঁচে ফেরে এবং সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে এই সংখ্যা বছরের পর বছর বেড়েই চলেছে! ২০১৪ সালে ৩৩৪৫ টি মামলার প্রতিবেদন জমা পড়েছিল যার মধ্যে মাত্র ৩৮৪ টা আদালতে যায়, সেখানে দন্ডাদেশ এর অনুপাত ১০%-১৪%। বিশ্বাস করতে পারেন?
এই অপরাধের ক্ষেত্রে কারো কোন ভয়ভীতি নেই। যখন এই গুরুত্বহীন শাস্তির উদাহরণ তৈরি হয় তখন অপরাধ করেও মুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেয়। যত বেশি মামলা ও দন্ডাদেশ আসত অপরাধীদের মধ্যে তত গ্লানি বাড়ত। দুর্ভাগ্যবশত এমন কিছু বর্তমানে অনুপস্থিত। শাস্তির সময় এলে দেখা যায় আইনের প্রয়োগেই সমস্যা। POCSO, ITPA এর আইন তাদের জায়গায় ঠিকই আছে কিন্তু এর বাস্তবায়নের অবস্থা শোচনীয়। মাঝে মাঝে এটা পুলিশের ইচ্ছার অভাবে হয়, মাঝে মাঝে তথ্যপ্রমাণের অভাবে।

আপনি কি উদাহরণসহ বিস্তারিত বলতে পারবেন?

কিছু বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে যা মানব পাচার বিরোধী ইউনিট নামে পরিচিত, এই ইউনিটগুলোকে প্রত্যেক জেলাতে ছড়িয়ে দেয়া উচিত। কাগজী নিয়ম মতো তাদের মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত, কিন্তু যারা এটি করবে তাদের তহবিলে অর্থ নেই বা আছে নানা ফাঁক-ফোকরের ব্যাপার। এরকম প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সব প্রধান শহরগুলোতে আছে, কিন্তু সেখানে তাদের রাজনৈতিক চাপ সামলাতে হয়। CEC এর অবকাঠামোর চেহারা খুবই বাজে। সম্পদ খুবই অপ্রতুল, জমে আছে অনেক শেষ না হওয়া কেস, কর্তৃপক্ষের উপর অতিরিক্ত বোঝা ও বিশেষায়িত আদালতের অভাব।

এই বৃহৎ পাচার ও পতিতাবৃত্তি চক্রের মুখোমুখি হতে গিয়ে আপনাকে কি কোন বিপদ বা হুমকির সম্মুখীন হতে হয়েছিল?

ফ্রান্সিস: আমার শুরুর দিনগুলোতে, যখন আমি The School of Justice প্রতিষ্ঠা করিনি, তখন পেতাম। বিশেষত যখন আমি মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে যুক্ত ছিলাম, আমি যখন নিষিদ্ধ পল্লীতে যেতাম তখন অনেক গোলমালের সামনে পড়েছি। আমাকে তাদের মালিকের বিপক্ষে বংশীবাদকের ভূমিকা নিতে হয়েছিল এবং কিছু বিপদের সামনে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি জানতাম, আমি যা করছিলাম এর ফলাফল কী হবে। সাধারণত আমাকে যখন ভয় দেখানো হত আমি জানতাম যে এটা হাওয়ায় ভাসানো হুমকি। তারা পুরুষদের আক্রমণ করতে পারত না, শুধু ভয় দেখানোর চেষ্টা করতো। তাতে কোন কাজ হতো না। আমি কৃতজ্ঞ যে , যেদিন থেকে The School of Justice প্রতিষ্ঠা করেছি কোন হুমকির সম্মুখীন হতে হয়নি। কিন্তু আমি নিশ্চিত আরো মেয়েদের ভর্তি করলে ও ভীড় বাড়লে আমরা সবরকম সমস্যায় পড়ব।

বেঁচে যাওয়া মেয়েদের গল্পগুলো একদম বুক ভেঙ্গে দেয়। এই মেয়েরা যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সে-ব্যাপারে কিছু বলুন আর কীভাবে তারা এসব সামলাচ্ছে?

