২০ মে থেকে সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ

নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ : মৎস্য প্রতিমন্ত্রী

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ১৭ মে, ২০১৯ at ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ
123


সাগরে আগামী ২০ মে সোমবার থেকে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার কঠোর নির্দেশনা দিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খাঁন খসরু বলেছেন, সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সদস্যরা কঠোর আইন ও বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হবে। এ সময়কালে কষ্ট হলেও মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান। গতকাল সকাল ১১টায় সার্কিট হাউজে সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন। সকল প্রকার মৎস্য নৌযান কর্তৃক মৎস্য ও ক্রাস্টাশিয়ান্স আহরণ বন্ধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন বিষয়ক ওই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর চট্টগ্রাম।
সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। বাণিজ্যিক ট্রলারের পাশাপাশি সব ধরনের নৌযানের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। ৬৫ দিনের এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘মাছ আহরণের ছুটি’ হিসেব ভাবতে মৎস্যজীবীদের প্রতি আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি এর সুফল হিসেবে প্রজনন মৌসুমের পর জেলেরা বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গোপসাগরে সকল প্রকার মৎস্য নৌযান কর্তৃক মৎস্য ও ক্রাস্টাশিয়ান্স আহরণ বন্ধের আগাম বার্তা আপনাদেরকে দিয়েছিলাম। এবারও এসে বলছি। কষ্ট হলেও এ সময়ে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকুন।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ও ক্রাস্টাশিয়ান্স (কঠিন আবরণযুক্ত জলজ প্রাণী, কাঁকড়া) এর নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং মাছের মজুদ সংরক্ষণ সুষ্ঠু ও সহনশীল আহরণ নিশ্চিত করার স্বার্থেই ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর এ সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে।
আগামী বছর থেকে মাছ ধরা বন্ধ থাকার সময়ে এ অঞ্চলে মৎসজীবীদের প্রণোদনা ও খাদ্য উপকরণ দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ বছর ইলিশের প্রজনন মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে ৪৮ হাজার খাদ্য উপকরণের প্যাকেট দেওয়া হয়েছে জেলেদের মধ্যে। আমরা চেষ্টা করছি আগামীতে আপনাদের ছাগল, ভেড়াসহ বিভিন্ন সহায়ক উপকরণ দেব। যাতে আপনাদের মাছ ধরার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর থাকতে না হয়।
আশরাফ আলী খান খসরু বলেন, সব দেশেই কিছু সময় মৎস্য আহরণ বন্ধ থাকে। চীন সাগরে ২০ বছর যাবত ১৬ মে থেকে ১ অগাস্ট মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। ভারতে উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় ২০০০ সাল থেকে ৪৫-৬০ দিন বন্ধ থাকে।
সভায় মৎস্য প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নদীভিত্তিক মাছ কখনও একই সময়ে পোনা ছাড়ে না। সেই বিষয়টাও মনে রাখতে হবে। তাই পোনা ছাড়ার কথা হিসেব করেই মাছ ধরতে হবে এবং মাছগুলোকে বড় হতে দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
আশরাফ আলী খাঁন বলেন, আপনারা যে জাল দিয়ে মাছ ধরেন, সেই জাল দিয়ে ছোট মাছও উঠে আসে। এতে করে ছোট মাছগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। তিনি বলেন, মাছ বড় হওয়ার জন্য সুযোগ দিতে হবে। মাছ যদি ডিম ছাড়তে না পারে, বাচ্চা ছাড়তে না পারে, তাহলে মাছের বিস্তার হবে না। এতে করে আপনাদেরই সমস্যা হবে, দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন মৎস্য হবে আমাদের দ্বিতীয় রপ্তানি। তাই এ পর্যায়ে রপ্তানি উন্নীত করলে হলে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ মানতে হবে।
