১২০ তম জন্মদিন উপলক্ষে নজরুল-স্মরণ

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৫ মে, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
48

বাঙলা সাহিত্যে বিদ্রোহ-চেতনাটি ভুঁইফোঁড় ছিল না কখনো তবে নজরুলের বিদ্রোহটি ছিল অভিনব। তাঁর বিদ্রোহ-চেতনার পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে অনাদৃত, অবহেলিত নারীর মহিমা কীর্তিত হয়েছে সরাসরি। প্রাচীন বাঙলা সাহিত্যে দেবী, মায়াবিনী বা কুহকিনী নারীর মানবী সত্তাটিই স্বীকৃত হয়নি। মধ্যযুগে নারী রাধার নামে বা বিনামে কৃষ্ণ প্রেমে পাগলিনী।
মুসলিম প্রণয়োপাখ্যানগুলিতে রক্তমাংসে, রূপলাবণ্যে নারী এসেছে এটুকুই অনেক। মধ্যযুগের উপান্ত্যে গাঁথাকাব্যে বিশেষ করে ময়মনসিংহ গীতিকায় সংসার-পাটাতনে আসীন প্রেমিকা নারীকে দেখা যায়। ঊনিশ শতকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথে নারী নানাভাবে জেগে উঠেছে। নারীর জন্য সর্বাংশে সোচ্চার হয়েছেন নজরুল। নারীর সম-অধিকার ঘোষণায় উচ্চকিত নজরুল তাঁর বিদ্রোহের পক্ষে নারীকে নানারূপে, নানাভাবে দেখেছেন। তাই বলে অকরুন বা অনুচিত রূপে বা কথায় তাঁর নারী নিগৃহীত হয়নি তা নয়। অভিমানী কবির রোমান্টিক কবিস্বভাবে তার যথোচিত ব্যাখ্যাও মেলে।
‘সাম্যবাদী’ বা ‘নারী’ কবিতায় নারীকে কবি পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম বলেননি বরং মাঝে মাঝে কবির হাতে নারীর পাল্লা ভারিই হয়েছে। কবি বলেছেন, ‘পুরুষ হৃদয়হীন/ মানুষ করিতে নারী তাহে দিল আধেক হৃদয় ঋণ’। এবং অমোঘ এক সাবধানবাণীও তিনি উচ্চারণ করেছেন পুরুষের জন্য।
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা কারাগারে ঐ পুরুষ মরিবে ভুগে।
এত পাওয়ার পরেও কিন্তু নারীর তীক্ষ্ণ মেধা ও মননে শেষ পর্যন্ত যে-সত্যটি ধরা পড়ে গেল সেটি হচ্ছে ‘নারী’ কবিতায় কবি নারীপুরুষের সাম্যের গান শোনালেও মূলত মহৎ নারীরই জয়গান গেয়েছেন, মানুষ নারীর নয়।’ (‘নজরুলের নারী ও নারী’ কবিতার ব্যক্তিগত ভিন্নপাঠ: ঝর্ণা রহমান।)
কিন্তু নজরুলের আসন অটুট রয়ে যায়। কারণ পাঠককে বিস্ময়বিদ্ধ করার জন্য নজরুলের তূণে তীরের অভাব নেই। ‘সাম্যবাদী’ ও ‘নারী’ কবিতার আগেই বাঁধনহারা উপন্যাস লিখেছেন তিনি। এ উপন্যাসে নারীর অধিকার নিয়ে প্রচুর যুক্তি রয়েছে। পত্রোপন্যাস বাঁধনহারার মাহবুবা সোফিয়াকে লিখছে, ‘খোদা আমাদের মেয়ে জাতটাকে দুঃখ কষ্ট সহ্য করতেই পাঠিয়েছেন। আমাদের হাত-পা যেন পিঠ-মোড়া করে বাঁধা, নিজে কিছু বলবার বা কইবার নেই। আছে আমাদের অদৃষ্টবাদ, সব দোষ চাপাই নন্দঘোষ রূপ অদৃষ্টের উপর। কিন্তু অদৃষ্ট বেচারা নিজেই আজতক অ-দৃষ্ট। এর জন্য দায়ী কে? পুরুষেরাই তো আমাদের মধ্যে এইসব সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামী ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
