২৩ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচন

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত, বাছাই ২২ নভেম্বর, প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ নভেম্বর।।ইভিএম অল্প কেন্দ্রে, ভোটে সেনা এবারও আগের মতোই।।মতানৈক্য মিটিয়ে ভোটে আসুন :সিইসি

আজাদী ডেস্ক

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
128

আগামী ২৩ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের দিন রেখে একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী এই নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত, তা বাছাই হবে ২২ নভেম্বর, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ নভেম্বর। তার ২৩ দিন পর হবে ভোটগ্রহণ। ৩০০টি আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচনে এবার ভোট দেবেন ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০ ভোটার। নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরে মতানৈক্যের অবসান না ঘটার মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তফসিল ঘোষণা করেন সিইসি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তফসিল ঘোষণা পেছানোর উপায় ছিল না বললেও নূরুল হুদা ইতোপূর্বে বলেছিলেন, সব দল চাইলে সংবিধান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে থেকে কমিশন ভোটগ্রহণের সময়সূচি কয়েকদিন পেছানোর কথা ভাবতে পারে। খবর বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।
তফসিল ঘোষণার ভাষণে সিইসি আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে নিজেদের মতানৈক্যের অবসান আলোচনার মাধ্যমে ঘটাতে দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপটে একাদশ সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে আসছেন সিইসি। তফসিল ঘোষণার ঠিক আগে মতবিভেদ কাটাতে দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরে সংলাপ হলেও তাতে এখনও কোনো সমঝোতা হয়নি।
বিএনপিকে নিয়ে গঠিত কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে, সংসদ ভেঙে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছে। অন্যদিকে সংবিধানের বাইরে কোনোভাবেই যেতে নারাজ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দুই দফা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর ফের আলোচনার আশা রেখে তফসিল পেছানোর আহ্বান ছিল ঐক্যফ্রন্টের; কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন পাওয়ার পর তফসিল ঘোষণার পথেই হাঁটে ইসি। তফসিল ঘোষণা করে বিরোধী শিবিরকে আশ্বস্ত করে সিইসি বলেছেন, নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ইসি সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশপাশি আগের মতো সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা। সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেন, নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৭ লাখ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকায় নির্বাহী এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে ৬ লক্ষাধিক পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যকে নির্বাচনের আগে ও পরে মোতায়েন করা হবে।
সিইসি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হবে। তারা আইনানুগ ও নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে সুদৃঢ় থাকবে। তাদের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও একাগ্রতার ওপর বিশেষ দৃষ্টি রাখা হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে ঘোষিত নির্বাচনে শহরাঞ্চলের কিছু কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। তিনি বলেছেন, ‘শহরগুলোর সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা থেকে দ্বৈবচয়ন প্রক্রিয়ায় বেছে নেওয়া অল্প কয়েকটিতে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হবে।’ আসন্ন নির্বাচনে ৩০০টি আসনে সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্র ৪০ হাজার ১৯৯টি। এর মধ্যে কতটিতে ইভিএম ব্যবহার হবে, তা স্পষ্ট হয়নি সিইসির ভাষণে। এই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকলেও ঘোর বিরোধিতা ছিল বিএনপিসহ তার মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর। তাদের দাবি, এতে ‘ডিজিটাল কারচুপি’ হবে। এই অবস্থায় এই নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার আহ্বান ছিল আওয়ামী লীগের মিত্র দল জাতীয় পার্টিরও। ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে সিইসি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, ইভিএম ব্যবহার করা গেলে নির্বাচনের গুণগত মান উন্নত হবে এবং সময়, অর্থ ও শ্রমের সাশ্রয় হবে। জেলা এবং অঞ্চল পর্যায়ে প্রদর্শনীর মাধ্যমে ইভিএমের উপকারিতা সম্পর্কে ভোটারগণকে অবহিত করা হয়েছে। ইভিএম ব্যবহারে তাদের মধ্যে উৎসাহব্যঞ্জক আগ্রহ দেখা গিয়েছে।’
এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ ভোট গ্রহণে ইভিএম ব্যবহার ‘সফল হয়েছে’ বলে ভাষণে উল্লেখ করেন নূরুল হুদা। আট বছর ধরে স্থানীয় নির্বাচনে ব্যালট পেপারের পাশাপাশি যন্ত্রে ভোটগ্রহণ চালু হলেও সংসদ নির্বাচনে এবারই তা প্রথম ব্যবহার হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের জন্য নির্বাচনী আইন সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। নানা বিতর্কের মধ্যে সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে সেই আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু ততদিনে সংসদ অধিবেশন শেষ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন কার্যকর করা হয়। এতে খোলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পথ। এবার সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমার সুযোগও রাখা রয়েছে।
ইভিএম ও অনলাইনের বিষয়টি যুক্ত করে সংশোধিত নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও ইভিএম বিধিমালাও ইতোপূর্বে জারি করে ইসি। ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে; সেবার স্বল্প পরিসরে যন্ত্রে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএম ২০১৫ সালের এসে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ডিজিটাইজড সুবিধা সম্বলিত নতুন ইভিএম তৈরি করে ইসি, যা ২০১৬ সালে রংপুর সিটি নির্বাচনে ব্যবহার হয়। তার দুই বছরের মাথায় সংসদে নতুন প্রযুক্তিটি চালু হচ্ছে। সংশোধিত নির্বাচনী আইনে ইভিএমের ‘অপব্যবহার’ করলে সর্বনিম্ন তিন বছর এবং সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ চলার মধ্যে গত কয়েকদিনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিজেদের বৈঠকের প্রেক্ষাপটে সিইসি বলেছেন, সার্বিকভাবে দেশে ভোটের অনুকূল আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
সহিংসতা ও বর্জনের মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন প্রতিহিংসা ও সহিংসতায় পরিণত না হয়, সে দিকে দৃষ্টি দিতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন নূরুল হুদা।
ভোটার ও প্রার্থীদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, জাতির এমন উচ্ছ্বসিত প্রস্তুতির মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আমি প্রত্যাশা করবো, অনুরোধ করবো এবং দাবি করবো; প্রার্থী এবং তাঁর সমর্থক নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি মেনে চলবেন। স্ব-স্ব এলাকার গণ্য-মান্য ব্যক্তি এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি ভোট কেন্দ্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতকরণে সহায়তা করবেন। ফলাফলের তালিকা হাতে না নিয়ে পোলিং এজেন্টরা কেন্দ্র ত্যাগ করবেন না।
‘নির্বাচনী কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনে অটল থাকবেন। নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটরা আইনের প্রয়োগ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ভোটার, প্রার্থী এবং ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। গণমাধ্যম কর্মী বস্তুুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশ ও পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা মেনে দায়িত্ব পালন করবেন,’ প্রত্যাশা করেন সিইসি।

x