৭ মার্চ সেকাল-একাল

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১২ মার্চ, ২০১৯ at ৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
23

ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলজুড়ে আতঙ্কের ভাইরাস! থমথমে পুরো মানচিত্র। মানুষ একটু জোরে কাঁশতেও ভয় পায়। হাঁচি পেলে মুখে রুমাল বা চাদর চাপা দিয়ে আটকাতে চায়। চারপাশে ওঁৎ পেত আছে অদৃশ্য মৃত্যুদূত। কখন কার ঘাঁড়ে শিকারি বাঘের মত চুপচাপ থাবা বসিয়ে দেয়- সবখানেই এই তীব্র ভয়ের আবহ! পুরো মানচিত্রজুড়ে চাপা হাহাকারের দীর্ঘশ্বাস গুমড়ে মরছে। পাক খাচ্ছে তীব্র শীতভোরে গ্রামের পুকুরের উপর ভাসতে থাকা ভারী কুয়াশার চাদরের মতো।
১৯৭৬ সালের ৭ মার্চ দিন শুরুর তখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি। শেষরাতে হঠাৎ লাউড স্পিকারের তীব্র শব্দের ব্রাশফায়ারে ভয়ের চাদর ঝাঁজরা হয়ে যায়। ধরমড়িয়ে জেগে উঠে কয়েক গ্রামের মানুষ। হাটহাজারির ধলই ইউনিয়নের কিছু গ্রামের বিশেষ কিছু পয়েন্টে ফজর আযানের আগেই বঙ্গবন্ধুর বজ্র হুংকারে সচকিত! ঐতিহাসিক ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর মুক্তি-স্বাধীনতার রক্তে নাচনতোলা, হ্নদপিন্ডের ভয় তাড়ানিয়া ভাষণ ঝংকার তোলে, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হও। মনে রেখ, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম – এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”!
হাল্কা শীতের আমেজে ঘুমভাঙা মানুষ কিছু বুঝতে পারেনা। কিভাবে সম্ভব! বঙ্গবন্ধু কী ফিরে এসেছেন! জলপাই রঙের সামরিক জান্তার দিন কী শেষ! চারপাশেইতো সামরিক জান্তার এজেন্ট কালো চিতার মতো ওঁৎ পেতে আছে। তাহলে—? ভাবনার তার ছিড়ে যায়,খানিক পর। বুটের আওয়াজ, হুংকার। মাইকের তার জান্তব নিষ্ঠুরতায় ছিঁড়ে ফেলা
হয়, সূর্য উঁকি দেয়ার পরপর। লাউডস্পিকারগুলো নামিয়ে ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া হয়। কারা এমন দুঃসাহস দেখিয়েছে, খুঁজে বের করতে লন্ডভন্ড করা হয় কয়েকটি চিহ্নিত পাড়া। মাইকওয়ালাকে খুঁজে বের করতেও চলে চিরুনি অভিযান। লাউডস্পিকার বা সাউন্ড রেকর্ডারে কোন চিহ্ন না থাকায় পুলিশ ও বিশেষ বাহিনীর লোকজন আরো খেপে যায়। ঘন বসতির পাঁচ পয়েন্টে টেলিগ্রাফের খুঁটি ও গাছের ডালে লাউডস্পিকার বাঁধা হয়। এজেন্সির লোকজনের সাথে কিছু অনুচরও জুটে যায়। তাদের ইঙ্গিতে আওয়ামী লীগ ঘরানার নিরীহ কয়েকজন বয়স্ক মুরুব্বি ও তরুণকে বেদম মারধর করেও অভিযুক্ত শনাক্ত সম্ভব হয়নি। পুলিশের বঙ্গবন্ধু ভক্ত এক কর্তার হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত কোন গ্রেপ্তার ছাড়াই মুরুব্বিদের মুচলেকা নিয়ে পুরো বাহিনী গ্রাম ছাড়ে।
এটা ছিল আমাদের প্রথম সফল গোপন মিশন। নিজের গ্রাম বেছে নিয়ে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের শোধ নিতে ক্রোধের বারুদ জমা করছি। চারপাশে জান্তার অনুচর। কিন্তু বেপরোয়া আমরা। আমি,অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, আবু হানিফ, সৈয়দ আহমদ (ভাইস চেয়ারম্যান), নুরুল হুদা শরীফ, মরহুম গিয়াসউদ্দিন, ছাত্রলীগের শাহনেওয়াজ চৌধুরী, শাহাবুদ্দিন দুলাল, শহীদ জসীম, শরীফ বাবু, মালেকসহ আরো কয়েক জানবাজ সিনিয়র- জুনিয়র স্থানীয় নেতা-কর্মী। রাজনীতি সামরিক ফরমানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নেপথ্য থেকে আমাদের সব অ্যাডভেনচারে উৎসাহ যোগাচ্ছেন স্থানীয় ইউ পি চেয়ারম্যান ও দলীয় সভাপতি মরহুম অ্যাডভোকেট আবুল বশর চৌধুরী। বেশ ক’দফা গোপন বৈঠক করে গ্রামে ৭ মার্চ শুরুর ভোররাতে একযোগে পাঁচ পয়েন্টে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই। ভাড়ায় মাইক পাওয়া ছিল বাংলাদেশের মঙ্গল গ্রহ জয়ের মতোই কঠিন কাজ। কিন্তু এগিয়ে আসেন নুরুল ইসলাম নামের তখনকার একজন বিমান কর্মী। মাইক কেনার বড় অঙ্ক তিনি যোগান দেন। বাকিটা মরহুম অ্যাডভোকেট আবুল বশর