মাহবুবা নারীর স্বাধীনতা ও সম্মান অস্বীকারকারী পুুরুষকে উচ্চশিক্ষিত বলতে নারাজ। বলেন, তারা লেখাপড়া শিখেছে মাত্র। নুরুল হুদার সঙ্গে বিয়ে না হওয়ায় আর্থিক কারণে মাহবুবা এক বৃদ্ধ জমিদারকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে বা করতে বাধ্য হয়। এটা যে সামাজিক অবিচার তাও মাহবুবা স্পষ্ট করে বলেছে। স্বামীর প্রতি তার ব্যঙ্গোক্তি: ‘রাজার পাড়াগেঁয়ে সংস্করণ।’ ‘গহনা ও টাকা ছাড়া মেয়েলোক আরও কিছু চায় এই নতুন জিনিষটার সঙ্গে যখন তাঁর পরিচয় হয় আমার কৃপায় তখন এই হতভাগ্যের দুঃখ দেখে আমার মত পাষাণীর চক্ষুও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।’ অবলা নারীর মুখে নজরুল নানাভাবে যে ভাষা যুুগিয়েছেন সে ভাষা বহু যুগ-যুগান্ত সঞ্চিত নারীর অকথিত রুদ্ধ বেদনাকে মুক্তি দিয়েছে। নারীকে অধিকার সচেতন করেছে।
রাক্ষুসী গল্পে বাগদী নারী বিন্দির পক্ষ নিয়ে বিন্দির প্রগাঢ় সত্যবোধকে মূল্য দিয়ে যে গল্পটি নজরুল লিখেছেন তাতে সমাজে নারীর অধ:স্তন অবস্থান এবং অধিকারহীনতাকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো একশ বছর পরে (৯৯ বছর আগে লেখা গল্প) আজও এমন গল্পের তুলনা মেলা ভার।
স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল বিন্দির। নিজের সংসারে প্রাণান্ত পরিশ্রম বা অর্ধ্বভুক্ত থাকার কষ্ট বিন্দি উপেক্ষা করেছে হাসিমুখে। নেশাভাঙ খোর স্বামীকে সে ভালোবেসেছে কারণ ‘পুরুষ মানুষের দু’চারটে বদঅভ্যাস থাকে’। কিন্তু স্বামীর ‘ফষ্টিনষ্টির’ খবর কানে এলে বিন্দি আর বিন্দি রইল না। তার বিচারে স্বামী পাপ করেছে এবং স্বামীর পাপ সীমা ছাড়িয়ে গেল যেদিন বিন্দির অতি কষ্টের গোপন সঞ্চয় চুরি করে সে ‘স্যাঙা’ করবে বলে মনস্থির করেছে। ঈশ্বরের বিচারে এমন পাপের শাস্তি নরকবাস। স্বামীকে নরকবাস থেকে রক্ষা করার জন্য নিজেই সে তার বিচারের ভার নেয়। বিন্দি ভাবে, একটা দেবতার মতো লোক সিধা নরকে নেমে যাচ্ছে। তাকে বাঁচানোর দায়িত্ব তার স্ত্রীর। তার সত্যবোধে সে হত্যা করলে পাপ হবে তারই। স্বামীর পাপ তার ঘাড়েই বর্তাক। তার ভাষায়, ‘হ্যাঁ, হত্যাই করব যা থাকে কপালে। ভগবান, তুমি সাক্ষী রইলে, আমি আমার দেবতাকে নরকে যাবার আগে তার জানটা তোমার পায়ে জবা ফুলের মতো উচ্ছুর্গ্যু করব, তুমি তার সব পাপ খণ্ডন করে আমাকে শুধু দুঃখ আর কষ্ট দাও। আমার তাই আনন্দ’। অতপর নিজের হাতে ধারালো দায়ের কোপে স্বামীর মাথা ধড় বিচ্ছিন্ন করে সে জেলে যায়। সশ্রম