৬৮ একর ভূমি ঘিরে কর্মযজ্ঞ

বে-টার্মিনাল ।। নির্মিত হচ্ছে রিটেইনিং ওয়াল ও ইয়ার্ড ।। ৮৩৯ একর হুকুমদখলের চূড়ান্ত অনুমোদন আগামী সপ্তাহে

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ১৪ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ
1061

দেশের আগামীর বন্দর হিসেবে বিবেচিত ‘চট্টগ্রাম বে টার্মিনাল’ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। হুকুমদখলকৃত ব্যক্তি মালিকানাধীন ৬৮ একর ভূমিকে ঘিরে শুরু হয়েছে মহাযজ্ঞ। অপরদিকে সরকারের খাস ৮৩৯ একর ভূমি হুকুমদখলের জন্য আগামী সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে ‘কেন্দ্রিয় ভূমি বরাদ্দ কমিটি’র বৈঠক বসছে। এই ভূমি প্রাপ্তির পাশাপাশি সাগর ভরাট করে উদ্ধার করা ১৬শ’ একর ভূমি মিলে সর্বমোট ২৫শ’ একর ভূমিতে শুরু হবে বে টার্মিনালের মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন। বিদেশী চারটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ইতোমধ্যে বে-টার্মিনাল নির্মাণ এবং অপারেশনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দেশের আগামী একশ’ বছরের বন্দরের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে বে টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। হালিশহর এলাকার বঙ্গোপসাগরের উপকূলের ৯০৭ একর ভূমির উপর এই বন্দর নির্মাণ করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। শুরুতে ৬৮ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি হুকুমদখল করা হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ এই ৬৮ একর ভূমির মূল্য পরিশোধ করে দখল বুঝে নেয়ার পরই কার্যক্রম শুরু করেছে। উক্ত ৬৮ একর ভূমিতে বাউন্ডারি ওয়াল এবং রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। ইয়ার্ড নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। সাগর থেকে ড্রেজার দিয়ে মাটি তুলে শুরু হয়েছে ভূমি ভরাটের কাজ। ৬৮ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমির পেছনে সাগর থেকে আরো অন্তত ৫শ’ একর ভূমি উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পে সাগর থেকে মোট ১৬শ’ একর ভূমি রিক্লেইম করা হবে। সিঙ্গাপুরের আদলে সাগর ভরাট করে উদ্ধার করা ভূমিতেই নির্মিত হবে বে টার্মিনালের অবকাঠামো। এটিই দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রিক্লেইমের ঘটনা বলেও মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্ট (এইচপিসি) সেলহর্ন এবং বাংলাদেশের কেএস নামের বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান বছর ব্যাপী সার্ভে করে বে টার্মিনালের ব্যাপারে যেই রিপোর্ট উপস্থাপন করেছে তাতে সাগর ভরাট করে ভূমি উদ্ধার করে স্ট্রাকচার এবং সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণের বিষয়টি রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বর্তমানে সরকারের ৮৩৯ একর খাস জমি প্রাপ্তির বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই ভূমি বরাদ্দের ব্যাপারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। আগামী সপ্তাহে ভূমি মন্ত্রনালয়ে কেন্দ্রিয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির বৈঠকে সরকারের এই খাস জমি বরাদ্দের বিষয়টি আলোচনার পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হবে। ভূমি মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নের্তৃত্বাধীন এই কমিটি সরকারের খাস জমি বরাদ্দের ব্যাপারে অত্যন্ত পজেটিভ বলেও বন্দরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের খাস জমি বন্দোবস্তীর প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। বিনা টেন্ডারে বরাদ্দ দিতে হলে ভূমির মৌজা রেটের তিনগুণ দাম দিতে হয়। যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেই তিনগুণ দামেই ভূমি বন্দোবস্তী নিতে হয়। সরকারী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান বলে কোন আলাদা সংজ্ঞা সেখানে দেয়া হয়নি। কোন প্রতিষ্ঠানকে কমমূল্যে জায়গা দেয়ারও সুযোগ প্রচলিত আইনে নেই। তবে সরকার প্রধান চাইলে যে কোন প্রতিষ্ঠানকে প্রতীতি মূল্যে ভূমি বন্দোবস্তী দিতে পারেন। