২৪২৫ কোটি টাকার বাজেট চসিকের

নির্বাচনের বছর হওয়ায় বাস্তবায়ন সম্ভব : মেয়র, নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা, অনুদান খাতে আয়ের লক্ষ্য ১৬৮০ কোটি টাকা, নিজস্ব প্রাপ্তি ৬৯৪ কোটি টাকা

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:০০ পূর্বাহ্ণ
189

নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রেখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ২০১৮২০১৯ অর্থ বছরের জন্য ২ হাজার ৪শ’ ২৫ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগর ভবনের কে বি আবদুচ ছাত্তার মিলনায়তনে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এ বাজেট ঘোষণা করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন খাতে ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সিটি কর্পোরেশনকে স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথা প্রায় বলেন মেয়র। কিন্তু গতকাল ঘোষিত বাজেটে তার প্রতিফলন ছিল না। কারণ, এবারের বাজেটে আয়ের সর্বোচ্চ খাত ধরা হয়েছে ‘উন্নয়ন অনুদান’। ওই হিসেবে বলা যায়, এবারের বাজেটও অনুদান নির্ভর। বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে অনুদান খাতে আয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা। পাশাপাশি নিজস্ব প্রাপ্তিতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯৪ কোটি ৯২ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

গত ২০১৭২০১৮ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল ২ হাজার ৩শ’ ২৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। গতকাল গত অর্থ বছরের ৮শ’ ৮৩ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও ঘোষণা করা হয়। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী গত অর্থ বছরে নগর উন্নয়নে ব্যয় হয়েছিল ৪৫০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এবারের বাজেট অনুদান নির্ভর হলেও তা বাস্তবায়নের ব্যাপারে আশাবাদী মেয়র। তিনি মনে করেন, ‘নির্বাচনের বছর’ হওয়ায় বেশি অর্থ ছাড় হতে পারে এবং এতে ভর করে বাজেটের ‘সিংহভাগ’ বাস্তবায়ন সম্ভব। ঘোষিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরবাসীর আশাআকাঙ্খার প্রতিফলনের পাশাপাশি ও চট্টগ্রাম মহানগরকে পরিবেশগত, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাসযোগ্য নান্দনিক নগর প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন মেয়র।

বাজেট ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, ‘বাজেট যেকোনো প্রতিষ্ঠানের আয়ব্যয়ের বার্ষিক খতিয়ানই শুধু নয়, তা আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আশাপ্রত্যাশার প্রতিচ্ছবিও বটে। যার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার সকল বর্তমান কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং ভবিষ্যতের কাঙ্খিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করতে চাই, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় নগরবাসীর সুখস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আমার নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ উন্নয়নপ্রচেষ্টায় নগরবাসীও সিটি কর্পোরেশনকে সাহায্যসহযোগিতা ও নাগরিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মেয়র।

বাজেটের আয় খাত সমূহ :

চসিকের গত অর্থ বছরের (২০১৭২০১৮) বাজেট ছিল অনুদান নির্ভর। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটও সেই অনুদান নির্ভরশীল। অর্থাৎ বাজেটে আয়ের প্রধান খাত ধরা হয়েছে উন্নয়ন অনুদান। এর আগে ২০১৬২০১৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুদান নির্ভর ছিল না। নিজস্ব উৎসে প্রাপ্তিকেই সর্বোচ্চ আয় খাত ধরা হয়েছিল।

এবার (২০১৮২০১৯ অর্থ বছর) প্রস্তাবিত বাজেটে ত্রাণ ও উন্নয়ন অনুদান খাতে সর্বোচ্চ আয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৬৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা। যার পুরোটাই বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে সরকার এবং বিভিন্ন বিদেশি উন্ন্নয়ন সংস্থা থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আছে থোক বরাদ্দের প্রত্যাশাও। এ বছর ত্রাণ খাতে ২০ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন অনুদান খাতে ১ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। গতবার (২০১৭২০১৮) এই দুই খাতে ১২শ’ ৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী আয় হয়েছে ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। যার পুরোটাই এসেছে উন্নয়ন অনুদান খাত থেকে। ত্রাণ খাতে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে একটাকাও আয় হয় নি।

পূর্বের ধারাবাহিকতায় এবারের বাজেটেও ১২টি আয় খাত দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব উৎসের ৯টি খাতের বিপরীতে আয় ধরা হয়েছে ৬৯৪ কোটি ৯২ লাখ ৮২ হাজার টাকা। গত অর্থবছর এসব খাতে আয় হয়েছিল ৪শ’ কোটি ২৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এবারের বাজেটে নিজস্ব উৎসের যে ৯টি আয় খাত ধরা হয়েছে এর মধ্যে তিন ধরনের কর বাবদ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪৬৮ কোটি ৪৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এর মধ্যে বকেয়া কর ও অভিকর থেকে ১৯১ কোটি ৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, হাল ও অভিকর ১৪৪ কোটি টাকা ৩৪ লাখ ৪১ হাজার টাকা ও অন্যান্য কর থেকে ১৩৩ কোটি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় ধরা হয়েছে।

সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী গত অর্থ বছরে বকেয়া কর ও অভিকর বাবদ ৪৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, হাল কর ও অভিকর বাবদ ৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ও অন্যান্য করাদি বাবদ ১১০ কোটি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা আয় হয়েছিল।

অন্যান্য আয় খাতগুলোর মধ্যে ফিস আদায় বাবদ ৯৯ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকা, জরিমানা বাবদ ৫০ লাখ টাকা, সম্পদ হতে অর্জিত ভাড়া ও আয় ৭৩ কেটি ১০ লাখ টাকা, সুদ বাবদ ৫ কোটি টাকা, বিবিধ আয় থেকে ২৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং ভর্তুকি খাতে আয় ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আয় ধরা হয়েছে। গত অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটে ফিস বাবদ আয় দেখানো হয় ৮০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এছাড়া জরিমানা ২০ লাখ টাকা, সম্পদ হতে অর্জিত ভাড়া খাতে ৪৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা, সুদ বাবদ ১ কোটি টাকা, বিবিধ খাতে ১১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং ভুতর্কি ১৯ কোটি ৫ লাখ টাকা আয় হয়েছিল।

বাজেটের ব্যয় খাত সমূহ :

গতকাল ঘোষিত বাজেটে নগর উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ১১টি উন্নয়ন প্রকল্প এবং রাজস্ব তহবিলের ২৫টি খাতে এসব উন্নয়ন করা হবে। এর মধ্যে এডিপি ও জাইকার প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিপরীতে ১ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা এবং রাজস্ব তহবিলের বিপরীতে ১৯৩ কোটি টাকা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী গত অর্থ বছরে (২০১৭২০১৮) নগর উন্নয়নের দুটো খাতে ব্যয় হয়েছিল ৪৫০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এবারের বাজেটে প্রস্তাবিত নগর উন্নয়ন ব্যয় খাতগুলোর মধ্যে জলাবদ্ধতা দূরীকরণে খাল, নাল, ছড়া খনন, সড়ক বাতির উন্নয়ন, বস্তি উন্নয়ন, সেতু ও কালভার্ট স্থাপন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বহাদ্দারহাট বারৈপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন, নগর ভবন নির্মাণ, যাত্রী ছাউনি নির্মাণ, সুইমিং পুল নির্মাণ, স্টেডিয়াম নির্মাণ ও পরিচ্ছন্ন কর্মীদের জন্য বাসভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে।

নগর উন্নয়নের বাইরে কর্পোরেশনের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৫৪২ কোটি ৮৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। গত অর্থ বছরে ১৫ খাতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ব্যয় হয়েছিল ৩৪৩ কোটি ৯৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

ব্যয়ের অন্যান্য খাতগুলোর মধ্যে বেতন, ভাতা ও পারিশ্রমিক খাতে ২৭২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৬৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, ভাড়া, কর ও অভিকর খাতে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পানি খাতে ৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, কল্যাণমূলক ব্যয় ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ডাক, তার ও দূরালাপনী খাতে ১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, আতিথেয়তা ও উৎসব খাতে ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, বীমা খাতে ৪৫ লাখ টাকা, ভ্রমণ ও যাতায়াত খাতে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা খাতে ৬ কোটি ১০ লাখ টাকা, মুদ্রণ ও মনিহারি খাতে ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ফিস, বৃত্তি ও পেশাগত ব্যয় ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণ ব্যয় ৭২ লাখ টাকা, বিবিধ ব্যয় ১৮ কোটি ৩৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, ভান্ডার খাতে ৭৪ কোটি টাকা, ত্রাণ ব্যয় ২০ লাখ টাকা, বকেয়া দেনা পরিশোধ ১৭৩ কোটি টাকা ২০ লাখ টাকা, স্থায়ী সম্পদ খাতে ১২১ কোটি টাকা ৫০ লাখ টাকা ও অন্যন্য খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

গতকালের বাজেট অধিবেশনে মেয়রের পক্ষে আয়ব্যয় হিসাব উপস্থাপন করেন অর্থ সংস্থাপন বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর শফিউল আলম। উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা, সচিব আবুল হোসেন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা নাজিয়া শিরিন, প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুদ্দিনসহ চসিকের কাউন্সিলরবৃন্দ।

x