০০৭- নয়ন বন্ড’ ও আমরা

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২ জুলাই, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
79

দেশে হচ্ছেটা কী! প্রশ্নটা ছোট্ট- মাত্র তিন শব্দের। আবার ‘জানিনা’ বলে এক শব্দে উত্তর শেষ করে দাঁড়ি টেনে দেয়া যায়। আসলে এখন না জানা মানেই হচ্ছে, সব জানা! যত নিস্পৃহ থাকা যায়, নিজকে নিয়ে যত ব্যস্ত থাকা যায়, ততই ভাল। বাইরে কী, ঘটছে, কে কাকে চাপাতি বা রাম দা দিয়ে কোপাচ্ছ! কোথায় মাত্র ন’মাসের শিশুর উপর যৌন নিপীড়ন হচ্ছে, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ছাত্রী-ছাত্র বা পোষাক বালিকার সম্‌ভ্রম লুট বা যৌন নিপীড়নের প্রকাশ্য প্রদর্শনী হচ্ছে! বিদ্যালয়ের মহান শিক্ষাগুরু ২৪ ছাত্রীর ইজ্জত লুটের রেকর্ড গড়ছেন, এসব গুরুপাক বস্তু আপনার উপভোগের আগ্রহ থাকলে উপভোগ করুন প্রাণ খুলে। কিন্তু নিরাপদ অবস্থানে থেকে। খবর্দার কাছে যাবেন না, যত আড়াল ততবেশি নিরাপত্তা এবং মজাও বটে। কাছে গেছেনতো, নিজেই খবর হয়ে যাবেন। ফে বু, ইউটিউবে ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাবে আপনার। কয়েক হাজার টাকার সস্তা ইন্টারনেট টিভি এমন কী মূলধারার শত কোটি টাকার টিভি চ্যানেলেও ঘন্টায় ঘন্টায় আপনাকে দেখানো হবে। আহ্‌ কী মজা রাতারাতি আপনি জিরো থেকে হিরো! এমন এক হিরো, যাকে আড়াল দেয়ার মতো এক চিলতে ফাঁকা জমি পুরো পৃথিবীও দিতে পারবেনা।
এরপর আছে, দুর্নীতি-অনিয়ম, লুটপাটের নানা দুর্ধর্ষ কাহানী! এসব জিনিস মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে দিন। অথবা সুযোগ থাকলে মওকা বুঝে হাতিয়ে নিন। ভালমতন দাঁও মারতে পারলে আপনাকে পায় কে? সেলাম-সেলামি-ইজ্জত সবকিছু আপনার পায়ে লুঠোবে। এরপর দান-খয়রাত করুন। হাতের কিছু ময়লা মানে টাকা ঝেড়ে নিজের অনুগত সাগরেদ গ্রুপ তৈরি করুন। পাড়ার মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করুন, হাত খুলে। দেখবেন, ইমাম সাহেব বা মাদ্রাসা প্রধান আপনার উপর-নিচ চৌদ্দ প্রজন্মের গুনাহখাতা সাফাই করে দিয়ে আপনার ইহকাল-পরকালের সমৃদ্ধির মহাসড়ক একদম তকতকে- ঝকঝকে করে দিবেন। আরও তরক্কি চাইলে চামচা গ্রুপের কাঁধে চড়ে পাড়ার রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের দরবারে পদধূলি সরি জুতোর ধূলো দিন। আপনাকে কিছুটি করতে হবেনা। আপনার হয়ে ঢোল, তবলা পোষা গ্রুপ বাজিয়ে দেবে। ভুলবেন না যেন, বড় ভাইটিকে অবশ্যই সরকারি দলের বড় না হোক অন্তত মাঝারি সাইজের কেউকেটা হতে হবে। চুনোপোনায় আপনার পোষাবেনা। বিরোধী শিবির একদম বিষবৎ পরিত্যাজ্য! মনে রাখবেন, এসব আপনার বিনিয়োগ। শত টাকায় লাখ টাকার পথ খুলে যাবে। সাথে প্রভাব-প্রতিপত্তি আসবে ফাও। টাকার সাথে প্রভাব, প্রতিপত্তি মুঠোয় থাকা মানেই আপনি ‘আন অফিসিয়াল’ ভিআইপি। কেউ আপনাকে ঘাটাবেনা। কারণ ঘাটে-বেঘাটতো আপনার কব্জায়। এদেশে টাকা আর প্রভাব-প্রতিপত্তি একেবারেই সমার্থক। পৃথিবীর আর কোথাও এমন সুযোগ পাবেন না। ‘সোনার বাংলার সোনার মানুষ’ হতে চাইলে টাকাটাই আসল। টাকা কীভাবে বা কোত্থেকে নাযেল হলো, ভুলেও কেউ জানতে চাইবেনা। ভেবে দেখুন, আর কোন বিনিয়োগে এক লপ্তে এত দাঁও মারা কী সম্ভব? মোটেই না। শেয়ার মার্কেট বলুন বা অন্য কোন ব্যবসায়ে বিপুল বিনিয়োগ করেও আপনি রিস্কে থাকবেন। কেউ আপনাকে পুচবেওনা। রাজনীতি আর দাতা ও সমাজসেবি হিসাবে একবার নাম কিনতে পারলে ইচ্ছেমত সমাজ দোহন করতে পারবেন। সমাজ এবং আম জনতা হবে আপনার কামধেনু! বারোমাস চব্বিশ ঘন্টা দুধ দোহন করতেই থাকুন!