ফ্রান্সিস: The School of Justice এর ভাল দিক হল আমরা যাদের সাথে কাজ করছি তাদের বেশিরভাগকেই পুনর্বাসিত করা হয়েছে। বিশেষত, আময়া যেদিন থেকে তাদেরকে পড়াশোনা ও পেশাগত দক্ষতায় দীক্ষিত করছি, তারা ভবিষ্যতের কথা ভাবছে। মানসিক যন্ত্রণা সবচেয়ে গভীর থাকে দুটা সময়ে। প্রথমত রক্ষাকালীন কাজে আর দ্বিতীয়ত বিচারাধীন কালে। আমাদের মেয়েরা দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে খুবই ইতিবাচক কিন্তু ন্যায়ের জন্য তাদের মধ্যে এখনো ভীষণ তৃষ্ণা কাজ করে। এই কারণেই তারা এই সমাধানের অংশ হতে এত উৎসাহী। এরা আরো যারা শিকার হয়েছে তাদের সাহায্য করতে চায়। সমাজ সংস্কার এর কারণে তারা ব্যর্থ হয় কিন্তু এসব কারণে কাজ ব্যহত না করে তারা এসবের অংশ হতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে ও উন্নত করে।

বেঁচে যাওয়া মেয়েদের কাজের জন্য যে ক্লাস নেয়া হয় সে বিষয়ে ছোট্ট করে কিছু বলুন। এই ক্লাস কি প্রতিদিনের কলেজের ক্লাসের মত নাকি বিশেষ ক্লাস?

ফ্রান্সিস: আমরা তাদের ভাল কলেজে নিয়মিত ক্লাসে ভর্তি করাতে চাই। দেখুন তারা বিভিন্ন পরিবেশ থেকে এসেছে। কয়েকজনকে আমরা CLAT পরীক্ষায় বসতে সাহায্য করি, কয়েকজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা দিতে উৎসাহ দেই। CLAT এর পরীক্ষাগুলো একটু কঠিন কারণ এতে বসতে প্রচুর সময়ের দরকার। যারা CLAT এর পরীক্ষায় পাশ করতে পাওে না তারা রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন বিভাগে ভর্তি হয়।
প্রত্যেকটা মেয়ের দক্ষতা যাচাই করে নিতে আমি সারা দেশের আইন বিশেষজ্ঞদের সাথে বসি। এরপর আমরা আইন কলেজগুলোর সাথে কথা বলি ও তাদের জানাই, “মেয়েরা আপনাদের প্রবেশিকা পরীক্ষা সম্পূর্ণ করেছে। কিন্তু সে বাল্যাবস্থায় পতিতাবৃত্তি থেকে বেঁচে ফিরেছে আর আমরা আপনার সহকর্মী হতে চাই যাতে সে সুশিক্ষা পায়।”

এই মেয়েদের সাথে আপনার সাক্ষাত কীভাবে ঘটে? ভর্তি করার পদ্ধতি কী?

ফ্রান্সিস: বর্তমানে আমাদের টাকা পয়সার কিছু সমস্যা যাচ্ছে, এই কারণে আমাদের কঠিন পরিশুদ্ধতার পদ্ধতির মধ্যে থাকতে হবে। আমরা আমাদের বাচ্চাদের আশ্রয়দানকারী বাড়িতে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলি। আমরা তাদের পরীক্ষক অফিসার ও উপদেষ্টার সাথে কাজ করি। পুরো পদ্ধতির মাধ্যমে তাদেরকে পরামর্শ প্রদান ও দিক নির্দেশনা দিয়ে তারা যেন লক্ষ্য পূরণ করে তা নিশ্চিত করি।

ওয়েবসাইটে মেয়েদের পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। আপনি কি নিশ্চিত এটা মেয়েদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না?

