৯০ শতাংশ ব্যাংকে পূর্ণাঙ্গ আইটি গভর্ন্যান্সের অভাব আর্থিক খাতে ঝুঁকি আরো বাড়ছে

শনিবার , ২১ এপ্রিল, ২০১৮ at ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ
89

আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। গত কয়েক বছরে দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রমে যে হারে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে সে হারে বাড়েনি সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা বলছে, দেশের ৯০ শতাংশ ব্যাংকে পূর্ণাঙ্গ আইটি গভর্ন্যান্স নেই। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়ামে ‘আইটি অপারেশন্স অব ব্যাংকস’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এ গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয় বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়। খবরে আরো বলা হয়, প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৯০ শতাংশ ব্যাংকে পুরোপুরি আইটি গভর্ন্যান্স নেই। এর মধ্যে ৮ শতাংশ ব্যাংকে আইটি গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগই নেয়া হয় নি। ৬০ শতাংশ ব্যাংক আইটি গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের কোন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় নি। আর আইটি গভর্ন্যান্স আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে ২২ শতাংশ ব্যাংকে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবলের অভাবে দেশের ব্যাংকিং খাত আইটি অবকাঠামো ও নিরাপত্তাসহ অনেক বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি গাইডলাইন অনুসরণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশের ৯৬ শতাংশ ব্যাংক ও ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যাংক শাখা রিয়েল টাইম অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রতিনিয়ত ব্যাংকগুলোর ইলেকট্রনিক ট্রানজেকশন বাড়ছে। তবে সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকসহ কিছু ব্যাংক অটোমেশন প্রক্রিয়ায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। যুগোপযোগী সফটওয়্যার, দক্ষ জনবল ও অবকাঠামোর অভাব, দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য না থাকা, উপযুক্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাব এবং আইটি খাতে কম বরাদ্দ থাকার কারণে আইটি নিরাপত্তায় ব্যাংকগুলো পিছিয়ে পড়ছে। তবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ব্যাংকগুলোয় সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ব্যাংকের কর্মীদের ব্যাপক হারে সাইবার নিরাপত্তা এবং সফটওয়্যার প্রশিক্ষণ বেড়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক খাত গঠনে জোর দেয়া হয়েছে। গুরুত্ব দিয়েই এখানে চালু করা হয়েছে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক, অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ। ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ, রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টের ব্যবস্থা করার ফলে ব্যাংকিং লেনদেন এখন সহজতর হয়েছে। গ্রাহকদের বেশি হারে সেবা দিতে আরো উন্নত প্রযুক্তির সম্মিলন ঘটাতে মরিয়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কোন ব্যাংক কত দ্রুত সর্বাধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধাদি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছে। অনেক ব্যাংক প্রথম পর্যায়ের অটোমেশন সম্পন্ন করেছে। অত্যাধুনিক ডাটা সেন্টার এবং ডিজাস্টার রিকভারি সাইটও প্রতিষ্ঠা করেছে। এসেছে গ্রিন ব্যাংকিংয়ের ধারণাও। এখন বেশির ভাগ ব্যাংকই অভ্যন্তরীণ কাজে কাগজবিহীন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করছে। বিশেষত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার নিজস্ব কোন নির্দেশনা, সংবাদ কিংবা তাৎক্ষণিক নোটিশ, কর্মকর্তাকর্মচারীদের প্রোফাইল অনলাইন রিকুইজিশন, এমআইএস রিপোর্ট প্রভৃতির জন্য আইটি নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি আইটি নিরাপত্তা, আইটি গভর্ন্যান্স। দেশের ৯০ শতাংশ ব্যাংকে পুরোপুরি আইটি গভর্ন্যান্স নেই। ফলে আইটি অবকাঠামো নিরাপত্তাসহ অনেক বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছে ব্যাংকগুলো। এতে আমানতকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, অনলাইন ব্যাকিং ট্রানজেকশন কোনটাই নিরাপদ নয়। লক্ষ্যণীয়, তথ্য সুরক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি অবকাঠামো নিরাপত্তার ব্যাপারে পর্যাপ্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এটা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল যেমন রয়েছে কুফলও বড় কম নেই। প্রযুক্তিকে জন্মবান্ধব করে তোলার জন্য এর সঠিক ও সুষ্ঠু ব্যবহার ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলা অপরিহার্য। ব্যাংকিং খাতের যে দুর্দশা সম্প্রতি গ্রাহকদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা দূর করা এবং একই সাথে ব্যাংকের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরসনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সাইবার হামলা প্রতিরোধ ও ব্যাংকগুলোর তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। যত দিন যাচ্ছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিকরণের সাথে সাথে গ্রাহকদের সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করার প্রতি ব্যাংকগুলো মনোযোগী হয়ে উঠছে। ফলে মানুষের নির্ভরতার জায়গা বাড়ছে। কিন্তু হালে প্রযুক্তি যে সুবিধা মানুষ ভোগ করছে, প্রযুক্তির যে সেবা নিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় গতি এসেছে, সেই প্রযুক্তির অসৎ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মানুষের আস্থার জায়গাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ মুহূর্তে প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানেরই উচিত, কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করা। এক্ষেত্রে সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই নিরাপত্তা তথ্য সমন্বয় অথবা বিনিময় হতে পারে। এটি দেশের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে গড়ে তুলতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির দুর্বল নিরাপত্তা অবকাঠামোগত কারণে বড় ধরনের সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত। সর্বক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম জোরদার করা হলেও এর জন্য যে নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন দরকার, সে বিষয়টির দিকে খেয়াল করা হচ্ছে না। এজন্য সর্বত্রই পুরনো প্রযুক্তি থেকে যাচ্ছে, আইটি গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এ সুযোগে প্রযুক্তির হালনাগাদের সার্বক্ষণিক যুক্ত থাকা হ্যাকারসহ অন্যান্য অসাধু চক্র সহজেই বাংলাদেশে সাইবার আক্রমণ চালাতে পারছে। আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়নের এ যুগে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সাইবার হামলা মোকাবেলায় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তথ্য প্রযুক্তিগত মজবুত নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এ জন্য দৃঢ় নৈতিকতা সম্পন্ন সৎ ও আস্থাভাজন দক্ষ জনবল গড়ে তোলায় জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর যেসব যন্ত্রপাতি ও ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর অপারেটিং সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। সার্ভার কম্পিউটার স্মার্টফোন ইত্যাদিতে সময়োপযোগী ও বিশ্বস্ত অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য ফায়ারওয়াল গড়ে তোলা অপরিহার্য।

x