১৭ পাহাড়ের একটিও দখলমুক্ত হয়নি

সবুর শুভ

বৃহস্পতিবার , ১৬ মে, ২০১৯ at ৩:০০ পূর্বাহ্ণ
106

‘স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন চক্রে’ বাধা পড়ে যাচ্ছে নগরীর পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান! এ অবস্থায় সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানার ১৭ ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ পাহাড়কে অবৈধ বসতিমুক্ত করতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তরফে দেয়া আল্টিমেটামও ভেস্তে গেছে। ৭টি সরকারি সংস্থার ও ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে থাকা অবৈধ বসতি ১৫ মে’র মধ্যে উচ্ছেদ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে সাফ জানিয়েছিল জেলা প্রশাসন। গত ২৫ এপ্রিল সরকারি ও বেসরকারি সকল পক্ষকে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু গতকাল বুধবার আল্টিমেটামের শেষদিন পর্যন্ত ১৭ পাহাড়ের একটিও সম্পূর্ণ অবৈধ স্থাপনামুক্ত হয়নি। এক্ষেত্রে সরকারি চার সংস্থা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে তাদের মালিকানাধীন পাহাড়গুলো থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ করতে পারেনি।
এ বিষয়ে পাহাড়ে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গঠিত তদারকি কমিটির আহ্বায়ক পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের পরিচালক (মহানগর) মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিক জানান, আমরা কয়েকটি পাহাড়ে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। সামনে আরো চালাব। রমজানের জন্য কিছুটা দেরি হচ্ছে।
এদিকে পাহাড়ে অবৈধ বসতি গুঁড়িয়ে দিতে গত ৫ মে বাটালি হিলে ও ১৩ মে শেরশাহ বাংলাবাজার এলাকায় বড় ধরনের অভিযান চালায় জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটগণ। অভিযানগুলোতে বাধা দিয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। হাঙ্গামা হয়েছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। উল্টো রাস্তা অবরোধ করেছে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতাদেরকে এক কাতারেও দেখা গেছে।
অবৈধ বসতি উচ্ছেদ না করতে জেলা প্রশাসন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব প্রাপ্তদেরকে ‘প্রভাবশালী’ রাজনৈতিক নেতারা ফোন করে তদবির করছেন বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শক্ত বলয়ে এ উচ্ছেদ অভিযান আটকে আছে কিনা।
এদিকে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কথা উল্লেখ করে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান চৌধুরী। এ প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, পাহাড় ধংসে প্রভাবশালী ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের দুর্বৃত্তায়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী। তাই বিরাজমান সুষ্ঠু আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে যে কোন মূল্যে পাহাড় কাটা বন্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছিল প্রতিবেদনে। চট্টগ্রাম জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস, পাহাড় কর্তন ও করণীয় সম্পর্কে রূপরেখা সংবলিত ৫পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেন তৎকালীন এ জেলা প্রশাসক। ওই প্রতিবেদন থাকা তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে লোকজন অবৈধভাবে বসবাস করলেও স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব পরিবারে আছে গ্যাস বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সুবিধা। প্রতিবেদনে দেয়া তথ্যগুলোই প্রমাণিত হচ্ছে বারবার।
এদিকে সামনের বর্ষায় পাহাড় ধসে প্রাণহানির বিষয়টি মাথায় রেখে অবৈধ বসতি উচ্ছেদে তদারকি কমিটি গঠন করে অভিযান শুরু করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের পরিচালক (মহানগর) মোহাম্মদ আজাদুর রহমান মল্লিককে। আরো রয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী কমিশনাররা (ভুমি), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কাউন্সিলর, ফায়ার সার্ভিস ও সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ের মালিকরা।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মে’র মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে গড়ে উঠা অবৈধ বসতি নিজেদের উদ্যোগেই উচ্ছেদ করার কথা। এক্ষেত্রে আগে বিদ্যুৎ বিভাগ, কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম ওয়াসা ১৭ পাহাড়ে অবৈধ বসতিতে থাকা গ্যাস, পানি ও বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা। অবশ্য সংস্থাগুলোকে একাজ করতে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনীতিবিদদের বাধার মুখে পড়তে ঞয়। বিক্ষোভ দেখায় স্থানীয়রা। এ কারণে বর্তমানে কিছুটা থমকে আছে অভিযান।
এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ দেলওয়ার হোসেন বলেন, সংস্থাগুলো নিজ নিজ উদ্যোগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়। এখন তারাই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। তবে দুর্যোগের সময় কোন ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নিতে হবে। যাদের পাহাড়ে অবৈধ বসতি রয়েছে।
এ ব্যাপারে পিডিবি চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন জানান, বাটালি হিল, আকবর শাহ্‌ ও মতিঝর্ণাসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে বেশ কিছু বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি ২৮ ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে অতিঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড়েই বসবাস করছে ৮৩৫ পরিবার। নতুন করে প্রণয়ন করা চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তালিকায় উঠে আসে এ তথ্য। এর মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ১০ পাহাড়ে অবৈধভাবে বাস করছে ৫৩১ পরিবার। তাছাড়া সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন ৭ পাহাড়ে বাস করছে ৩০৪ পরিবার। বর্ষায় পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঠেকানোর অংশ হিসেবে পাহাড়ে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলা এসব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসন। তালিকাটি প্রণয়নের আগে নগরীর কাট্টলী, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারি কমিশনারকে (ভূমি) এ সংক্রান্তে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ‘পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসরতদের হালনাগাদ তালিকা’ শিরোনামে এ চিঠি দেয়া হয়।
তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করতে গত ৩ মার্চ জেলা প্রশাসন থেকে চিঠি যায় নগরীর সদর, কাট্টলী, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ ও পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারি কমিশনারের (ভূমি) কাছে। পরে ছয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ‘ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের নাম ও মালিকানা, অবৈধ বসবাসকারীর নাম, পরিবারের সদস্য সংখ্যা উল্লেখ একটি হালনাগাদ তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে জমা দেন। ওই তালিকায় অবৈধ স্থাপনার বিবরণ এবং অবৈধভাবে ভাড়া প্রদানকারীর নাম ও ঠিকানাও’ রয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, রেলওয়ের লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ২২ পরিবার, পূর্ব ফিরোজ শাহ ১নং ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ২৮ পরিবার এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মালিনাকানাধীন কৈবল্যধামস্থ বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে আছে ২৮টি পরিবার, পরিবেশ অধিদপ্তর সংলগ্ন সিটি কর্পোরেশন পাহাড়ে আছে ১০ পরিবার, রেলওয়ে, সড়ক-যোগাযোগ বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ১৬২ পরিবার, ব্যাক্তি মালিকানাধীন একে খান এন্ড কোম্পানি পাহাড়ে আছে ২৬ পরিবার, হারুন খান এর পাহাড়ে আছে ৩৩ পরিবার, খাস খতিয়ানভুক্ত পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ৪৩ পরিবার, মধুশাহ্‌ পাহাড়ে আছে ৩৪ পরিবার, ফয়েজলেক আ/এ সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ৯ পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ৩৩ পরিবার, ভিপি সম্পত্তি লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ১১ পরিবার, এম আর সিদ্দিকীর পাহাড়ে আছে ৮ পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে আছে ৩২ পরিবার, ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে আছে ১১ পরিবার, আামিন কলোনি সংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়ে আছে ১৬ পরিবার ও আকবরশাহ্‌ আ/এ সংলগ্ন পাহাড়ে আছে ২৮ পরিবার। সবমিলে উল্লেখিত ৮৩৫ পরিবার এখন প্রশাসনের মাথা ব্যথার কারণ। তাই এবার বর্ষার আগেই এ থেকে মুক্তি চায় জেলা প্রশাসন। দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়া হিসেবেই পাহাড়ের পাদদেশে বসতি গড়ে অবৈধ বসতকারীরা। এসব বসতির মালিকরা বরাবরই থেকে যায় আড়ালে। ফলে পাহাড় ধসে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে।

x