তিনি বলেন, জলদস্যুতা আগের মতো নেই, অনেকটা কমে গেছে। আইন প্রয়োগ করার পর ছিনতাইয়ের ঘটনাও কমেছে। কিছুটা নিয়ম নীতির মাধ্যমে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমি এই অঞ্চলে সরকারের প্রতিনিধি। তাই জেলেরা, ট্রলার মালিকরা আমার কাছে দাবি নিয়ে আসে। প্রতিমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, তাদের দিকটা একটু ভেবে দেখবেন। তারা দরিদ্র। মাছ আহরণ করতে না পারলে অভাবে থাকবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, সবার সমস্যা এক নয়, একেক জনের সমস্যা একেক রকম। এ পেশার উপর যারা নির্ভরশীল তাদের বিষয়টাও দেখতে হবে।
মেয়র বলেন, জেলেরা যে পরিমাণ মাছ পাওয়ার প্রত্যাশা করে সেই পরিমাণ মাছ তারা পাচ্ছে না। তাদের প্রস্তাবনাটাও অস্বীকার করার মত নয়। সবকিছু ভেবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থা না করলে তাদেরকে না খেয়ে থাকতে হবে। তাদেরকে অন্তত কোনো অনুদান দিতে হবে যাতে কোনো রকম খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে।
মৎস্য সম্পদ বাঁচাতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে জানিয়ে এ সম্পদ রক্ষায় জেলেদের এগিয়ে আসা উচিত বলে মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন।
মৎস্য সম্পদ গবেষক সাইদুর রহমান বলেন, আমি ১৬ জন দেশি-বিদেশি গবেষকসহ মাছের প্রজনন, জেলেদের জীবন-জীবিকা তিন বছর ধরে গবেষণা করে দেখেছি, সরকার ঘোষিত ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এক সময় ধারণা ছিল, সমুদ্রের মাছ কখনো শেষ হয় না। সে অবস্থা বদলে গেছে। আপনারা যদি সারাবছর মাছ ধরেন তাহলে সমুদ্রে মাছ থাকবে না। অনেক মাছের প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। অনেক প্রজাতি ধ্বংসের মুখে। ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ না রাখলে মৎস সম্পদ রক্ষা করা যাবে না। আমরা ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধকে বন্ধ হিসেবে না দেখে ছুটি হিসেবে দেখব।
সভায় মৎস্য কর্মকর্তারা বলেন, সমুদ্রের মৎস্য সম্পদ সহনশীল পর্যায়ে আহরণ না করলে এমন একটা সময় আসবে, যখন সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। ক্রমান্বয়ে দেখা যাবে, তখন আমাদের সমুদ্রও গাফ অব থাইল্যান্ড-উত্তর সাগরের মতো মৎস্য শূন্য হবে। ফলে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণে নিয়োজিত সংস্থা বা ব্যক্তির পাশাপাশি অতি দরিদ্র মৎস্যজীবীদের একমাত্র পেশা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।
জেলে ও ট্রলার মালিক সমিতির নেতারা বলেন, ফিশিং বোট বন্ধ করা ঠিক নয়। আমরা যে জালে বড় মাছ ধরি তা দিয়ে ছোট মাছ ধরা পড়ে না। সুতরাং এতে সমস্যা হওার কথা নয়। তাদের দাবি, হঠাৎ করে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় জেলেদের পরিবারে কান্নার রোল বইছে। ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধের ফলে জেলেরা বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়লে তা কারো জন্য ভালো হবে না। জেলেরা আন্দোলনে নামলে সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। পেটে ক্ষুধা থাকলে আইন মানে না। আমরা অশিক্ষিত হতে পারি, কিন্তু অকৃতজ্ঞ নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলদস্যু আক্রমণের কারণে জেলেদের সলিল সমাধি হয়। তারা জীবনের ঝঁকি নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। রমজান ও ঈদের সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করার ফলে তাদের মানবতার জীবন যাপন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব মো. রইছ উল আলম মন্ডলের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চেম্বার সভাপতি মাহাবুবুল আলম, মেরিন ফিশারিজ অ্যাকাডেমির ক্যাপ্টেন মাসুক প্রমুখ।

x