হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ

শাফিনুর শাফিন

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
7

ইটের স্তূপের পাশে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির এক ক্ষৌরকার ঠোঁটের ফাঁকে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে একজনের দাঁড়ি কামাচ্ছেন। ছাগশিশুকোলে মানবশিশু যার আড়াল-করা মুখ দেখা যাচ্ছে না কিন্তু চোখজুড়ে উজ্জ্বল হাসি ঠিক দেখা যাচ্ছে। অথবা আদিবাসী এক নারী পাইপ টানছেন কিংবা সমুদ্রের বুকে থালার মতো বড় লাল টকটকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। খ্যাতিমান আলোকচিত্রশিল্পী মউদুদুল আলমের ক্যামেরায় তোলা এমন অসংখ্য ছবি নিয়ে প্রকাশিত ফটোগ্রাফির এলবাম “হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ” বইয়ের প্রতিটা পাতা উল্টাতে উল্টাতে পাঠকের চোখে ধরা দিবে আমাদের আটপৌরে বাংলাদেশ চিরচেনা অথচ নতুন এক ভঙ্গীতে। যে কখনো বাংলাদেশ দেখেনি বা জানে না কেমন এর প্রকৃতি, সংস্কৃতি, মানুষ তাঁর চোখে এক অনন্য বাংলাদেশ ধরা দিবে আলোকচিত্রশিল্পী মউদুদুল আলমের ছবির মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে পথে প্রান্তরে সাধারণ মানুষের গল্প, তাঁদের মুখ, মুহূর্তের স্মৃতিকে ধরে রেখে বইয়ের ছবিগুলো যেন সুযোগ করে দেয় বাংলাদেশ পরিভ্রমণের। একজন ভ্রমণকারী না হলে এবং অমন সাধারণ দৃশ্যপটকে অসাধারণ করে দেখার চোখ না থাকলে ক্যামেরায় এসব গল্প তুলে আনা সহজ হতো না নিঃসন্দেহে। ক্যামেরার প্রতি ভালবাসা এলবামের শুরুতেই আলোকচিত্রী মউদুদুল আলম জানিয়ে দেন। “যেখানে আলো সেখানেই সৃষ্টি। যেখানে আলো- সেখানেই মুক্তি। আমার মৃত্যু যেন হয় কোনো এক আলোর স্ফুলিঙ্গে।’ এভাবেই ক্যামেরার প্রতি এবং আলোছায়ার প্রতি নিজের মায়া প্রকাশ করেন আলোকচিত্রশিল্পী মউদুদুল আলম। সেইসাথে এটাও পরিলক্ষিত হয় যে শিল্পীর এলবামের নাম নির্বাচন যেন তাঁর দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। শিল্পী দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে লিখেন, “তোমার দিকে তাকাতে তাকাতে আর কোনদিকেই তাকালাম না। তোমার প্রতিটি প্রান্তে আমার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। তোমার অকৃত্রিম মানুষগুলোকে আমি ভালোবাসি। তাই- ক্যামেরা দিয়েই লিখি।“ হয়ত এই কারণেই সাহিত্যিক মহীবুল আজিজ মউদুদুল আলমকে “আলোকচিত্রী অভিযাত্রী” অভিধা দিয়ে ফটোগ্রাফি এলবামের ছবিপ্রসঙ্গে বলেন, “মউদুদুল আলমের চিত্রশিল্প এই বাংলার মানুষ, জীবন ও নিসর্গের কাব্য-কথা। এগুলো আপাতদৃষ্টে টুকরো টুকরো কথা এবং এসবের আলো-ছায়ার পরতে পরতে রয়েছে কাব্যের সংবেদনা। সব মিলিয়ে মউদুদুল আলম আলো এবং ছায়ার এক সফল অনুবাদক-শিল্পী।“ এই বইটি ভাগ করা হয়েছে মূলত তিনভাগে। একভাগে শিরোনামসহ ছবি, অন্যভাগে ছবি প্রসঙ্গে মতামত বা এনালাইসিস এবং সেসবের ইংরেজি অনুবাদ মতামত দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক মহীবুল আজিজ, ইউল্যাবের মিডিয়া স্টাডিজ এন্ড জার্নালিজম বিভাগীয় প্রধান জ্যুড উইলিয়াম এবং মুন্না বি সন্‌দ্বীপি। ইংরেজি অনুবাদগুলো করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর মাইনুল হাসান চৌধুরী এবং প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রফিকুল ইসলাম। সম্ভবত এই ধরণের ফটোগ্রাফি এলবাম এই প্রথম বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির ইতিহাসে প্রকাশিত হয়েছে। এই এলবামটিকে ধরে নেয়া যায় চলন্ত চিত্রপ্রদর্শনী। ছবিগুলো বিষয়ের দিক থেকে যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি প্রতিটি ছবির শিরোনামও মনোগ্রাহী। শিরোনাম