৭০ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধি সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেই

সমাধি চিহ্নিত করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি

লিটন কুমার চৌধুরী : সীতাকুণ্ড

সোমবার , ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ
41

একাত্তরের পঁচিশ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর থেকে সীতাকুণ্ড ও কুমিরা রেল স্টেশন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বিভিন্ন গ্রুপে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেন সীতাকুণ্ডের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। নয় মাস যুদ্ধ করে প্রায় সত্তরজন শহীদের জীবনের বিনিময়ে ১৬ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হলো সীতাকুণ্ড। অথচ দীর্ঘ ৪৭বছর অতিক্রম হলেও এখন পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধি সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে কথাগুলো বললেন একাত্তরের রণাঙ্গনে পা হারানো মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল ইসলাম।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক উপজেলা কমান্ডার মো. সানাউল্ল্লাহ বলেন, তৎকালীন থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম এ মামুন এবং সাধারণ সম্পাদক ডাঃ এখলাস উদ্দিনের নেতৃত্বে সকল স্তরের স্বাধীনতার স্বপক্ষের নেতাকর্মীদের নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিরা নামক স্থানে গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়ে প্রথম প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। এসময় পাকবাহিনী এলোপাথাড়ি গুলি করে। সেদিন নৃশংসভাবে হত্যা করে বদিউল আলম বাদশাকে। স্থানীয় এলাকাবাসী সেখানে বাদশাকে সমাধি দেন। পাকসেনাদের সাঁজোয়া বহরকে বাধা দিলে কুমিরার মসজ্জিদায় কামাল উদ্দিন নামে এসএসসি পরীক্ষার্থীকে হত্যা করে। ৩০মার্চ সোনাইছড়ির জোরামতল এলাকার জামে মসজিদে নামাজপড়া অবস্থায় ১১জন মুসল্লীকে হত্যা করে পাকসেনারা। পরবর্তীতে মসজিদের সামনে তাদেরকে সমাধি দেয়া হয়।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দিরে উঠার ২নং পুল সংলগ্ন, সীতাকুণ্ড পৌর সদরস্থ রেল স্টেশনে পূর্বে তাঁতিপাড়া, পন্থিছিলা বাজারে, বশরত নগর ছড়ার পাশে, উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন পেশকার পাড়া, কুমিরা রেল ষ্টেশনের পাশে, সলিমপুর ওভারব্রীজ সংলগ্ন এলাকা, কুমিরা গুল আহমদ মিলের ভেতরে পাকহানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলে রাখে। পরবর্তীতে তাদেরকে সেখানে সমাধি দেয়া হয়। পাকসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে উল্লিখিতস্থানে যারা শহীদ হয়েছেন তারা হলেন, সৈয়দপুরের নুরুল আলম চৌধুরী, তাহের হোসেন, মুরাদপুরের ক্যাপ্টেন শামসুল হুদা, সীতাকুণ্ড সদরের অধ্যাপক হারুনুর রশীদ, আবদুল আলীম, আবু বক্কর সিদ্দিকী, বাড়বকুণ্ডের আলী আকবর, মাহমুদুল হক, বারৈয়াঢালার মো. হামিদুর রহমান, টকুন চন্দ্র সুত্রধর, কুমিরার নুরুল আলম, মদিন উল্লা, সফিউল্ল্লাহ ভূইয়া, ভাটিয়ারীর মাহবুবুল আলম, নূরুল আলম চৌধুরী, জালাল আহম্মদ চৌধুরী, জাকারিয়া চৌধুরী, সলিমপুরের রাজা মিয়া, ভুলু গোলাপী, আমিনুর রহমান, কামাল উদ্দিনসহ আরো অনেকে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে কুমিরাযুদ্ধ ছিল এই অঞ্চলের পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম এবং শেষ যুদ্ধ। কুমিরাযুদ্ধে পাকবাহিনীর বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। পাকবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার মেজর জেনারেল জামিলসহ তাদের প্রায় দেড় শতাধিক সৈনিক প্রাণ হারায়। দীর্ঘদিন ধরে এ স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার দাবী ছিল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। অবশেষে সেই দাবীর বাস্তবতা পায়।
মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ডা. মোঃ এখলাস উদ্দিন জানান, সমপ্রতি বাইপাস সড়ক নির্মাণ করতে গিয়ে সীতাকুণ্ড সদর এবং সলিমপুর ওভারব্রীজ এলাকার কয়েকটি স্থানে বেশ কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন কমাণ্ডার মুলকেতুর রহমান বলেন, পৌর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি কবর স্থান নির্মাণ ও বাইপাস সড়কের মুখে রোড আইল্যান্ডে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কাদেরিয়া বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান ও সীতাকুণ্ড পৌরসভার সাবেক মেয়র নায়েক(অবঃ) শফিউল আলম জানান, সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ও কুমিরা রেল স্টেশন সংলগ্ন যক্ষ্মা হাসপাতালে পাক হানাদার বাহিনীর নির্যাতন কক্ষ ছিল। এখানে অনেকের ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে কবর দেওয়া হয়েছে। এখনো তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আলীম উল্ল্যা জানান, গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কুমিরা ও সীতাকুণ্ড পৌরসদরে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর গণকবর চিহ্নিত করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া যুদ্ধে শহীদদের বধ্যভূমির মালিক ও দখলদারদের বিবরণ, গণকবরের মানচিত্র তৈরি ও ভূমি অধিকরণের কাজ চলছে।

x