পাড়ার পর শহরের বড় বড় জলসা বা রাজনৈতিক জমায়েতে শুরুতে বিশেষ অতিথি পরে হয়ে যান প্রধান অতিথি। সুবচন উপহার দেবেন ফ্রিতে। পত্র-পত্রিকা টিভি চ্যানেল ভাসতে থাকবেন আপনি সাথে আপনার বানী। হয়ে গেল-কাজ। জানি, চাইলেও আমাকে পরামর্শক বা কনসাল্টেন্ট ফি দেবেন না! ঠিকাছে নাই দিন, অন্তত জানে-মালে মারবেন না, জনাব। জানি এতদিনে আপনি অনেক বড় পদ পদবী হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রটোকল ছাড়া চলাফেরাই করেননা। তো কোন সাহসে ফি চাইবো, জনাব। আপনি ভালো থাকুন। প্রভাবে- ক্ষমতায়-বিত্তে ফুলেফেঁপে নীল তিমি হয়ে যান। এই ফাঁকে আমি কাট মারছি, জনাব। কাছে থাকলে অতীতের আয়নায় আপনার মুখ ভেসে উঠবে। সাথে আমিও। বিব্রত হবেন-বিপদ বাড়বে আমার। খামাকা ঘাঁড়ে কোন সাধে আপদের বেচকা বইব!
কিছু সামপ্রতিক অঘটনের দিকে মনোযোগ দেয়া যাক। প্রতিদিনই মূলধারা ও সোসাল মিডিয়া চাঞ্চল্যকর খবর গিলাচ্ছে আমাদের। এগুলোর সামান্য নমুনা উপরে দেয়া হয়েছে। সব খবর ছাপিয়ে বরগুনার রিফাত হত্যাকান্ড নিয়ে বেশি স্পেস ও শ্লট খরচ করছে আমাদের গণমাধ্যম। প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে নয়ন ও রিফাত ফারাজিসহ কয়েক চিহ্নিত মাস্তান চাপাতির কোপে রিফাত শরীফকে হত্যা করলো তার স্ত্রীর সামনে। তরুণী স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা ঘাতকদের প্রতিরোধ করার প্রাণান্ত চেষ্টা করেও ব্যর্থ। এত মানুষ চারপাশ ঘিরে বলিউড ছবির মত “০০৭ গ্রুপ ও বন্ড নয়ন”দের নৃশংসতা দেখলেন। ঘটনার ভিডিও করে ভাইরাল করলেন। সারাদেশ ও মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়লো হত্যাকান্ডটি নিয়ে। ফে বুসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তোলা হচ্ছে, প্রতিবাদ- প্রতিরোধের। এখন চালু ফে বুকার এবং ঘটনার দর্শকদের কাছে বিনীত প্রশ্ন, আপনারা কী আসলে মানুষ? মানুষতো অন্যায় জুলুমের প্রতিরোধ করে। কেন করা হলো না! আশপাশে ঢিল-পাথরও কী ছিলনা! দু’ একটা লাঠি বা কাঠ, দা, ছুরি যোগাড়ও কী অসম্ভব ছিল! মেয়েটি ছাড়া একজন ছাত্রদল নেতাও প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ধারালো চাপাতিওয়ালাদের প্রতিরোধ করতে পারেননি। কয়েক শ’ দর্শকের কয়েকজন যদি সাহস করে এদের সাথে যোগ দিতেন, তাহলেতো ঘটনার মোড়ই ঘুরে যেত। ০০৭ ও বন্ড নয়নেদের জান নিয়েই টানাটানি হতো। আমরা কী মনুষ্যরূপী ভেড়া হয়ে গেছি? রিফাত দর্শকদের কারো ভাই বা ছেলে হলেও কী এতগুলো মানুষ দর্শক হয়ে থাকতেন? সামান্য চাপাতিধারী চিঁছকে নেকড়েদের প্রতিরোধ না করলে ওরাতো দ্রুত আফ্রিকার কালো চিতার মতো ভয়ঙ্কর রক্তপায়ী হয়ে উঠবে। আশপাশে ওরা মানুষ দেখবেনা, ভেড়া খরগোশই দেখবে। যখন ইচ্ছে হয়, যাকে খুশি ঘাড় মটকাবেই। শুধু আইনি সংস্থার ওপর নির্ভর করে এত ঘন জনারণ্যের দেশটির অপরাধ নির্মূল অসম্ভব। মানুষ একবার জন্মায় মরেও একবার। মরার আগে আমরা যদি শতবার ভয়ে মরি, তাহলে তথাকথিত ০০৭ বা বন্ড নয়নদের রুখবে কে? ফে বুতে ঝড় তুফান তুলে কী মানবিক দায় আড়াল করা যায়? না যায়না। আসুন, প্রতিবাদ নয়, এখন থেকে প্রতিরোধে নামি।

x