প্রকাশ করে ছবিগুলোর পেছনের গল্প যা দর্শক দেখামাত্র হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন। “হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ” নিয়ে ইউনিভার্সিটি অভ লিবারাল আর্টসের মিডিয়া স্টাডিজ এন্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান প্রফেসর জ্যুড উইলিয়াম জেনিলো বলেন, “চারবছরের উপর হলো বাংলাদেশে আছি এবং সারাদেশজুড়ে ভ্রমণ করে বেড়িয়েছি। কিন্তু এইটুকু সময়ে গণমাধ্যম এবং অন্য কোন ফটোগ্রাফারকে দেখিনি এতো চমৎকার করে বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে তুলে আনতে।“ এছাড়াও তিনি বলেন মউদুদুল আলমের আলোকচিত্রগুলো তাকে বিশ্বখ্যাত ফটোগ্রাফার অ্যান্সেল অ্যাডামসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মউদুদুল আলম এলবামের ছবিগুলো তুলতে ঘুরে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল। কখনো কখনো তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম সব এলাকায়ও গিয়েছেন। সেসব এলাকার পাহাড় থেকে তিনি সম্পূর্ণ ল্যান্ডস্কেপ নিয়েছেন অপটিক্যাল ভিউ থেকে। সেসব ছবি দেখে ভ্রম হয় যেন কোন মানুষের চোখ নয় পাখির চোখ দিয়ে শাটার টিপেছিলেন। গ্রামবাংলার কোন কৃষক কাস্তে হাতে দাঁড়িয়ে, কিংবা ধান মাড়ানো শ্রমিক, জেলের নৌকা অথবা গার্মেন্টস শ্রমিক নারীর অবিরত চলতে থাকা সেলাই মেশিন বা শুঁটকি শ্রমিক নারীর শ্রান্তক্লান্তমুখের হাসি- এমন নানাধরণের কর্মজীবী মানুষ এবং তাঁদের পরিশ্রমচিত্র ধরা পড়েছে শিল্পীর ক্যামেরায়। এসব যেন বাংলাদেশের ভৌগলিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার নিত্য রূপ। মুন্না বি সন্‌দ্বীপি এলবামের ছবিগুলো নিয়ে মতামত দিয়েছেন, “আলোকচিত্রের মাধ্যমে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়েছেন কবি মউদুদুল আলম। স্তরের পর স্তর ভেদ করে শিল্পীসুলভ আচরণে তিনি চলেন জীবনবোধের গভীর হতে গভীরতরে।“ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং নিম্নবর্গের মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে ছবিগুলোতে। শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য যে বাংলাদেশের একমাত্র সত্য নয় বরং বেশ কিছু ছবির মাধ্যমে চিরন্তন বাংলার মানুষের নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন শিল্পীর সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব এবং দায়বদ্ধতার প্রকাশ ঘটায়। বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের নানা বিচিত্র সন্ধান দিবে এই ফটো এলবাম। ফটো এ্যালবামের প্রচ্ছদ নেয়া হয়েছে শিল্পীর নিজের তোলা ছবি থেকে। এ্যালবামটির সবচেয়ে চমৎকার যে ব্যাপারটি সবার প্রথমে চোখে পড়বে তা হলো এর ঝকঝকে উজ্জ্বল পৃষ্ঠার জন্য বাছাইকৃত কাগজ। এই কারণেই যেন ছবিগুলোর রেজ্যুলেশনের মাত্রা কমে যায়নি বরং মূল ছবি দেখার মতোই অনুভূতি পাওয়া যায়। এছাড়া বইয়ের মুদ্রণের মান, এবং বইয়ের বাঁধাই সুরুচির পরিচয় দেয়। সাধারণত ফন্ট কালো কালিতে হলেও এই এ্যালবামের লেখার ফন্টে কালো রঙের আধিক্য তুলনামূলক কম (অনেকটা ঝাপসা কালো বলা যায়) যা ব্যতিক্রম এবং চোখের জন্য আরামদায়ক নিঃসন্দেহে। এই এলবাম চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের আলোকচিত্রীদের সংগ্রহশালায় রাখার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হবে নিশ্চয়। সেইসাথে মউদুদুল আলমের ছবিগুলো তরুণ ফটোগ্রাফারদের জন্য উৎসাহ হয়ে কাজ করবে।
[হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ। লেখক : মউদুদুল আলম। প্রকাশক : সেন্টার ফর ফটোগ্রাফি এন্ড ভিজ্যুয়াল আর্টস বাংলাদেশ
পৃষ্ঠা : ১০৮]

x