৭০ মিনিটের চ্যালেঞ্জও নিতে পারলেন না সাকিবরা

আফগানিস্তানের ঐতিহাসিক জয়

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৫:৫১ পূর্বাহ্ণ
90

জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে তিন আফগান ক্রিকেটার হাঁটছিলেন মাঠে। যেন আক্ষেপ করছিলেন কেন এমন বৃষ্টিটা হলো। নিজেদের ইতিহাস গড়া কি তাহলে হবে না? তবে অপেক্ষায় ছিলেন আফগানরা। কখন বৃষ্টি থামবে। কারণ তারা জানতো অন্তত এক ঘন্টাও যদি খেলতে পারে তাহলে জয়টা তাদেরই হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে। ৭০ মিনিটের চ্যালেঞ্জ নিতে পারলো না সাকিবরা। বৃষ্টিও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি আফগান যোদ্ধাদের সামনে। সবকিছুকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশকে উপহার দিল চরম এক লজ্জা।
সে সাথে আফগানরা গড়ল এক ইতিহাস। যে ইতিহাসের আগে কেউ গড়েছে কিনা জানা নেই। বৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে হারিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে আফগানিস্তান। মাত্র তিন টেস্ট খেলতে নামা আফগানরা ১১৫ টেস্ট খেলা বাংলাদেশকে উড়িয়ে দিয়েছে ২২৪ রানের বিশাল এবং লজ্জার পরাজয় উপহার দিয়ে। এক টেস্টের এই সিরিজটিই কেবল জিতেনি আফগানিস্তান। জানিয়ে দিল তাদের টেস্ট মর্যাদা পাওয়াটা যথার্থই ছিল। আর দলটির অধিনায়ক রশিদ খান কেন বিশ্ব সেরা বোলার সেটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। দিনের মাত্র ৪টি ওভার বাকি ছিল। উইকেটে তখনো ছিল সৌম্য সরকাদের মত ব্যাটসম্যান। কিন্তু রশিদ খানের হাত থেকে যখন আগুনের গোলা বের হয় তখন পা কাঁপতে থাকা সৌম্যদের আউট হওয়া ছাড়া আর কিইবা করার থাকে। রশিদ খানের সামনে কতোটা অসহায় ছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেটা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর বাংলাদেশকে হারাতে যে একজন রশিদ খানই যতেষ্ট সেটাও প্রমাণ করল আফগানরা। দুই ইনিংসে ১১ উইকেট নিয়ে তিনিই আফগানদের জয়ের নায়ক। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে সৌম্য সরকারকে আউট করার পর আফগানদের উচ্ছ্বাস যেন বাধ ভাঙা জোয়ার। কেউই যেন থামাতে পারছিলনা তাদের। থামার কথাও না। এমন একটি অসাধার জয়ের পর আর থামবেই বা কেন আফগানরা। যেখানে শুধু বাংলাদেশ নয়, আফগানদের লড়াই করতে হয়েছে বৃষ্টির সাথেও। তবে কোন বাধাই মানেনি আফগান যোদ্ধারা।
ম্যাচের চতুর্থ দিনে টাইগার দলপতি বলেছিলেন তাদের বাঁচাতে পারে কেবল বৃষ্টি। সে বৃষ্টি যেন আশির্বাদ হয়ে এসেছিল টাইগারদের জন্য। আগের রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু বেলা ১২টা বাজতেই হঠাৎ আলোর রেখা। আম্পায়ার সিদ্ধান্ত নেন খেলা শুরু করার। দুপুর ১টায় শুরু হয় খেলা। কিন্তু ১৩ বলের বেশি হতে পারেনি। ১৩ বল পর আবারও বৃষ্টি নামায় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিকাল সাড়ে ৩টা নাগাদ বৃষ্টি থামে এবং ৪টা ২০ মিনিটে খেলা আবার শুরু হয়। দিনের বাকি সময়ের মধ্যে ১৮.৩ ওভার খেলতে হবে সাকিব আল হাসানদের। সেই ১৮.৩ ওভারই খেলতে পারলো না তারা। হারিয়ে ফেলেছে চারটি উইকেটই। আর মাত্র ১০ মিনিট টিকতে পারলেই ম্যাচ ড্র। কিংবা আর মাত্র ৩ ওভারেরও কম। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা পারলেন না। ২২৪ রানের বিশাল পরাজয়ের লজ্জাই বরণ করতে হলো টাইগারদের। বাংলাদেশে এসে অবিস্মরণীয় এক জয় নিয়ে মাঠ ছাড়লো আফগানিস্তান।
