২০১৪ সালের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তৎপর পুলিশ

চট্টগ্রামসহ সারা দেশ সক্রিয় ৪৬২ অস্ত্র ব্যবসায়ী, অভিযান শীঘ্রই

ঋত্বিক নয়ন

শনিবার , ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৪:০৩ পূর্বাহ্ণ
36

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে দেশজুড়ে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটে। এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পাঁচ বছর পর আরো একটি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাড়তি সতর্কতা পুলিশের। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধ, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য পুলিশের সব ইউনিট প্রধানকে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশের সদর দফতর। নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্র ঠেকাতে মাদক বিরোধী অভিযানের পাশাপাশি অচিরেই শুরু হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র বিরোধী বিশেষ অভিযান।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকেন্দ্রিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাড়াতে হবে পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা। সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গণমাধ্যমকে বলেছেন, পৃথিবীর যে দেশে মাদকের উত্থান হয়েছে, সেখানেই অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। সন্ত্রাসীরা অপরাধমূলক নানা কর্মকাণ্ডে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। আমাদের র‌্যাবপুলিশ বিভিন্ন সময় এসব অস্ত্রধারীকে আইনের আওতায় আনছে। জঙ্গিবাদ দমনে আমরা সফল হয়েছি। তেমনি মাদক ও অবৈধ অস্ত্র বন্ধেও সফল হব।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচনের আগেপরে দেশজুড়ে শুরু হয় সহিংস তাণ্ডব। পেট্রোল বোমার আগুনে পুড়ে মারা যান ৭৭ জন। দগ্ধ হন ৩৫০ জন। এছাড়া হরতালঅবরোধের সহিংসতায় আহত হন দেড় হাজার মানুষ।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন এলে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ে। জঙ্গিরাও মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। শুধু তাই নয়, প্রগতিশীল এবং সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করতে পারে তারা। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ছড়ানো হতে পারে গুজব। এমন আশঙ্কা পুলিশের। এসব রোধে পুলিশের সব ইউনিট প্রধানকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সদর দফতর থেকে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখে কোনো কোনো গোষ্ঠী ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করতেই পারে। তবে এসব রোধে আগেই তা নস্যাৎ করার দিকে নজর দেওয়া উচিত।

নির্বাচনকে টার্গেট করে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি ঠেকাতে ‘চরম পন্থা’ গ্রহণ করতে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সিএমপি ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একাধিক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আজাদীকে বলেন, এ অভিযান হবে মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানের মতো ‘জিরো টলারেন্স’ টাইপের। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে মাদক ব্যবসায়ীগডফাদারদের মতো অবৈধ অস্ত্রধারী ও চোরাকারবারিদের তথ্য সংগ্রহ করেছে। শীঘ্রই চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ সারা দেশে একযোগে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ছিনতাই, জমি দখল ও বালু মহাল নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে তুচ্ছ ঘটনায় ধারালো অস্ত্রের পাশাপাশি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। আধিপত্য বিস্তারে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবহার বা প্রদর্শন করছে। তবে এগুলোর বেশিরভাগই ‘অরিজিনাল মেইড’ নয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ২৫টি রুট দিয়ে আসছে পিস্তলরিভলভার। আবার মিয়ানমার থেকে আসছে ভারী অস্ত্র। মহেশখালীর অস্ত্রের কারখানাগুলোও সময় সুযোগ ও চাহিদামতো তৈরি করছে আগ্নেয়াস্ত্র। মাঠ পর্যায়ে র‌্যাব পুলিশের অভিযানে মাঝেমধ্যে উদ্ধার হচ্ছে এসব অস্ত্র।

এ প্রসঙ্গে সিএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. কামরুজ্জামান আজাদীকে বলেন, ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক কর্মীসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়তই পুলিশের অভিযানে ধরা পড়ছে আগ্নেয়াস্ত্র। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এটা যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় তাই এ বিশেষ অভিযান শুরু হবে। এটা চলমান প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) মো. রেজাউল মাসুদ আজাদীকে বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান আমাদের একটি রুটিন ওয়ার্ক। রুটিন ওয়ার্কেও মাঝেমধ্যে বড় ধরনের সাফল্য আসে। নির্বাচনকেন্দ্রিক অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযানও অনেকটা রেগুলার ওয়ার্ক। মাঠপর্যায়ে কোনো ইউনিট যদি প্রয়োজন অনুভব করে, তখন সেখানে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

সূত্র বলছে, নির্বাচনে যাতে অবৈধ অস্ত্রধারীদের দৌরাত্ম্য না থাকে, তা নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্রধারী এবং অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সামাল দেওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতেও এ ব্যাপারে কড়া হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে সরকার। দেশের ৩৫ জেলায় ৪৬২ জন অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী বর্তমানে সক্রিয় থেকে চালিয়ে যাচ্ছে অপরাধ কর্মকাণ্ড। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ১৩৯ জন ‘হোয়াইট কালার ক্রিমিনাল’। এরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা। যারা মাদক ব্যবসায়ী বিশেষ করে ইয়াবা চোরাচালানে জড়িত, তাদের অনেকেই অস্ত্র ব্যবসায়ও জড়িত। নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা করতে অবৈধভাবে অস্ত্র দখলে রেখেছে তারা।

অন্যদিকে, বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হলে কিছু দিনের মধ্যেই জামিনে বের হয়ে পুনরায় আগের পেশায় ফিরে যাচ্ছে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। সমপ্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অবৈধ অস্ত্রসংক্রান্ত এমনই একটি গোপনীয় প্রতিবেদন জমা দিয়েছে একটি সংস্থা।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ৩৫ জেলায় ৪৬২ জন অস্ত্র ব্যবসায়ী সক্রিয়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৪, চট্টগ্রামে ৪৮, ঢাকায় ৩৪, বান্দরবানে ২৬, কঙবাজারে ২০, কুমিল্লায় ২০, মেহেরপুরে ১৮, নারায়ণগঞ্জে ১৩, টাঙ্গাইলে ১৪, সাতক্ষীরায় ১৪, রাজবাড়ীতে ৮, ফরিদপুরে ৪, গোপালগঞ্জে ৫, নেত্রকোনায় ১০, শেরপুরে ১৩, সিলেটে ১০, সুনামগঞ্জে ৮, হবিগঞ্জে ৮, খুলনায় ২, যশোরে ১১, নড়াইলে ৬, ঝিনাইদহে ৪, চুয়াডাঙ্গায় ১৩, কুষ্টিয়ায় ১১, রংপুরে ৪, লালমনিরহাটে ৫, দিনাজপুরে ৯, রাজশাহীতে ১২, নাটোরে ৬, নওগাঁয় ২, জয়পুরহাটে ১৫, বগুড়ায় ৪, ফেনীতে ১২, খাগড়াছড়িতে ৮ ও রাঙামাটিতে রয়েছেন ১১ জন।

অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১১২, বিএনপির ৬৫, জামায়াতের ৮, জাতীয় পার্টির ২, ইউপিডিএফের ৯, জেএসএসের ২২, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির ৭, রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় ২০০, সুবিধাবাদী ৩৭ জন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন ১৩৯ জন প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৮, বিএনপির ৪১, জামায়াতের ৪, জেএসএসের ২ ও সুবিধাবাদী ১৪ জন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারা দেশে সাড়ে ৫ হাজার অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারের বিপরীতে ২ হাজার ২০৮টি মামলা দায়ের হয়। তবে উদ্ধার বা আটকের অধিকাংশ মামলাই বিচারাধীন। সূত্র বলছে, আইনের দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলার বিচারে ধীরগতি এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিচার হচ্ছে না।

x