৩৪ বছর পর বাংলাদেশি বিমানের এত বড় দুর্ঘটনা

সবুর শুভ ও মোরশেদ তালুকদার

মঙ্গলবার , ১৩ মার্চ, ২০১৮ at ৪:০০ পূর্বাহ্ণ
601

বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটায় বাণিজ্যিক বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ বছর ছিল ২০১৭ সাল। যা স্বস্তি এনেছিল বিমান যাত্রীদের মনে। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম আড়াই মাসেই ৩৬৩ ছোটবড় বিমান দুর্ঘটনা ঘটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। সর্বশেষ গতকাল নেপালের কাঠমন্ডুতে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশের ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান। চলতি বছরে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় ‘অনিরাপদ যাত্রা’ নিয়ে নতুন করে আতংক তৈরি হয় যাত্রীদের মনে।

এদিকে গতকাল ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের বেশিরভাগ বাংলাদেশি। এর আগে বিমান দুর্ঘটনায় একসঙ্গে এত বাংলাদেশের প্রাণহানি ঘটেছিল ৩৪ বছর আগে ১৯৮৪ সালে। ওই বছরের ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফকার এফ২৭ (ফ্লাইট নাম্বার এস২ এবিজে) তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অদূরে বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারান ৪৯ জন। নিহত যাত্রীদের মধ্যে ৪৩ জন ছিল বাংলাদেশি। ডাচ পরামর্শক সংস্থা ‘টু ৭০’ ও এ্যাভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক (এএসএন) বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ্যভিয়েশন সেফটি নেটওয়ার্ক (এএসএন)বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনার তথ্য সরবরাহ করে তাদের নিজস্ব ওয়েব সাইটে। দৈনিক আজাদীর এই প্রতিবেদনটিতে উত্থাপিত তথ্যগুলো ওই ওয়েব সাইট থেকে সংগ্রহকৃত।

এএসএন’ তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের ১২ দিনে ৮০টি ছোট বড় বিমান দুর্ঘটনা (সামরিকসহ) ঘটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এতে প্রাণ হারায় ৭৫ জন (গতকালকের দুর্ঘটনায় নিহতরা ব্যতীত)। কাঠমন্ডুর দুর্ঘটনার আগে চলতি মাসের বড় বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল গত ৬ মার্চ সিরিয়ায়। দুর্ঘটনার শিকার বিমানটি ছিল রাশিয়ার সামরিক পরিবহন বিমান দ্য এএন ২৬। এতে প্রাণ হারান ৩৯ জন। সিরিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চল লাতাকিয়ায় রুশ বিমান ঘাঁটি হামেয়মিমে অবতরণের সময় এই দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

এসএসএন এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ছোটবড় ১৯৪টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটে (সামরিকসহ)। এতে প্রাণ হারান ১৯০ জন। ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটে রাশিয়ায়। গত ১১ ফেব্রুয়ারি এ বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল রাশিয়া ও কাজাকিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন অরস্কে। এতে প্রাণ হারান ৭১ জন। রাশিয়ার সারাতোভ এয়ারলাইন্সের বিমানটি ওই দিন সকালে অরস্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানেও বড় ধরনের বিমান দুর্র্ঘটনায় প্রাণ হারান ৬৬ জন। ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীবাহী বিমানটি জাগরোস পাহাড়ি অঞ্চলে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এএসএন এর তথ্য অনুয়ায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিমান দুর্ঘটনা ৮৯টি। এতে প্রাণ হারান ৯৬ জন।

বাংলাদেশের যত বিমান দুর্ঘটনা :

২০১৫ সালের ৯ মার্চ কক্সবাজারে একটি কার্গো বিমান বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটহ ৩ জন মারা যান। একই বছরের ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে সিলেট বিমানবন্দরের রানওয়েতে দুবাই থেকে আসা একটি বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে কেউ হতাহত হন নি। বিজি৫২ বিমানের ডানদিকের ইঞ্জিনের ভেতর পাখি ঢুকে পড়লে চারটি বেল্ট ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। ২০০৪ সালের ৮ অক্টোবর সিলেট ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরে দুর্ঘটনা ঘটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিজি৬০১। রানওয়ে ভেজা থাকার কারণে অবতরণের পর বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে খাদে পড়ে যায়।

১৯৯৭ সালের ২২ ডিসেম্বর সিলেট বিমানবন্দরে অবতরণ করার সময় কুয়াশার কারণে রানওয়ের পাদদেশ থেকে ৫ থেকে সাড়ে ৫ কিলোমিটার দূরে উমাইরগাঁও নামক স্থানের একটি ধানক্ষেতে বিধ্বস্ত হয় ফকার এফ২৮৪০০০ । এতে ১৭ জন যাত্রী অহত হন।

নিরাপদের বছর ২০১৭ :

এএসএন এর তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বাণিজ্যিক বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ বছর ছিল ২০১৭। কারণ ২০১৭ সালে বিশ্বজুড়ে কোথাও কোন যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটেনি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আগের চেয়ে বেশি উড়োজাহাজ তৈরি সত্ত্বেও নিরাপদেই কেটেছে ২০১৭ সাল।’ এর আগে ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬টি বড় দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল ৩০৩ জন। এএসএন এর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার সংখ্যা কমছে। ২০০৫ সালেও বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানে হাজারের বেশি মানুষ নিহত হতো।

তবে এয়ারলাইন সেফটি নেটওয়ার্ক এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মোট ১০টি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটেছে। যাতে ৭৯ জন মারা যান। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ছিল জানুয়ারি মাসে তুর্কী কার্গো বিমান। কিরগিজস্তানের একটি গ্রামে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ৩৫ জন নিহত হন।

x