ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক হোন

ডা. আবু মনসুর মো. নিজামুদ্দিন খালেদ

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ
632

১৯৮৬ সালের ঘটনা। ভারতের বম্বের বিখ্যাত জে. জে হাসপাতালে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হঠাৎ কিডনী বিকলজনিত কারণে চৌদ্দজন রোগী মারা যায়। এই ঘটনা হাসপাতালের চিকিৎসকদের হতবাক করে দেয়। কারণ মৃত ব্যক্তিদের কেউই কিডনীর কোন জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হননি। এইসব রোগীদের চিকিৎসায় অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে যে ওষুধটা সকলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল সেটা হল গ্লিসারিন। পরীক্ষা করে দেখা গেল হাসপাতালে সরবরাহকৃত গ্লিসারিন ছিল শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত গ্লিসারিন। এতে গ্লিসারিনের পরিমাণ ছিল শতকরা ৯ ভাগ, পানি ২১ ভাগ এবং বাকী ৭০ ভাগই ছিল বিষাক্ত ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল। এ ঘটনায় সারা ভারতে হৈ চৈ পড়ে যায়। সরকার বম্বে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি. লেন্টিনের নেতৃত্বে এক সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। বিচারপতি বি. লেন্টিন দশ মাস সময়কাল পর্যন্ত এই ব্যাপারে তাঁর তদন্ত কার্য চালিয়ে ১৯৮৭ সালের ৩০ নভেম্বর সরকারের কাছে তদন্ত রিপোর্ট পেশ করেন। রিপোর্টে তিনি বম্বের জে.জে হাসপাতালে বিষাক্ত গ্লিসারিনের কারণে চৌদ্দজন রোগীর মৃত্যুর জন্য হাসপাতালের ডীন, সুপার ও আরো দুইজন কর্মচারী, ওষুধ প্রশাসনের তিনজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এবং মহারাষ্ট্রের স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দায়ী করেন। রিপোর্টটি পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর এই দুঃখজনক ঘটনার দায়-দায়িত্ব স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। সরকার হাসপাতাল ও ওষুধ প্রশাসনের ৭ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন। বিচারপতি লেন্টিন তাঁর রিপোর্টে এই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘এই পৃথিবীর আলো-বাতাসে জন্ম নেবার ক্ষেত্রে এইসব নিরাপরাধ মানব সন্তানদের কোন হাত ছিল না আর মৃত্যুকেও ওরা স্বেচ্ছায় বরণ করেনি। ওরা মারা গেল। মারা গেল তেমনি নিঃশব্দে, যেমন বেঁচে ছিল দারিদ্র আর ক্ষুধার মধ্যে নীরবে, নিভৃতে’।
১৯৯২ সালে বাংলাদেশে বিষাক্ত ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল মিশ্রিত ভেজাল প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে হাজার হাজার শিশু মারা যায়। প্রপাইলিন গ্লাইকলের বদলে মুনাফা লোভী কয়েকটি নিম্নশ্রেণীর ওষুধ কোম্পানি প্যারাসিটামল সিরাপে মিশিয়ে ছিল ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল। কারণ এটা দামে খুব সস্তা। ফলে মুনাফা হয় অনেক বেশি। এই বিষাক্ত প্যারাসিটামল সিরাপ সেবনে কিডনী অচল হয়ে পড়ে। ফলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অসংখ্য শিশু। মানবসৃষ্ট এই দুর্যোগের জন্য যারা দায়ী ভারতে তারা শাস্তি পেয়েছিল। অথচ বাংলাদেশে কিছুই হয়নি। অপরাধী ওষুধ কোম্পানিগুলো কোন শাস্তি পায়নি। সরকারের ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শাস্তি পাওয়া তো দূরের কথা তারা তাদের দায়িত্বহীনতার জন্য দেশবাসীর কাছে একটিবার ক্ষমা পর্যন্ত চাইলেন না। এখন পর্যন্ত দেখা গেছে এ দেশে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোকে তাদের অপর্কমের জন্য উল্লেখযোগ্য কোন শাস্তি পেতে হয়নি। ফলে বারবার হচ্ছে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সর্বশেষ ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আবারো বিষাক্ত প্যারাসিটেমল সিরাপ খেয়ে অনেকগুলো শিশুর মৃত্যু হয়। তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র পীড়িত এই দেশটির মানুষের এ যেন স্বাভাবিক পরিণতি। একদিকে ক্ষুধা, রোগ, চিকিৎসাহীনতায় তাদের জীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে একশ্রেণীর মানুষরূপী জানোয়ারদের দ্বারা সৃষ্ট বিষাক্ত প্যারাসিটামল ট্র্যাজেডি। অথচ এসব নিয়ে কোন জোরালো প্রতিবাদ নেই। প্রতিরোধ নেই। দরিদ্র, অশিক্ষিত এসব মানুষ তাদের সন্তান হত্যার বিচার চাইতেও ভয় পায়। এই দুর্ভোগকে তারা তাদের নিয়তি বলে মেনে নিয়েছে। দুই শতাধিক লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওষুধ কোম্পানি নিয়ে গঠিত এদেশের ওষুধ শিল্পের উপর সরকারের ওষুধ প্রশাসনের যে খুব একটা নিয়ন্ত্রণ নেই সেটা বারবার সংঘটিত বিষাক্ত প্যারাসিটামল ঘটনাই প্রমাণ করে। ভেজাল ওষুধ তৈরি এবং বিক্রয় বন্ধের ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন তেমন একটা সফলতা দেখাতে পারছে না বিভিন্ন কারণে। তাই ওষুধ ব্যবহার সম্পর্কিত একটা স্বচ্ছ ধারণা সবার মাঝে থাকা দরকার যাতে কারো উপর নির্ভর না করে নিজ থেকে ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা যায়।
রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় লক্ষাধিক ফর্ামেসি চলছে বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই। আবার কোন কোন ফর্ামেসি চলছে ভূয়া লাইসেন্স দ্বারা। এইসব অবৈধ ফার্মেসিগুলোতেই মূলতঃ ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হয় বেশি। প্রতিটা ফার্মেসিতে একজন রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট থাকার কথা অথচ অধিকাংশ ফার্মেসি দিব্যি কোন ফার্মাসিস্ট ছাড়াই চলছে। শুধু তাই নয়, ফার্মাসিস্টবিহীন এইসব অবৈধ ফার্মেসির কল্যাণে হাতুড়ে ডাক্তারদের সংখ্যাও ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কখনোই এসব হাতুড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত নয়। নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানিগুলো ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি করে একশ্রেণীর হাতুড়ে ডাক্তারদের সহযোগিতায় তা অবাধে বিক্রি করে চলেছে। এইসব ঔষধের গায়ে ওষুধ প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যতালিকা ছাপা থাকলেও বিক্রি হয় তার চেয়ে অনেক কম দামে। ফলে এক শ্রেণীর ফর্ামেসী মালিক বেশী মুনাফার লোভে এইসব অখ্যাত, অত্যন্ত নিম্নমানের ওষুধগুলো বিক্রয়ের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়ে। তারা তখন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে র্নিদেশিত ওষুধটি না দিয়ে এসব মানহীন ওষুধগুলো চালিয়ে দেয়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত যাতে প্রেসক্রিপশনে লিখিত ওষুধগুলোই আপনি ফার্মেসি থেকে ক্রয় করতে পারেন। ওষুধ ক্রয়ের সময় অবশ্যই বিক্রেতার কাছ থেকে তার দস্তখতসহ ক্যাশ মেমো নেবেন। কারণ আপনি যে কোন সময় ভেজাল ও নকল ঔষধের শিকার হতে পারেন। ওষুধ কেনার আগে ঔষুধের নাম, উৎপাদন ও মেয়াদকালের তারিখ, প্রস্তুতকারী কোম্পানীর নাম স্পষ্টভাবে লিখা রয়েছে কিনা এবং ঔষধের বোতলের মুখ সঠিকভাবে বন্ধ রয়েছে কিনা দেখে নেবেন। এদেশে কিছু মানুষের বিদেশী ঔষধের প্রতি রয়েছে অহেতুক দুর্বলতা। আর এই সুযোগে কিছু দুর্নীতিবাজ ওষুধ ব্যবসায়ী বিদেশী ওষুধগুলো নকল করে বাজারে ছাড়ছে এবং জন স্বাস্থ্যের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। বর্তমানে দেশে কিছু ওষুধ কোম্পানি রয়েছে যাদের তৈরী ওষুধ উচ্চমান ও গুণসম্পন্ন। এসব ওষুধ বর্তমানে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে পর্যন্ত রপ্তানি হচ্ছে। তাই বিনা কারণে বিদেশী ওষুধের প্রতি দুর্বলতা পরিহার করে দেশের মানসম্পন্ন ওষুধ কোম্পানিগুলোর ওষুধ ব্যবহার করুন।
সঠিক পরিমাণে ওষুধ সেবনের মাধ্যমেই কেবল একজন রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। তাই রোগ নিরাময়ের জন্য ঔষধের পরিমাণ নিশ্চিতকরণ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ঔষধের মাত্রা বেশি হলে ওষুধ শরীরে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। আবার মাত্রা কম হলে ওষুধ শরীরে আদৌ ক্রিয়াশীল নাও হতে পারে। ফলে কাঙ্খিত ফল পাওয়া যায় না। তাছাড়া ঔষধের মাত্রা কম হলে কিংবা সঠিক মাত্রার ওষুধ নির্দিষ্ট মেয়াদকাল পর্যন্ত গ্রহণ না করলে ঔষধের প্রতি রোগ জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মে যায়। তাই অবশ্যই ডাক্তারের র্নিদেশমত সঠিক মাত্রায় ও মেয়াদে ওষুধ সেবন করা উচিত। কয়েকদিন ওষুধ সেবনের পর কিছুটা সুস্থতা বোধ করলেও ডাক্তারের নির্দেশমতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। কখনোই মাঝপথে ওষুধ সেবন বন্ধ করা চলবে না।
এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে একটা বদ অভ্যাস প্রচলিত রয়েছে। সেটা হলো নিজে নিজে ডাক্তারি করা। এসব লোক চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত কোন জ্ঞান না থাকার পরেও নিজের কিংবা পরিবার পরিজনের কিছু হলে নিজের খেয়াল খুশীমত ওষুধ খাওয়া শুরু করে দেয়। এটা অত্যন্ত বিপদজনক প্রবণতা। মনে রাখতে হবে বিভিন্ন ধরনের রোগে শরীরে একই ধরনের উপসর্গ সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া ওষুধ রোগ সারিয়ে তোলে বটে কিন্তু ওষুধও অন্যান্য রাসায়নিক পদর্াথের মত ক্ষতিকর হতে পারে। ভুল ওষুধ প্রয়োগে অঙ্গহানি থেকে শুরু করে প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে। কিছু কিছু ওষুধ আছে যা তাৎক্ষনিকভাবে শরীরের কোন ক্ষতি না করলেও পরবর্তীতে দেখা যায় লিভার, কিডনীর মতো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল করে দেয়। অতএব চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেখে কখনোই কোন ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
অনেক সময় সামান্য সর্দি-কাশি কিংবা জ্বর হলে আমরা অযথাই অনেক ওষুধ সেবন করি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব সর্দি-কাশি এমনিতেই সেরে যায়। কোন ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে সর্দি-কাশি হওয়ার পর শিশু অস্বাভাবিকভাবে ঘন ঘন শ্বাস নিলে কিংবা শ্বাস নেবার সময় শিশুর বুকের নীচের ভাগে পাঁজরের খাঁচার মাঝামাঝি জায়গা বসে গেলে (স্বাভাবিক অবস্থায় শ্বাস নিলে এই জায়গাটা ফুলে উঠে) চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ডায়ারিয়া হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লবণ জলের শরবতই যথেষ্ট। তবে রক্ত আমাশয় হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডায়ারিয়া কিংবা অন্যান্য পেটের অসুখে কোন ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
এবার ভিটামিন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলি। অনেকেরই ধারণা বেশি বেশি ভিটামিন খেলে তাতে শরীরের কোন না কোন উপকার হবেই এবং অতিরিক্ত ভিটামিন শরীরের কোন ক্ষতি করে না। অথচ মানুষের এ ধারণা সঠিক নয়। অন্যান্য ওষুধের মতো অধিকাংশ ভিটামিনও বেশি সেবন করলে শরীরে নানাবিধ ক্ষতি হতে পারে। অথচ আমরা শুধু ভিটামিনের গুণের কথা শুনেই মুগ্ধ। কিন্তু অতিমাত্রায় কিংবা প্রয়োজন ছাড়া ভিটামিন সেবনের ফলে সম্ভাব্য ক্ষতিকর দিকগুলো সর্ম্পকে খুব কমই খোঁজ রাখি। অধিকাংশ ভিটামিন যেমন নায়াসিন, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন ই ইত্যাদি মাত্রাতিরিক্ত সেবন শরীরের জন্য ক্ষতিকর। আপনার চিকিৎসকই সিদ্ধান্ত নেবেন আপনি ভিটামিনের অভাবজনিত কোন সমস্যায় ভুগছেন কিনা। মানুষ যদি সুষম খাদ্য এবং প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল খায়, তাতে শরীর পর্যাপ্ত ভিটামিন পায় এবং সেক্ষেত্রে অযথা টাকা খরচ করে বাজার থেকে ভিটামিন কিনে খাওয়ার কোন প্রয়োজন পড়ে না। আবার বাজারের এসব ভিটামিন কখনোই প্রাকৃতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত ভিটামিনের বিকল্প হতে পারে না।
তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মারা যায় ভেজাল ওষুধ কিংবা ভুল ওষুধ সেবনের কারণে। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রধান কারণ হল দারিদ্র। তাছাড়া আরেকটা কারণ হলো, ওষুধ ব্যবহার সর্ম্পকিত প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো এখনো দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌছায়নি। তাই আসুন এদেশের অসহায়, দরিদ্র, অশিক্ষিত মানুষগুলোর মাঝে আমরা ওষুধ ব্যবহার সম্পর্কিত তথ্যগুলো পৌঁছে দিয়ে এব্যাপারে তাদের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করি। আপনার আমার এই মিলিত প্রচেষ্টা আরেকটা বিষাক্ত প্যারাসিটামল ট্র্যাজিডীর পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়তা করবে।

x