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী বে টার্মিনালের জন্য চিহ্নিত ৮৩৯ একর ভূমি বন্দোবস্ত নিতে হলে মৌজা রেটের তিনগুণ অর্থ প্রদান করতে হবে। আর ৮৩৯ একর ভূমির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে অন্তত দশ হাজার কোটি টাকা। এত টাকা দিয়ে জায়গা বন্দোবস্তী নেয়ার বিষয়টি খুবই কঠিন। আবার এই খাস জায়গা নিয়ে বেশ কিছু মামলা মোকদ্দমাও রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ কাজ শুরু করতে গেলে আরো কিছু মামলা মোকদ্দমার সূত্রপাত হতে পারে। তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ ওদিকে না গিয়ে সরকারের কাছ থেকে জায়গাটি হুকুম দখলের মাধ্যমে নিতে চায়। এতে ভূমির মূল্য বাবদ বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারকে অর্থ পরিশোধ করবে। সরকারই সেই টাকা ভূমির মূল্য বাবদ রাখবে। কেউ কোন মামলা মোকর্দমা করলে সেই মামলার রায় হওয়ার পর উক্ত অর্থ সরকারের কাছ থেকে আদায় করবে। এই ক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের কোন দায়দেনা বা ঝামেলা থাকবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আগামী সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রিয় ভূমি বরাদ্দ কমিটির অনুমোদনের পর জেলা প্রশাসন নোটিশ করবে। পৃথক পৃথক ধারায় এসব নোটিশ করার পর সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। ওই ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নামমাত্র মূল্য কিংবা প্রকৃতমূল্যে ভূমি বরাদ্দের অনুমোদন প্রদান করবেন। প্রধানমন্ত্রীই এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন বলেও সূত্র জানিয়েছে। অবশ্য বন্দর কর্তৃপক্ষ নামমাত্র মূল্য বা প্রকৃত মূল্যে এই ভূমি নিয়ে বেটার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহী বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সর্বমোট ৯০৭ একর ভূমি কেনা বা বরাদ্দ নেয়ার পর বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্রেক ওয়াটারের মাধ্যমে টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু করবে। এটিই হবে দেশের প্রথম কোন ব্রেক ওয়াটার নির্মান কাজ। উপকুল থেকে অন্তত এক কিলোমিটার অংশ ভরাট করে সাগরের বেশ গভীরে গিয়েই জেটি নির্মাণ করতে হবে। অন্যথায় উপকুলে নির্মিত জেটিতে প্রত্যাশিত ড্রাফট পাওয়া যাবে না। ১৪/১৫ মিটার ড্রাফটের জন্য বেশ গভীর পর্যন্ত সাগর ভরাট করতে হবে। এই ভরাট প্রক্রিয়ায় শত শত কোটি টাকার ভূমি রিক্লেইম হবে। বে টার্মিনালের এলাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে আড়াই হাজার একরে। চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম চলে কেবলমাত্র সাড়ে চারশ’ একর ভূমিতে। এতে করে বিদ্যমান বন্দরের পাঁচ গুণেরও বেশি বড় এলাকায় বে টার্মিনালের কার্যক্রম চলবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরই বেটার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রমে নতুন গতিশীলতা তৈরি হবে। ইতোমধ্যে সিংগাপুর পোর্ট অথরিটি, দুবাই পোর্ট ওয়ার্ল্ড, ভারতের এপিএম টার্মিনালস (ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড) এবং সাংহাই পোর্টসহ শহরের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান চায়না মার্চেন্ট বে টার্মিনাল নির্মাণের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকার উক্ত চারটি কোম্পানি কিংবা নতুন আরো কেউ প্রস্তাব দিলে সেগুলো যাচাই বাছাই এবং আনুষাঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে কিভাবে বে-টার্মিনাল নির্মাণ বা কিভাবে এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে সেই সিদ্ধান্ত নেবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেছেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। ব্যক্তি মালিকানা থেকে যেই ৬৮ একর ভূমি আমরা নিয়েছি তাতে বহু কাজই চলছে। আমরা ইতোমধ্যে ড্রেজারও লাগিয়েছি। বাকি ভূমি পেলে পুরোদমে কাজ শুরু করা হবে। তিনি আগামী সপ্তাহে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের কথা স্বীকার করে বলেন, মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকের পর আমাদের খাস জমির বিষয়টিও নিশ্চিত হয়ে যাবে। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। ভূমিমন্ত্রীও খাস জমি বরাদ্দের ব্যাপারটি নিয়ে খুবই সচেষ্ট। এতে করে আমাদের বেটার্মিনালের ভূমির সমস্যার সমাধান সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বে টার্মিনালের দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৬০০ মিটার উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, বে টার্মিনালে ১২ মিটার ড্রাফটের এবং যে কোন ল্যান্থের জাহাজ অনায়াসে ভিড়ানো যাবে। বে টার্মিনালে গড়ে পাঁচ হাজার টিইইউএস কন্টেনারবাহী একই সাথে ৩৫টি পর্যন্ত জাহাজ বার্থিং দেয়ার সুযোগ থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দরে দুই দফা জোয়ারের সময় মাত্র ঘন্টা চারেক জাহাজ হ্যান্ডলিং করা যায়, বে টার্মিনালে রাতে দিনে চব্বিশ ঘন্টায় যখন তখন জাহাজ ভিড়ানো যাবে। বিদ্যামান চট্টগ্রাম বন্দরের বহুমুখী সীমাবদ্ধতা বে টার্মিনালে থাকবে না বলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।

x