ফ্রান্সিস: এটাই বড় প্রশ্ন, আর অনেক মানুষ এ-নিয়ে চিন্তিত। সেই অর্থে আমরা কিন্তু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছি। বেঁচে যাওয়া মেয়েরা যে কলঙ্কের চিহ্ন বয়ে বেড়ায় সেটা নষ্ট করাই হচ্ছে মূল ব্যাপার। যাই হোক, আমরা তাদের সম্মতি নিয়েই তাদের পরিচয় প্রকাশ করছি। একজন মেয়ে আমায় কী বলেছিল এখনো মনে আছে। সে বলেছিল “আমি এত কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছি যে এতে আমার কিছু যায় আসে না। ”

কিন্তু পরিচয় প্রকাশ হওয়াটা কি সমাজে তাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করছে না যার ফলে তাদেরকে অপরাধের সঙ্গী হিসেবে ভাবা যায়?

ফ্রান্সিস: আমরা এই উপলব্ধির বিরুদ্ধে পুরো ব্যাপারটি সমাজকে জানাতে তৎপর। অনেকেই এসব মহিলাদের পতিতা হিসেবে দেখে আর এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করে। তারা তাঁদেরকে এদের বিরুদ্ধে হওয়া অপরাধের থেকে বেঁচে যাওয়া মেয়ে হিসেবে দেখে না। শিক্ষকদের কথা বাদ দিন, পুলিশ নিজেরাই যথেষ্ট সংবেদনশীল নয়। একজন হাবিলদার, যার সাথে আমরা কাজ করার চেষ্টা করছিলাম, তিনি আমাদের মুখের ওপর তাদেরকে পতিতা বলেন। কাজেই আমরা পুলিশ অফিসার, উকিল, বিচারক ও অন্যান্যদের সাথে কাজ করছি যাতে তাদের মতামত বদলের চেষ্টা করতে পারি। এই সাহসী মেয়েদের জন্য আরো গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারি।

শিক্ষক ও অধ্যাপকদের জন্য কি সংবেদনশীলতা তৈরীর উদ্দেশ্যে কোন কর্মসূচি আছে?

ফ্রান্সিস: যেহেতু প্রথম ব্যাচ কলেজজীবন শুরু করছে তাই আমরা প্রশাসনের সাথে আলাপ শুরু করেছি। আমরা তাদের সাথে মধ্যস্থতা করি আর মেয়েদের লড়াই-এর প্রতি তাদের সংবেদনশীল করে তুলি। তারা যে ঝুঁকির সম্মুখীন হয় তার সম্পর্কে আমরা তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করি ও সেইসাথে তাদেরকে এই বিপ্লবের অংশ হতে অনুপ্রাণিত করি। আমরা চাই তারা যেন আমাদের মেয়েদের আর একটু সমর্থন দেয়।

আপনার কি মনে হয় যে তাদের পরিবারও অসাবধানতাবশত এই অপরাধের সাথে জড়ায়? যদি তাই হয় সচেতনতা কীভাবে বাড়ানো যায়?

ফ্রান্সিস: সেরকম তো নিশ্চয়ই মনে হয়। শুরুর দিককার ৫০- ৬০ ভাগ মেয়েদেরই তাদের পরিবার বিক্রি করে দিয়েছিল। হয় তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে তাদের বিক্রি করে দিয়েছে অথবা অপরাধীদের সাথে আঁতাত করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, মেয়েদের অনেক অল্প বয়সে বিয়ে দেয়া হয় পরে তাদের স্বামীরা তাঁদের বিক্রি করে দেয়। কাজেই এই মেয়েদের আসলে নিজেদের অতীত পরিবারের থেকে কোন প্রত্যাশা নেই। শতকরা ৪০ ভাগ মামলার ক্ষেত্রে পরিবারকে নির্দোষ পাওয়া যায়, আমরা তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করি, আর সমঝোতা করি। সেক্ষেত্রে, আমরা তাদের পরিবারকেও আমাদের School of Justice এর অন্তর্ভুক্ত করি। আমরা তাদের সব কিছুই জানিয়ে রাখি আর মেয়েদের শিক্ষিত করে তুলতে একসাথে কাজ করি।

x