৭৩০০০ বছরের পুরানো চিত্রকর্ম

রেজাউল করিম

বুধবার , ৩ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
35

আদিম মানবগোষ্ঠী সুদূর প্রাচীনকালে তাদের জীবনযাত্রার কাহিনি লিপিবদ্ধ করে গেছে গাছের বাকল, পাথর, পশুর চামড়ার ওপর এবং অন্যান্য মাধ্যমে। সেকালের মানুষ উদ্বুদ্ধ হতো মাতা-পিতা, আত্মীয়স্বজন, সামাজিক মূল্যবোধ, সমাজের মঙ্গলামঙ্গল কর্ম ও অতিপ্রাকৃতে। পরিবারের সবাই যাতে সমাজে কিছু না কিছু অবদান রাখতে পারে সেজন্য ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেওয়া হতো। সন্তানদের সব সময় সমাজ, পরিবার, আত্মীয়স্বজন, ক্ল্যান ও ট্রাইবের যাতে ভালো হয় তাই শিক্ষা দেওয়া হতো। তবে এই শিক্ষা লিখিত পদ্ধতির ছিল না। লিখিত পদ্ধতির পড়ালেখা তখনও আবিষ্কৃৃত হয়নি। তখন লেখাপড়া শিক্ষা দেওয়া হতো উপদেশ, পরামর্শ, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে। খেলাধুলা ও পারিবারিক বিভিন্ন প্রয়োজনের খাতিরে শিশুরা অনেক কিছু শিখত। বয়ঃপ্রাপ্তির পর বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের উপদেশ, পরামর্শ দেওয়া হতো, কাহিনি শোনানো হতো। এসব মানুষ একে অপরকে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলত। নানা রকম গৃহস্থালি শিল্প-উপকরণ ও মৃৎপাত্র প্রস্তুত, বস্ত্র বয়ন কাজে মেয়েরা কিংবা পুরুষেরা একে অপরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করত। সন্ধ্যার পর অন্ধকার গাঢ়তর হলে তখন তারা আগুনের কুণ্ডলী জ্বালিয়ে গালগল্পে জায়গাটি মুখর করে তুলত। এভাবে প্রাগৈতিহাসিককালের সেসব মানুষ একে অপরের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হতো নতুন নতুন অবস্থা ও ব্যবস্থার কথা শুনে। এই ছিল সেই আদিম মানুষের লেখাপড়া ও অভিজ্ঞতা অর্জনের ভিত্তি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সম্প্রতি পাওয়া গেছে প্রায় ৭৩০০০ বছরের পুরনো অঙ্কন সম্বলিত একটি ছোট পাথর খণ্ড। লাল গিরিমাটির রং দিয়ে অঙ্কিত এটা মানব সমাজের প্রাচীনতম চিত্রকর্ম বলে গবেষকরা দাবি করছেন। পাথরখণ্ডটি পাওয়া যায় ব্লমবোজ নামক এক গুহায় আর এ সম্পর্কিত গবেষণাটি প্রকাশ করে ‘ন্যাচার’। সেখানে বলা হয়, এর থেকেও প্রাচীন খোঁদাই চিত্রের সন্ধান পাওয়া গেলেও পাথরের এই দাগগুলোই মানুষের অঙ্কিত প্রথম বিমূর্ত চিত্র। এতে একজন শিল্পী গিরিমাটির রঙিন পেন্সিল ব্যবহার করেছেন যা মানব চেতনা বিকাশের প্রাথমিক নিদর্শন বহন করছে। গবেষক দলের প্রধান নরওয়ের বারগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্রিস্টোফার হেনসিলউড জানান, ভাঙা পাথরের প্রান্তের লাইনগুলো দেখে বলে দেওয়া যায়, চিত্রটি আরও বড় আয়তনে আঁকা হয়েছিল। এ দাগগুলোকে শিল্পকর্ম বলা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থাকলেও, শিল্পীর কাছে এটি অবশ্যই অর্থপূর্ণ কিছু প্রকাশ করতো। কেপটাউন থেকে ৩০০ কিলোমিটার পূর্বের এই ব্লমবোজ গুহায় আরও অনেক প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনের সন্ধান পান প্রত্‌্নতাত্ত্বিকরা। এগুলোর মধ্যে প্রায় এক লাখ বছর আগের খোঁদাই করা মাটির টুকরা, লাল মাটি দিয়ে আবৃত বিছানা ও রঙ তৈরির সরঞ্জাম অন্যতম। বিজ্ঞানীদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকায় হোমোসপিয়েন্স নামক আধুনিক মানব প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে তিন লাখ ১৫ হাজার বছরেরও আগে।
লেখার ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়টি হলো চিত্রাঙ্কন। এই চিত্রাঙ্কন রীতিও শুরু হয় প্রাচীন প্রস্তর যুগে, যখন আদিম মানুষ ছবি আঁকত গুহার দেয়াল, প্রস্তর খণ্ড, হাড় ও হাতির দাঁতের ওপর। এই চিত্রকর্মে কখনও শত্রু নিধন, কখনও পশু শিকারের দৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। মুখের কথা দিয়ে এসব স্মৃতিকে ধরে রাখা যেত না বলে তারা চিত্রের মধ্য দিয়ে তা ধরে রাখত। অনেক সময় ক্রিয়াকর্মের ওপর যাদুশক্তি সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যও নিহিত থাকত ওই চিত্রাঙ্কনের ভেতর। সে সময় আদিম মানুষের কাছে আরেকটা বড় প্রয়োজন ছিল এই রেখা, চিত্র বা চিত্রলিপির, যার মাধ্যমে দূরের লোকদের কাছে সহজে সংবাদ পাঠানো যেত। কখনও ওই চিত্রলিপি আন্তঃকওম চুক্তি সম্পর্কিত দলিল রচনার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই চিত্রলিপি পরবর্তী পর্যায়ে চিত্র-প্রতীক বা ভাবচিত্র হয়ে দাঁড়ায়। এগুলোকে বলা যায় চিত্রের সংকত রূপ। বলাবাহুল্য, এ চিত্রলিপিতে চিত্রিত মূল প্রাণী বা বস্তুর সঙ্গে সাদৃশ্য খুব অল্পই থাকত। তবে এই সংকেত চিহ্নগুলোর মধ্য দিয়েই দর্শকদের মনে মূল প্রাণী বা বস্তু সম্পর্কে ধারণা জন্মাত।
প্রস্তর যুগের মানুষ সম্পর্কে নানা মত প্রচলিত রয়েছে। মানব সমাজের আধুনিক পর্যায়ে উত্তরণে প্রাচীন চিত্রকর্ম, লিখন পদ্ধতি সবই মুখ্য পালন করেছে।

x