চৌধুরী, প্রয়াত মোক্ষদা রন্‌জন দাশসহ কয়েকজনের সহযোগিতায় যোগাড় হয়ে যায়। খুবই গোপনীয়তায় মাইক কেনা ও গোপনস্থানে রাখা হয়। আরো গোপনীয়তায় মাঝরাতের আঁধারে পয়েন্ট বাছাই করে লাউডস্পিকার ফিট ও মাইক চালু করা হয়। পরিণতি জেনেই অসম সাহসী মিশন এগিয়ে নিই। ভয়ডর বলতে কোন অনুভূতি বঙ্গবন্ধু খুনের পর থেকেই আমাদের ছিলনা। পরবর্তীতে নানা রাজনৈতিক মিশনে এর অসংখ্য প্রমাণ রেখেছি। সেদিনের ঘটনা, ইতিহাসে স্থান পাবেনা, বঙ্গবন্ধু নামটা যখন উচ্চারণ করা ছিল মৃত্যুদন্ডতুল্য অপরাধ, সেখানে ১৯৭৬ সালের ভয়াল আতঙ্কের জনপদে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার কতো বড় অপরাধ বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওজন করা অসম্ভব! স্মৃতির মহাসড়কে ঘুরে আসার মানে কোন সরকারি সুবিধা বা ইতিহাসের রেকর্ডবুকে নাম তোলা নয়। রাজনীতির সেকালের সাথে একালের বিভাজন রেখা কতো বিশাল তা তুলে ধরার ক্ষিণ প্রয়াস মাত্র।
শুধু ৭৬ এর ৭ মার্চ নয় পরের বছর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেয়ার আগে পরেও প্রতি বছর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারের ঐতিহ্য ধারাবাহিকভাবে চালু রাখি।
প্রমাণ খুঁজতে চাইলে ইতিহাস গবেষকরা ধলই ইউনিয়ন রাজনীতির ‘৭৫ পরবর্তী পর্ব যাছাই বাচাই করতে পারেন। আজ পরম সুদিনে অসহনীয় ভীতির ওসব ভয়াল দিনের অদম্য সহযোদ্ধারা কেউ পরপারে। কেউবা এখনো রাজনীতিতে আছেন,আমি ছাড়া। কিন্তু কেউ রাজনীতিকে বৈষয়িক স্বার্থে ব্যবহার করেননি। এটাই আমাদের আদর্শিক রাজনীতির বিশাল সাফল্য! লেখাটি যখন তৈরি করছি, তখন হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও দুঃসময়ের সহযোদ্ধা বন্ধু অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী ফোনে জানায়, ধলই’র প্রবীণ ও দুঃসময়ের নিবেদিত আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আহমদ আর নেই। ৮ মার্চ তিনি পরিণত বয়সে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। আল্লাহ পাক দলীয় আদর্শে নিবেদিত মহান মানুষটিকে বেহেশত নসিব করুন। নুরুল হুদা শরীফও গুরুতর অসুস্থ। অনেকদিন দেখা নেই, রাজনীতি থেকে ছুটি নেয়ার পর। অথচ এঁরা আমার আত্মার আত্মীয়!
আওয়ামী লীগ রাজনীতির সদরে-অন্দরে এখন সুখের পায়রাদের বাক বাকুম! সাংগঠনিক কাঠামোও যাচ্ছেতাই। ভাগ্য গড়াপেটার সেরা সেক্টর এখন ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনীতি। নীতি-আদর্শ, বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী শেখ হাসিনা কীর্তনের ঢোলের বাজনা যত তীব্র হচ্ছে প্রকৃত নীতি- আদর্শের ধারা ততবেশি শুকিয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক কারণে সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে। গণতন্ত্র দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। ঢাকা সিটি বা উপজেলা নির্বাচনে কোন নির্বাচনী আমেজ নেই, ভোটারদের আগ্রহ নেই। কর্পোরেট বাণিজ্যের সাথে ‘সেকহ্যান্ড’ করে রাজনীতি ঢুকে গেছে কর্পোরেট ঘরানায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পরস্পর বিরোধী উক্তি শুনে মনে হয়, আমরা বোধহয় পথ হারিয়ে ফেলেছি। ভাগ্য শিকারি নব্য ধনীরা গলায় বঙ্গবন্ধুর তাবিজ ঝুলাতে দীর্ঘ লাইন দিয়েছে। সাথে চাটুকার,চামচার কান ঝালাফালা করা কিচির মিচির! পুরানোদের অনেকেও এখন কর্পোরেট ঘরানা ভালই বোঝেন। ঝলমলে কনভেনশন সেন্টার, তারকা হোটেল আর বাতানুকুল ড্রয়িংরুমের কর্পোরেট ঘরানায় আটকে গেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ-কর্ম। এ’ অবস্থায় উদযাপিত হচ্ছে বছরব্যাপী বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী। বিশাল কর্পোরেট আড়ম্বর আর বর্ণাঢ্য আয়োজনের ঘোলাস্রোতের ঘূর্ণাবর্তে নীতি-আদর্শ তলিয়ে গেলে রঙিন ফেনার বুদবুদে মিশে কীভাবে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন, কোনোভাবেই মেয়াদোত্তীর্ণ ঘিলুতে ঢুকছেনা।

x