কারাদণ্ডে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। কোন অনুতাপ তাকে দুর্বল করে না। নিজে শাস্তি পাচ্ছে তাতে কি! স্বামী তো স্বর্গবাসী হয়েছে। ভাগ্যক্রমে বিলেত থেকে কোন জজ সাহেবের আগমন উপলক্ষে সব কয়েদিদের সঙ্গে বিন্দিও খালাস পায়। সে যে যথার্থ কাজটিই করেছে তাতে তার আর কোন সন্দেহ থাকে না। বিন্দি বলে, ‘পুরুষেরা যাই বলুক, আমি আর আমার ভগবান এই দুই জনাতেই জানতুম, এ একটা মস্ত সোজাসুজি বিচার। আর পুরুষেরা ওরকম চেঁচাবেই, কারণ তারা দেখে আসছে যে সেই মান্ধাতার আমল থেকে শুধু মেয়েরাই কাটা পড়েছে তাদের দোষের জন্য। . . . আমি যদি ওই রকম একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে বসতুম আর যদি আমার সোয়ামী ওই জন্যে আমাকে কেটে ফেলতো, তাহলে পুুরুষেরা একটি কথাও বলত না। তাদের সঙ্গে মেয়েরাও বলত হ্যাঁ, ওরকম খারাপ মেয়ে মানুষের ওই রকমেই মরা উচিত’। . . . নারী-পুরুষ সাম্য বা সমানাধিকারের দর্শনটি নজরুল এমন সহজ সুরেই ব্যক্ত করেছেন।
প্রখর সমাজমনস্ক, সমাজ সচেতন এবং সাম্যবাদে বিশ্বাসী নজরুল তাঁর কথা সাহিত্যে নারীর মর্যাদাপূর্ণ স্বতন্ত্র অবস্থান যেমন চিহ্নিত করেছেন তেমনি স্বমহিমায় নারীকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মৃত্যুক্ষুধার মেজ বৌ ও রুবি চারিত্রিক স্বাতন্ত্র্যে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। ‘কুহেলিকা’র মতো দুর্বল উপন্যাসেও নারী আপন দৃঢ়তায় অটল। উপন্যাসের শুরুতে এবং শেষে ‘নারী কুহেলিকা’- এমন ঘোষণা সত্ত্বেও কোন নারী চরিত্রকেই ‘কুহেলিকা’ প্রতিপন্ন করা সম্ভব হয় নি। বরং ফিরদৌস বেগম, তাহমিনা ওরফে ভূণী, চম্পা বা জয়তী দেবীর মতো চরিত্ররা সকলেই প্রমাণ করেছে তারা প্রত্যেকেই নিজেদের আসনে আপন শক্তিতে ও ব্যক্তিত্বে অটল।
‘ধূমকেতু’ সম্পাদক নজরুল তাঁর অর্ধ সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’তে নারীদের জন্য ‘সন্ধ্যাপ্রদীপ’ নামে একটি বিভাগ চালু করেছিলেন। সেখানে স্বাধীন মনুষ্যসত্তার চেতনায় উজ্জীবিত, আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষায় উম্মুখ ও আত্মবিকাশের সাধনায় নিবেদিত নারীরা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিলেন। বস্তুত নানাভাবে বিশ শতকী (বিশের দশকে) রেনেসাঁয় বাঙালি মুসলমানের অংশগ্রহণের উল্লেখযোগ্য সময়টাতে নজরুলের আবির্ভাব হয়েছিল। এই রেনেসাঁসের অন্যতম চারিত্র্য লক্ষণ (নারী জাগরণ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ) পরিস্ফূটনে নজরুল যথাসাধ্য করেছেন। উপমহাদেশের নারী জাগরণে তাঁর ভূমিকা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

x