আফগান অধিনায়ক রশিদ খান আশায় ছিলেন এক ঘণ্টা খেলা হলেও তারা জিতে যেতে পারবেন। শেষ পর্যন্ত আফগানরাই পেরেছে। ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটের সুযোগ পেয়েছে তারা। আর তাতে ১ ঘণ্টার মধ্যেই তুলে নিয়েছে বাকি চার উইকেট। যদিও এই লজ্জা এড়াতে পারতেন সাকিব আল হাসান। যদি না তিনি এমন শটটা খেলতে না যেতেন। কতোটা দায়িত্বহীন হলে এমন শট খেলতে পারে তা বোধ হয় আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। দলের অধিনায়ক তিনি। দলের দায়িত্ব তার কাঁধে। কিন্তু সবকিছু বেমালুম ভুলে গেলেন। খেললেন একেবারে অবিবেচকের মতো একটি শট। আর তাতে যা হওয়ার তাই হয়েছে। লজ্জার মালা পড়তে হয়েছে সাকিবদের গলায়। অথচ দেখে-শুনে খেলে বলগুলো কাটিয়ে দিলেই হয়তো বাঁচানো যেতো এই টেস্ট। বৃষ্টির কল্যাণে পাওয়া সুযোগটাকে হেলায় হারিয়ে ফেললেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। বিশেষ করে দুই স্বীকৃত ব্যাটসম্যান সাকিব এবং সৌম্য সরকার।
বিকেল সাড়ে চারটায় খেলা শুরু হওয়ার পর আফগানদের শুরু থেকেই চেষ্টা ছিল উইকেট তুলে নেয়ার। সাকিবের চেষ্টা ছিল ঠেকিয়ে রাখার। কিন্তু মাঠে নামার পর প্রথম বলটি আফগান চায়নাম্যান জহির খান রাখলেন একেবারে অফ স্ট্যাম্পের ওপর। সাকিব ঠেকানোর চেষ্টাই করলেন না। প্রথম বলেই মারার চেষ্টা। যেন টি-টোয়েন্টি খেলতে নেমেছেন। আরো এক ঘন্টা সময় যে ব্যাট করতে হবে সেটা ভুলেই গেলেন। জহির খানের বলটিকে খেলতেই পারলেন না সাকিব। ব্যাটের উপরের কানায় লেগে চলে যায় উইকেট রক্ষকের গ্লাভসে। ম্যাচটা তখন চলে গেছে আফগানদের পকেটে। ৫৪ বলে ৪টি চারের সাহায্যে ৪৪ রানের লজ্জার ইনিংস খেলেই ফিরলেন সাকিব। এরপর মেহেদী মিরাজও ফিরলেন। সাথে শেষ করে দিয়ে গেলেন রিভিউটা। না হয় রিভিউ থাকলে রক্ষা পেতে পারতেন তাইজুল। কিন্তু মাঠে যখন খেলার সামর্থ থাকেনা তখন ভাগ্য আর মাঠের বাইরের সহায়তা নিয়ে কতোক্ষণ ঠিকে থাকা যায়। যেমনটি পারলনা বাংলাদেশ। নবাগত আফগানদের কাছে হেরে লজ্জার মালা বরণ করতে হলো। একজন রশিদ খান কতোটা দক্ষ বোলার সে সাথে দক্ষ দলনেতা সেটা যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন সাকিবকে। বিশ্ব ক্রিকেটে রশিদ খানের সমাদর সাকিবের চাইতে অনেক বেশি। সে সাথে রশিদ খানের বুদ্ধিদ্বীপ্ত অধিনায়কত্ব নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। দুই ইনিংসে ১১ উইকেট এবং ৭৫ রান করা সুবাধে ম্যাচ সেরা রশিদ খান। এতদিন টি-টোয়েন্টির দল হিসেবে দেখা হতো আফগানদের। এবার তারা প্রমাণ করলেন টেস্ট খেলাটাও তারা এরই মধ্যে রপ্ত করে ফেলেছে।

x