২০১৭ : অর্থনীতির সাফল্য ম্লান চালের বাজারে

শুক্রবার , ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ
137

অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে উন্নতির ধারা বজায় থাকলেও লাগামহীন চালের বাজার আর ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলার কারণে বিদায়ী বছরে রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশের পুরো সুযোগ নিতে পারেনি বাংলাদেশের অর্থনীতি।

৪৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠেছে; রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধিতেই রয়েছে দেশের অর্থনীতি। তবে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল আগাম বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় ফসলের ক্ষতির কারণে খাদ্য ঘাটতি মেটাতে আমদানি ব্যাপক বেড়ে যাওয়া, প্রধান খাদ্যপণ্য চালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের সঙ্কটে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।

ভোটের বছরে রাজনীতিতে ফের অস্থিরতা দেখা দেয় কি না; আবারও হরতালঅবরোধ জ্বালাওপোড়াওয়ের কবলে পড়তে হয় কি না, সে শঙ্কা নিয়েই ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, আমার বিবেচনায় মোটা দাগে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো। টানা দুই বছর ৭ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়সহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলা, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর কাজ এগিয়ে চলা, সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। বিদুৎ উৎপাদন বেড়েছে; গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতেও অনেক কাজ হয়েছে। এসবই আমাদের আশান্বিত করেছে। তাই বলা যায়, ২০১৭ ভালোই গেল। ২০১৮ সালে আরও দ্বিগুণ গতিতে অগ্রসর হব।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সার্বিকভাবে ভালোই গেছে ২০১৭ সাল। তবে চালের বাড়তি দাম গরিব মানুষসহ মধ্যবিত্তকেও বেশ দুর্ভোগে ফেলেছে। এক্ষেত্রে সরকারের ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা ছিল।

নতুন উচ্চতায় প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, রাজস্ব আয় : মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি দিয়েই মূলত দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের অর্থনীতিকে পরিমাপ করা হয়। দেশের উন্নতি বা উন্নতি বা অবনতি এই সূচক দিয়েই নিরূপণ করা হয়ে থাকে। গত ১৪ নভেম্বর বাংলাদেশ পরিসখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত যে হিসাব প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ২০১৬১৭ অর্থবছরে দেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এই প্রথম এত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হল, যা ছিল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।

তবে ফরাসউদ্দিনের মতে, এই প্রবৃদ্ধির সুফল সব মানুষ সমানভাবে পাচ্ছে না। সমাজে বৈষম্য বেড়েছে। এ সব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার জুন মাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে তিন হাজার ৩০০ কোটি (৩৩ বিলিয়ন) ডলার ছাড়ায়।

২০১৬১৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডএনবিআর। ওই অংক ছিল আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।

বিশৃঙ্খল ব্যাংক খাত : ২০১৬ সালের শুরুতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের রিজার্ভ থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। ফিলিপিন্স কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় দেড় কোটি ডলার বাংলাদেশ ফেরত পেলেও বাকি টাকার কোনো আশা বিদায়ী বছরেও দেখা যায়নি।

এর মধ্যে ব্যাংকিং খাতে বিশৃংখল অবস্থা ছিল বছরজুড়ে। বিশেষভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ সরকারের অনেক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। দেশে সরকারিবেসরকারিবিদেশি মিলিয়ে মোট ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে আর্থিক অবস্থার অবনতির তালিকায় রয়েছে ১৩টি। বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংক ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ধুঁকছে; বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের অবস্থাও খারাপের দিকে। এর মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে যুক্ত হয়েছে ‘পরিবর্তন আতঙ্ক’। চট্টগ্রামভিত্তিক একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে কয়েকটি ব্যাংক। সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতের উপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা আগের চেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে সংসদীয় কমিটিরও পর্যবেক্ষণ এসেছে। দেশে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণে যে দুর্বলতা আছে, সে কথা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বছরের শেষে এসে এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করে নিয়েছেন।

খেলাপি ঋণ বাড়ছেই : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিয়মনীতি না মেনে ঋণ দেওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে আর্থিক খাতে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নয় বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ সাড়ে তিন গুণ বেড়ে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি। এছাড়া হিসারে বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার খারাপ ঋণ অবলোপন ধরলে সব মিলে খেলাপি ঋণ হবে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

মূল্যস্ফীতি উর্ধ্বমুখী : ২০১৭১৮ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। বেশ কিছুদিন মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও কিন্তু বিদায়ী বছরের শেষ দিকে এসে তা বেড়ে ৬ শতাংশ অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ অক্টোবরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। আর ১২ মাসের গড় হিসেবে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

বৈদেশিক বাণিজ্য ও চলতি হিসাবে ঘাটতি : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের কম দামের কারণে গত দুই বছর সামগ্রিক আমদানিতে ধীরগতি দেখা গেলেও ২০১৭ সালের পুরো সময় ধরেই আমদানিতে বেশ চাঙ্গাভাব ছিল। দুই দফা বন্যায় উৎপাদন কমায় চাল আমদানি বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে, যা এখনো অব্যাহত আছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেল, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বেশ বেড়েছে।

গত অর্থবছরের ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের জুলাইঅক্টোবর সময়ে আমদানি ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৯ শতাংশ বেড়েছে।

x